হারানো সোনালী সেই দিনগুলি… (৮ম পর্ব)


আমাদের বাড়ির পশ্চিম পাশের ডোবাটাও ছিল আমাদের শৈশবের আনন্দের আরেকটি বড় জায়গা। নির্দিষ্ট সময় এলেই সেখানে মাছ ধরার আয়োজন হতো। বৈষ্ণবপুর কিংবা ভবানীপুর থেকে জেলেদের ডেকে আনা হতো। তবে জেলেরা আসার আগেই আমাদের প্রস্তুতি শুরু হয়ে যেত।
ডোবার পানির ভেতর গাছের ডালপালা দিয়ে ছোট ছোট ঘরের মতো করে রাখা হতো। আমাদের উদ্দেশ্য ছিল একটাই—মাছগুলো যেন সেখানে আশ্রয় নেয়। পরে জেলেরা এসে সেসব জায়গা থেকে মাছ ধরতে পারতেন।
জেলেরা যখন মাছ ধরতে আসতেন, আমরা সারাদিন তাঁদের সঙ্গে থাকতাম। তাঁদের মাছ ধরার কৌশল দেখতাম, নিজেরাও পানিতে নেমে মাছ ধরতাম, আর আনন্দে মেতে থাকতাম। কই, চিংড়ি, ট্যাংরা, টাকি, শোল, গজার, কানলা, মেনি—কত জাতের মাছ যে সেই ডোবা থেকে ধরেছি, তার কোনো হিসাব নেই।
দিন শেষে ধরা মাছের অর্ধেক জেলেরা নিয়ে যেতেন, আর অর্ধেক আমাদের দিয়ে যেতেন।
কী যে স্বাদ ছিল সেই মাছের!
আবার অনেক সময় ডোবার মধ্যে নৌকা ডুবিয়ে রাখতাম। নৌকার ভেতর গাছের ডালপালা দিয়ে মাছের জন্য বাসা বানিয়ে দিতাম। কিছুদিন পর নৌকা তুলে, নৌকা সেচে মাছ ধরতাম।
ডোবার পাশাপাশি আমাদের বাড়ির উত্তর পাশে ছিল একটি খাল। সেই খালের মধ্যেও গাছের ছাটা দিয়ে ঘরের মতো করে জায়গা তৈরি করে দিতাম। কখনো পেলুইন দিয়ে, কখনো আবার হাত দিয়ে মাছ ধরতাম। বর্ষা শেষে চারদিকের পানি কমে এলে নানা কৌশলে মাছ ধরতাম। হরেক রকমের মাছ পেতাম সেখানে।
আজ কত দামি মাছ বাজার থেকে কিনে খাই। অথচ সেই দিনের ডোবার মাছের ঘ্রাণ, স্বাদ আর তৃপ্তি—কোথাও যেন আর খুঁজে পাই না।
মাঝে মাঝে মনে হয়, আমি আসলে শুধু মাছের স্বাদ খুঁজি না; খুঁজি সেই সময়টাকে। খুঁজি সেই মানুষগুলোকে, সেই পরিবেশকে, সেই নির্মল আনন্দকে।
কী মধুময় ছিল সেই দিনগুলো!
বিলের খাঁটি আর মাছ ধরার উৎসব
মাছ ধরার আরও কত স্মৃতি যে ছড়িয়ে আছে আমাদের শৈশবজুড়ে!
পৌষ মাসের শেষ দিকে কিংবা মাঘের শুরুতে আমাদের বিলের খাঁটিগুলো সেচ দেওয়ার সময় এলেই যেন চারপাশে উৎসবের আমেজ তৈরি হতো। খাঁটির পাশে ছিল বিশাল ডাংগি। পানির সঙ্গে সঙ্গে সেখানে মাছেরও কোনো অভাব ছিল না।
মাছ ধরতে আসা মানুষের হাকডাক, চারপাশে মাছ খাওয়া পাখিদের ডাক—সব মিলিয়ে এক অদ্ভুত মধুর পরিবেশ তৈরি হতো। পাখিগুলো সারাদিন মাছের সন্ধানে কী যে কসরত করত, তার কোনো ইয়ত্তা ছিল না।
আমি তখন খাঁটির পানিতে মাছ ধরায় ব্যস্ত হয়ে পড়তাম। পানি ধীরে ধীরে শুকিয়ে এলে কচুরিপানার ঝোপ সরিয়ে সরিয়ে মাছ খুঁজতাম। একেকটি ঝোপের নিচ থেকে বেরিয়ে আসত একেক রকমের মাছ—টাকি, কই, শিং, মাগুর, শোল, কানলা, মেনি, ট্যাংরা, গুলশা—আরও কত জানা-অজানা মাছ!
সকালে ঘুম থেকে উঠেই মাছ ধরতে চলে যেতাম। কিছুক্ষণ পর মাছ নিয়ে বাড়িতে ফিরতাম। টাকি, কই, শিং, মাগুর, গজার—বড় ডেকচিতে পানির মধ্যে জিইয়ে রাখা হতো। কিছু মাছ শুকিয়ে রাখা হতো।
সত্যিই, মাছ ছিল আমাদের এই অঞ্চলের জীবনেরই একটি অংশ। মনে হতো, আমাদের গ্রামটাই যেন মাছের গ্রাম।
মাছ ধরা তখন শুধু মাছ ধরার কাজ ছিল না—এ ছিল এক ধরনের উৎসব। গ্রামের মানুষ, জেলে, মাছের ব্যাপারি—সবাইকে ঘিরে যেন একটি প্রাণবন্ত পরিবেশ তৈরি হতো।
একবার মাছ ধরতে গিয়ে শিং মাছের গর্তে আমার পা ঢুকে গিয়েছিল। সঙ্গে সঙ্গে শিং মাছের কাঁটা পায়ে বিধে গেল। কী যে কষ্ট আর ব্যথা! মনে হয়েছিল যেন সাপে কামড় দিয়েছে। ছোটবেলার সেই যন্ত্রণা আজও মনে পড়লে শরীরটা কেমন যেন শিউরে ওঠে।
খাঁটি সেচের কাজ শেষ হলে ব্যাপারিরা মাছ কিনতে আসতেন। তাঁরা মাছ দেখে দরদাম করতেন, নিজেদের পছন্দমতো দাম দিয়ে মাছ কিনে নিয়ে যেতেন। আমরা পাশে দাঁড়িয়ে সেই দৃশ্য দেখতাম, উপভোগ করতাম।
সেই সময়ের প্রতিটি দৃশ্যই যেন আজ স্মৃতির পাতায় আঁকা একটি ছবি।
তখন আমাদের গ্রামে বিদ্যুৎ ছিল না। সন্ধ্যা নামলেই একে একে ঘরে কুপি বাতি জ্বলে উঠত। কখনো হারিকেনের ক্ষীণ আলোয় বসে পড়াশোনা করতাম। চারপাশে নিস্তব্ধতা। মৃদু আলো। বইয়ের পাতার শব্দ। দূরে কোথাও হয়তো কোনো পাখির ডাক, কিংবা গ্রামের কারও কণ্ঠস্বর।
আজকের ঝলমলে আলোর পৃথিবীতে দাঁড়িয়ে বুঝতে পারি—সেই অন্ধকারের মধ্যেও কী অপূর্ব শান্তি লুকিয়ে ছিল!
এশার নামাজের আজান হলেই আমার চোখে ঘুম নেমে আসত। আর এ নিয়ে আব্বার রাগের শেষ ছিল না। কখনো শাসন করতেন, কখনো মারও দিতেন। তখন মনে হতো, আব্বা বুঝি খুব কঠোর মানুষ।
তাঁর সেই শাসনের অর্থ তখন বুঝিনি।
তখন শুধু মারের কষ্টটাই বুঝতাম, ভালোবাসাটা বুঝতাম না।
আজ জীবনের এই পর্যায়ে এসে বুঝি—সেই কঠোরতার ভেতরেই ছিল গভীর ভালোবাসা। তাঁর শাসনের আড়ালে লুকিয়ে ছিল আমাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে অসীম স্বপ্ন।
সেই নিয়মানুবর্তিতা, সেই শাসন, সেই ভয় আর ভালোবাসার মিশ্রণই হয়তো আমাদের জীবনের পথটা তৈরি করে দিয়েছিল।
তখন বুঝিনি।
আজ বুঝি।
সময় চলে যায়, স্মৃতি থেকে যায়
সময়ের স্রোত অনেক দূর এগিয়ে গেছে।
সেই পুরোনো বাড়ি আর আগের মতো নেই। নেই সেই কোঠাঘর, নেই তর্জার বেড়া, নেই কুপি বাতির আলো। নেই সেই বিস্তীর্ণ ধানক্ষেত, বিলের মাছ, কৃষ্ণচূড়ার লাল ফুল, বাঁশির সুর, দাদাদের হাসি।
সবকিছু যেন একে একে হারিয়ে গেছে।
কিন্তু আশ্চর্য—মানুষ চলে যায়, সময় চলে যায়, দৃশ্য বদলে যায়; স্মৃতি থেকে যায়।
আর সেই স্মৃতির ভেতরেই আমি আজও ফিরে যাই আমার সেই সোনালি শৈশবে।
যে শৈশবে ছিল না বিদ্যুৎ, ছিল না আধুনিকতার চাকচিক্য, ছিল না এত চাহিদা। অথচ ছিল মানুষের প্রতি মানুষের ভালোবাসা, ছিল মাটির গন্ধ, ছিল প্রকৃতির সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক, ছিল পরিশ্রমের আনন্দ এবং ছিল এক অদ্ভুত নির্মল সুখ।
আজকের জীবনে কত কিছু আছে—আলো আছে, প্রযুক্তি আছে, আরাম আছে, প্রাচুর্য আছে। অথচ সেই শান্তিটুকু কোথায় যেন হারিয়ে গেছে।
তাই কখনো কখনো চোখ বন্ধ করলে মনে হয়—আমি আবার সেই পুরোনো বাড়িতে ফিরে গেছি।
কুপি বাতির মৃদু আলো জ্বলছে। দূরে কোথাও বাঁশির সুর ভেসে আসছে। মাঠজুড়ে পাকা ধানের গন্ধ। ডোবায় মাছ ধরার ব্যস্ততা। পাখির ডাক আর মানুষের হাকডাকে মুখর চারপাশ। আর কাছে-দূরে আপন মানুষগুলোর হাসি।
মনে হয়, সময় যেন থেমে গেছে।
আমি আবার সেই ছোট্ট ছেলেটি হয়ে গেছি—যে সকালে ঘুম থেকে উঠেই মাছ ধরতে ছুটে যেত, সন্ধ্যায় কুপি বাতির আলোয় পড়তে বসত, আর বাবার শাসনের ভেতরেও অজান্তে ভালোবাসার ছায়ায় বড় হয়ে উঠত।
সত্যিই—
হারিয়ে যাওয়া সেই দিনগুলোই ছিল আমার জীবনের সবচেয়ে সোনালি দিন।
চলবে….
লেখক : কবীর আহমেদ ভূঁইয়া।
আন্তর্জাতিক ব্যবসায়ী | রাজনৈতিক ও উন্নয়ন কৌশলবিদ।
প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান, ভূঁইয়া গ্লোবাল ফাউন্ডেশন।



