হারানো সোনালী সেই দিনগুলি… (৭ম পর্ব)


ধান কাটার মৌসুম এলেই আমাদের বাড়িতে যেন অন্যরকম এক ব্যস্ততা নেমে আসত। চারদিকে তখন পাকা ধানের মৌ-মৌ গন্ধ। মাঠজুড়ে সোনালি রঙের ঢেউ—দূর থেকে তাকালে মনে হতো, প্রকৃতি যেন নিজের হাতে বিছিয়ে দিয়েছে এক বিশাল সোনালি চাদর।
আমাদের জমির ধান কাটার জন্য ময়মনসিংহ থেকে শ্রমিকেরা আসতেন। আব্বা নিজে আখাউড়া রেলওয়ে স্টেশনে গিয়ে তাঁদের নিয়ে আসতেন। প্রায় এক মাস তাঁরা আমাদের বাড়িতেই থাকতেন। ধান কাটা শেষ হলে আবার ফিরে যেতেন নিজেদের বাড়িতে। ধান কাটার সেই দিনগুলোর সঙ্গে আমার কত স্মৃতি যে জড়িয়ে আছে, তার কোনো হিসাব নেই।
ধান কাটা শেষ হলে জমির আইলে বসে ধানের মুঠি পাহারা দিতাম। মাথার ওপর তীব্র রোদ, চারপাশে পাকা ধানের মিষ্টি গন্ধ, দূরে কাস্তের ঝনঝন শব্দ—আর আমি আর আলামিন বসে বসে কাঁচা টক আম খেতাম।
সেই টক আমের স্বাদ, সেই রোদ, সেই মাঠ আর সেই শৈশব—আজও যেন আমার চোখের সামনে ভেসে ওঠে।
ধান কাটার মৌসুমে এটাই ছিল আমাদের ছোট্ট আনন্দ। খুব সামান্য কিছু, অথচ আজ মনে হয়—জীবনের সবচেয়ে দামি সুখগুলো বুঝি এমন সামান্য মুহূর্তের মধ্যেই লুকিয়ে থাকে।
ধান কাটা শেষ হলেই অবশ্য কাজ শেষ হতো না। বরং শুরু হতো আরও কত কাজ!
ধান মাড়াই, ধান সিদ্ধ করা, উঠানে ধান শুকানো, ধানের খড় শুকানো—তারপর সেই খড় দিয়ে কুঞ্জি দেওয়া। বাড়ির সবাই তখন একেকজন একেক কাজে ব্যস্ত। কারও হাতে অবসর নেই, অথচ সেই ব্যস্ততার মধ্যেও ছিল এক ধরনের আনন্দ।
আমার মাকে দেখেছি সেই সময় অসম্ভব ব্যস্ত থাকতে। এতজন কাজের মানুষের জন্য রান্না করা, সময়মতো তাঁদের খাবার পরিবেশন করা, কখনো মাঠে খাবার পৌঁছে দেওয়া, আবার একই সঙ্গে সংসারের অন্যান্য কাজ সামলানো—সবকিছুতেই মা যেন একাই ছুটে বেড়াতেন।
তখন বুঝতাম না, একটি সংসারকে সুন্দরভাবে ধরে রাখার পেছনে একজন মায়ের কতটা শ্রম, ত্যাগ আর ভালোবাসা লুকিয়ে থাকে।
আজ পেছনে ফিরে তাকালে বুঝি—আমাদের সংসারের সুখ-সমৃদ্ধির পেছনে বাবা-মায়ের সেই নিরলস পরিশ্রম, দায়িত্ববোধ ও ভালোবাসাই ছিল সবচেয়ে বড় শক্তি। তাঁদের ঘাম, শ্রম আর ত্যাগের ওপর দাঁড়িয়েই আমাদের পরিবার ধীরে ধীরে ফুলে-ফেঁপে উঠেছিল।
আলহামদুলিল্লাহ, আমরা নয় ভাই-বোনই আজ নিজ নিজ ক্ষেত্রে সুপ্রতিষ্ঠিত। কিন্তু আমাদের এই প্রতিষ্ঠার পেছনে যে মানুষ দুটির নিঃশব্দ অবদান সবচেয়ে বেশি—তাঁরা আমাদের বাবা ও মা।
ধান চাষ, পাট চাষ, সরিষা চাষ, গম চাষ, মাসকলাই চাষ—এসবই ছিল আমাদের গৃহস্থালির অন্যতম প্রধান ফসল। শুধু আমাদের পরিবার নয়, আমাদের গ্রামের প্রায় প্রতিটি পরিবারই তখন কৃষিকাজকে ঘিরে এমন ব্যস্ত জীবন কাটাত। কিন্তু সেই ব্যস্ততার মাঝেও মানুষের জন্য মানুষের দরজা সবসময় খোলা থাকত।
কারও বাড়ির চারপাশে আজকের দিনের মতো উঁচু বাউন্ডারি ছিল না। এক বাড়ির মানুষ আরেক বাড়ির মানুষকে নিজের আপনজনের মতোই মনে করত। কারও সুখে সবাই আনন্দিত হতো, কারও দুঃখে সবাই পাশে দাঁড়াত।
কোনো বাড়িতে উৎসব হলে সেই আনন্দ শুধু ওই বাড়ির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকত না—পুরো পাড়ার আনন্দ হয়ে যেত। কারও বাড়িতে ভালো রান্না হলে তার ঘ্রাণ যেমন চারদিকে ছড়িয়ে পড়ত, তেমনি সেই আনন্দও ছড়িয়ে পড়ত প্রতিবেশীদের মধ্যে। মানুষের ঘর ছিল ছোট, কিন্তু হৃদয় ছিল বড়।
আজকের মতো এত সুযোগ-সুবিধা ছিল না। ছিল না আধুনিকতার এত আয়োজন। কিন্তু মানুষের মধ্যে ছিল আন্তরিকতা। সম্পর্কগুলো ছিল গভীর। সুখ-দুঃখ ছিল সবার, আনন্দ ছিল সবার। আর বিপদের সময় একজনের পাশে আরেকজন দাঁড়ানো ছিল যেন কোনো লিখিত নিয়ম নয়—বরং মানুষের স্বাভাবিক ধর্ম।
এটাই ছিল আমাদের গ্রামীণ জীবন।
সহজ, সরল, পরিশ্রমী—কিন্তু ভীষণ আপন।
এই গ্রামীণ জীবনেরই এক মজার চরিত্র ছিলেন আমাদের মির্জান কাকা।
মির্জান কাকা ছিলেন অসম্ভব সরল-সোজা একজন মানুষ। আর সবাইকে বকাবকি করতেন। বকার জন্যই যেন তাঁর আলাদা একটা খ্যাতি ছিল!
কিন্তু মজার ব্যাপার হলো—তাঁর বকায় কেউ কখনো সত্যিকার অর্থে মন খারাপ করত না। বরং সবাই হাসিমুখেই তাঁর বকা মেনে নিত। কারণ তাঁর বকাটাও ছিল এক ধরনের আপনত্বের প্রকাশ। তাঁর বকা যেন ছিল ভালোবাসারই আরেকটি ভাষা।
মির্জান কাকা গরু পালন করতেন, জমিতে ধান চাষ করতেন। সারাদিনের কাজের ফাঁকে সবার সঙ্গে হাসি-ঠাট্টা, রসিকতা আর গল্পে মেতে থাকতেন।
তাঁকে ঘিরেও আমাদের গ্রামের জীবনে কত গল্প, কত হাসি, কত স্মৃতি জমে আছে!
আজ মনে হয়, সেই মানুষগুলো শুধু মানুষ ছিলেন না—তাঁরা ছিলেন আমাদের শৈশবেরই একেকটি চরিত্র। তাঁদের হাসি, বকা, রসিকতা, কাজকর্ম—সবকিছু মিলিয়েই তৈরি হয়েছিল আমাদের সেই ছোট্ট পৃথিবী।
মির্জান কাকা আজ আর আমাদের মাঝে নেই। তিনি দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়েছেন। কিন্তু তাঁর সেই বকাঝকা, হাসি আর সহজ-সরল মুখটি আজও আমার স্মৃতিতে অমলিন।
আমাদের আরেক প্রিয় মানুষ ছিলেন মনা কাকা।
মনা কাকা ছিলেন একটু পাগলা টাইপের মানুষ। কিন্তু আমাদের প্রতি তাঁর আদর-যত্নের কোনো কমতি ছিল না। কৃষিকাজ নিয়ে তিনি ভীষণ ব্যস্ত থাকতেন। গরুর জন্য ঘাস কাটা, গরুকে খাওয়ানো, গৃহস্থালির নানা কাজ—সারাদিন যেন কোনো না কোনো কাজে ব্যস্ত থাকতেন। তবে বছরের একটি বিশেষ সময়ে মনা কাকার মানসিক অবস্থা খারাপ হয়ে যেত। সেই সময় তাঁকে শিকল দিয়ে বেঁধে রাখতে দেখেছি।
মাদ্রাসায় যাওয়া-আসার পথে আমরা তাঁকে সেই অবস্থায় দেখতাম। ছোট ছিলাম, তাই সবকিছু বুঝতাম না। শুধু দেখতাম—একজন মানুষ কেমন অসহায় হয়ে পড়েছেন। আজ বড় হয়ে সেই দৃশ্যের কথা মনে হলে বুকের ভেতরটা কেমন ভার হয়ে আসে।
কিছুদিন পর আবার মনা কাকা সুস্থ হয়ে উঠতেন। তখন তিনি আগের মতোই আমাদের আদর করতেন, ভালোবাসতেন।
আজও মনা কাকা আমাকে অনেক ভালোবাসেন। সময় বদলেছে, আমরা বড় হয়েছি, জীবন আমাদের অনেক দূরে নিয়ে গেছে—কিন্তু কিছু মানুষের ভালোবাসা বোধহয় সময়ের সঙ্গে বদলায় না।
শৈশবের দিনগুলোতে এমন কিছু ঘটনাও ঘটেছে, যেগুলো তখন আমাদের কাছে ছিল রহস্যময়।
হঠাৎ একদিন আমাদের খোকন ভাই হাত-পা ঝিনঝিন করে অসুস্থ হয়ে পড়লেন। তখন গ্রামের মানুষ বলত—“জিনজিন রোগ” হয়েছে।
সে সময় নাকি আরও নানা ধরনের অদ্ভুত অসুস্থতার কথা শোনা যেত—কেউ বলত হাসাহাসির রোগ, কেউ বলত কান্নাকাটির রোগ। আমাদের ছোট্ট মনে এসব ছিল একেবারেই রহস্যের মতো।
খোকন ভাই অসুস্থ হয়ে পড়ার পর সবাই তাঁকে দাঁড় করিয়ে মাথায় পানি ঢালতে লাগল। শুধু মাথায় নয়, সারা শরীরেই পানি ঢালা হলো।
আমরা আশপাশে দাঁড়িয়ে বিস্মিত চোখে সবকিছু দেখছিলাম।
আলহামদুলিল্লাহ, পরে খোকন ভাই সুস্থ হয়ে উঠেছিলেন।
আজকের দিনে দাঁড়িয়ে সেই ঘটনাগুলো মনে পড়লে মনে হয়—সেই সময় গ্রামের মানুষের চিকিৎসা সম্পর্কে ধারণা ছিল সীমিত, কিন্তু একে অপরের পাশে থাকার আন্তরিকতায় কোনো কমতি ছিল না।
আমাদের প্রিয় আব্দুল আউয়াল সাক্কু ভাই বান্দরবানে রূপালী ব্যাংকে চাকরি করতেন। চাকরির সুবাদে পরিবার নিয়ে বান্দরবানেই থাকতেন।
সাক্কু ভাইয়ের ছোট ভাই জাকির ভাই একবার বান্দরবান থেকে গ্রামে ফিরলেন।
জাকির ভাইয়ের তখনকার হেয়ার স্টাইল ছিল চোখে পড়ার মতো! আমাদের ছোটদের চোখে তিনি যেন একেবারে অন্যরকম একজন মানুষ।
একদিন আমাদের সঙ্গে নিয়ে তিনি কলাগাছের সামনে দাঁড়ালেন। তারপর কলাগাছকে ঘুষি দিতে দিতে ঘুষি প্র্যাকটিস করতে লাগলেন।
আমাদের চোখ তখন বিস্ময়ে বড় বড়!
আমাদের মনে হচ্ছিল—জাকির ভাই বুঝি ভীষণ শক্তিশালী হয়ে গেছেন!
শৈশবের সেই সরল বিশ্বাসে মানুষকে আমরা কত সহজেই নায়ক বানিয়ে ফেলতাম!
পরবর্তীতে জাকির ভাই শেফের কাজ করতেন। তাঁর হাতের রান্না ছিল অসাধারণ। তাঁর ইমিডিয়েট বড় ভাই দাগন ভাইও শেফের কাজ করতেন।
দাগন ভাইয়ের দোকানে আমরা কতবার যে খেয়েছি, তার হিসাব নেই।
আর দাগন ভাইয়ের বিয়ের স্মৃতিটা তো আজও আমার কাছে বিশেষ হয়ে আছে।
সেটা ১৯৮৮ সালের কথা।
চারদিকে তখন ভয়াবহ বন্যা। সেই বন্যার মধ্যেই আমরা লঞ্চে করে প্রথম রাইতলা গ্রামে দাগন ভাইয়ের বিয়েতে গিয়েছিলাম।
লঞ্চের ডেকে বসে কত মানুষের কত দুষ্টুমি, হাসি-ঠাট্টা—আজও চোখ বন্ধ করলে যেন দেখতে পাই।
চারপাশে শুধু পানি। সেই পানির বুক চিরে লঞ্চ এগিয়ে চলেছে। আর আমরা শিশুরা আনন্দে মেতে আছি।
বন্যা তখন কারও কাছে শুধু দুর্যোগ ছিল না; আমাদের শৈশবের কাছে সেটিও হয়ে উঠেছিল একেকটি স্মৃতির অংশ।
আজ ভাবি—সেই সময়ের কষ্টের মধ্যেও মানুষ কীভাবে আনন্দ খুঁজে নিতে জানত!
বর্ষা এলেই গ্রাম হয়ে উঠত এক অন্য পৃথিবী
কৃষিকাজের ব্যস্ততা শেষ হলে বর্ষাকালে সবাই অনেকটাই অবসর হয়ে পড়ত।
তখন কেউ মাছ ধরত, কেউ নৌকা নিয়ে ব্যস্ত থাকত, কেউবা বর্ষার পানিকে ঘিরে অন্য কোনো কাজ খুঁজে নিত।
আব্বা ও জামশেদ ভাই ধানের ব্যবসা করতেন। বাড়ি বাড়ি থেকে ধান কিনতেন, ধান সংগ্রহ করতেন। তারপর চট্টগ্রামে নিয়ে গিয়ে ধান ভাঙিয়ে ভালো দামে বিক্রি করতেন।
কখনো তাঁরা পাটের ব্যবসাও করতেন। বাড়ি বাড়ি থেকে পাট কিনে বাংলাদেশ জুট কর্পোরেশনের কাছে বিক্রি করতেন।
এসব ব্যবসা ছিল প্রান্তিক পর্যায়ের ব্যবসা। কিন্তু সেই ব্যবসার মধ্যেই তখন বহু পরিবারের জীবিকা চলত।
আর বর্ষাকালে মাছ ধরার প্রতি তো সবারই এক ধরনের নেশা ছিল।
কেউ জাল নিয়ে বের হতো, কেউ নৌকা নিয়ে, কেউ আবার অন্য কোনো দেশি পদ্ধতিতে মাছ ধরার চেষ্টা করত। বেশি মাছ পেলে নিজেদের প্রয়োজন মিটিয়ে বাকিটা বিক্রি করে দিত।
বর্ষার পানিতে আমাদের গ্রামের প্রতিটি বাড়ি যেন একেকটি ছোট দ্বীপে পরিণত হতো।
প্রতিটি বাড়ির চারপাশে পানি। এ বাড়ি থেকে ও বাড়ি যেতে নৌকা দরকার।
প্রায় প্রত্যেক বাড়িতেই একটা না একটা নৌকা থাকত। আর গুদারার নৌকা তো ছিলই।
সেই সময় নৌকা ছিল শুধু যাতায়াতের মাধ্যম নয়—বরং বর্ষাকালের জীবনেরই একটি অপরিহার্য অংশ।
হঠাৎ একসময় এলাকায় একটি নতুন ধরনের জাল এল।
সবাই বলত, এর নাম “কারেন্ট জাল”।
জালটি পানিতে পাতার সঙ্গে সঙ্গেই মাছ আটকে যেত। ছোট-বড় সব ধরনের মাছই ধরা পড়ত। জালটি এত সূক্ষ্ম ছিল যে পানির রঙের সঙ্গে মিশে থাকত—মাছ যেন সেটি দেখতেই পেত না।
শুরুতে সবাই খুব খুশি।
কারণ মাছ উঠত প্রচুর।
কিন্তু ধীরে ধীরে সেই আনন্দের আড়ালে অন্য একটি পরিবর্তন শুরু হলো।
ছোট-বড় সব ধরনের মাছ একসঙ্গে ধরা পড়তে থাকায় বিলগুলো ধীরে ধীরে মাছশূন্য হতে শুরু করল।
আজ আর আগের মতো সেই মাছ নেই।
আগের মতো বিলের পানিতে মাছের ছুটোছুটি নেই। আগের মতো জাল ফেললেই মাছ ওঠে না। বর্ষা আসে কিন্তু আগের মতো আর পানি আসে না—সেই পুরোনো মাছ ধরার আনন্দও আর ফিরে আসে না।
সময় বদলেছে।
মানুষ বদলেছে।
জীবনযাত্রা বদলেছে।
প্রকৃতিও যেন বদলে গেছে।
একসময় যে বিল ছিল আমাদের আনন্দের বিশাল ভাণ্ডার, আজ তার অনেকটাই কেবল স্মৃতি।
কোথায় হারিয়ে গেল সেই দিনগুলো?
আজ এত বছর পর যখন সেই দিনগুলোর কথা মনে পড়ে, বুকের ভেতর কেমন একটা শূন্যতা তৈরি হয়।
মনে হয়—কোথায় হারিয়ে গেল সেই মানুষগুলো?
কোথায় হারিয়ে গেল সেই দিনগুলো?
কোথায় হারিয়ে গেল সেই সহজ-সরল জীবন?
সময় তার নিজস্ব নিয়মে অনেক দূর এগিয়ে গেছে। মাঠের সেই সোনালি ধান হয়তো আজও ফলে, বর্ষার পানি হয়তো আজও আসে, কোথাও হয়তো এখনো নৌকা ভাসে।
কিন্তু সেই মানুষগুলো নেই।
সেই সম্পর্কের উষ্ণতা নেই।
সেই আন্তরিকতা নেই।
সেই ছোট্ট ছোট্ট আনন্দগুলোও যেন আজ জীবনের ব্যস্ততার ভিড়ে হারিয়ে গেছে।
তবু স্মৃতির আশ্চর্য ক্ষমতা আছে।
সময়কে সে হার মানাতে পারে।
তাই চোখ বন্ধ করলেই আজও দেখতে পাই—
সোনালি ধানের মাঠ।
কাঁচা টক আম হাতে আমি আর আলামিন।
দূরে শ্রমিকদের ধান কাটার দৃশ্য।
উঠানে মায়ের ব্যস্ত ছুটে চলা।
কাজের মাঝে আব্বার কর্মব্যস্ত মুখ।
মির্জান কাকার বকাঝকা।
মনা কাকার সরল হাসি।
খোকন ভাইকে ঘিরে মানুষের ব্যস্ততা।
কলাগাছের সামনে জাকির ভাইয়ের ঘুষি প্র্যাকটিস।
দাগন ভাইয়ের বিয়েতে বন্যার পানির ওপর দিয়ে লঞ্চে আমাদের যাত্রা।
বর্ষার পানিতে ডুবে থাকা গ্রামের বাড়িগুলো।
আর জালে ধরা পড়া রুপালি মাছের ঝলক।
সবকিছু যেন আজও আমার চোখের সামনে।
সেই জীবন হয়তো আর ফিরে আসবে না।
সেই মানুষগুলোও একে একে হারিয়ে যাবেন সময়ের অতলে।
কিন্তু আমার স্মৃতির পাতায়—ধানের সেই সোনালি মাঠের মতোই—সেই দিনগুলো আজও রয়ে গেছে।
সেই মানুষগুলো আজও আমার মনে বেঁচে আছেন।
আর তাই বারবার মনে হয়—
কোথায় হারিয়ে গেল সেই মানুষগুলো?
কোথায় হারিয়ে গেল সেই দিনগুলো?
কোথায় হারিয়ে গেল আমাদের সেই সোনালি শৈশব?
সময় চলে গেছে।
জীবন অনেক দূর এগিয়ে গেছে।
কিন্তু স্মৃতির সেই সোনালি দিনগুলো—আজও আমার হৃদয়ের ভেতর ঠিক আগের মতোই জীবন্ত।
চলবে…..
লেখক : কবীর আহমেদ ভূঁইয়া।
আন্তর্জাতিক ব্যবসায়ী, রাজনৈতিক ও উন্নয়ন কৌশলবিদ, প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান, ভূঁইয়া গ্লোবাল ফাউন্ডেশন।



