হারানো সেই সোনালী দিনগুলি


চতুর্থ পর্ব : সময়ের স্রোত কারও জন্য অপেক্ষা করে না। নদীর পানি যেমন একদিন শুকিয়ে যায়, তেমনি মানুষের জীবন থেকেও একে একে হারিয়ে যায় কত পরিচিত মুখ, কত আপনজন, কত গল্প, কত হাসি-কান্না। সময় চলে যায়, মানুষ চলে যায়, বদলে যায় চারপাশের পৃথিবী। অথচ আশ্চর্য—স্মৃতিরা কখনো চলে যায় না।
তারা বুকের গভীরে নীরবে বসবাস করে। কখনো কোনো গন্ধে, কোনো পুরোনো গানে, বর্ষার বৃষ্টির শব্দে কিংবা দূরে কোথাও নৌকার বৈঠার ছলাৎ ছলাৎ শব্দে হঠাৎ সেই স্মৃতির দরজা খুলে যায়। চোখ বন্ধ করলেই আমি ফিরে যাই সেই শৈশবের বরিশল গ্রামে—গুদারাঘাট, নৌকার সারি, কাদামাখা পথ, বাঁশের সাঁকো, বিলের পানি আর সহজ-সরল মানুষের মায়াময় মুখগুলোর কাছে। মনে হয়, এই তো সেদিনের কথা!
আশ্বিন-কার্তিক মাস এলেই আমাদের পুরো এলাকার জীবনযাত্রা যেন অন্যরকম হয়ে উঠত। আখাউড়া থেকে বরিশল গ্রামে যেতে হলে একের পর এক গুদারা—খেয়া নৌকা—পার হতে হতো। তিতাসের মরা নদীর ওপর দুটি নৌকা, তারপর জুট কর্পোরেশনের পাশ দিয়ে বোয়ালিয়া বিলের ওপর আরও কয়েকটি নৌকা। এরপর গ্রামের ভেতরে মসজিদ থেকে পশ্চিমপাড়া পর্যন্ত নৌকার ব্যবস্থা। মনে হতো, পুরো পথটাই যেন পানির বুকের ওপর আঁকা এক জীবন্ত সেতু।
সেই গুদারাঘাটের প্রাণ ছিলেন বেপারী বাড়ির আবু সামা ভাই। তিনি ছিলেন মাঝিদের সরদার। শুধু নেতৃত্ব দেওয়ার কারণেই নয়, তাঁর আন্তরিকতা, সরলতা আর মানুষের প্রতি ভালোবাসার কারণেও তিনি ছিলেন সবার প্রিয়।
এক কিলোমিটারেরও বেশি পথ পার হতে ভাড়া ছিল মাত্র পঞ্চাশ পয়সা!
আজকের প্রজন্মের কাছে হয়তো এই হিসাব অবিশ্বাস্য মনে হবে। অনেক মাঝির নিজের নৌকা ছিল। আবার অনেকে প্রতিদিন বিশ টাকা ভাড়া দিয়ে নৌকা চালাতেন। দিন শেষে নৌকার মালিকের পাওনা পরিশোধ করার পর যা থাকত, সেটুকুই ছিল তাঁদের সংসারের অবলম্বন। অভাব ছিল, কষ্ট ছিল, অনিশ্চয়তা ছিল—কিন্তু মানুষের মুখে ছিল এক ধরনের তৃপ্তির হাসি।
সেই হাসি আজ কোথায়?
বর্ষা শেষে পানি যখন নামতে শুরু করত, তখন গ্রামের রাস্তাগুলো পরিণত হতো কাদা আর পানির এক দুর্বিষহ পথে। জুতা পরে হাঁটা ছিল প্রায় অসম্ভব। তাই সবাই খালি পায়ে চলাফেরা করত। স্কুলপড়ুয়া ছেলেমেয়েরা হাতে জুতা নিয়ে কাদার পথ পেরিয়ে আখাউড়া পর্যন্ত হেঁটে যেত। সেখানে গিয়ে পা ধুয়ে, জুতা পরে স্কুলে ঢুকত।
শিক্ষার জন্য সেই ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের কী অসীম সংগ্রাম!
আজকের প্রজন্ম হয়তো কল্পনাও করতে পারবে না—একটি বই, একটি স্কুল আর কয়েকটি স্বপ্নের কাছে পৌঁছাতে আমাদের কতটা পথ পাড়ি দিতে হতো।
পানি শুকিয়ে গেলে মরা খালগুলোর ওপর বাঁশের সাঁকো তৈরি করতে হতো। সেই সাঁকো তৈরির কাজ করতেন উত্তরপাড়ার সলিম উদ্দিন ও তাঁর পরিবারের সদস্যরা। বংশপরম্পরায় তাঁরা এই কাজ করে আসছিলেন।
ধান কাটার মৌসুম শেষ হলে তাঁরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে পারাপারের বিনিময়ে ধান সংগ্রহ করতেন। সেটাই ছিল তাঁদের উপার্জনের একটি প্রথাগত ব্যবস্থা।
পানি শুকিয়ে গেলে খালের ওপর সাঁকু নির্মিত হতো। সেই সাঁকুর বিনিময়ে সলিম ভাই ও তাঁর পরিবারের সদস্যরা নতুন রাস্তার এক পাশে বড়ই গাছের নিচে বসে পথচারীদের কাছ থেকে পারাপারের টাকা নিতেন—পনেরো পয়সা, বিশ পয়সা, কখনো পঁচিশ পয়সা।
সেই বড়ই গাছটি যেন আজও আমার চোখের সামনে দাঁড়িয়ে আছে।
সলিম সাহেবের ছেলের নামটি আজ আর মনে নেই। তবে তাঁর একটি বিষয় খুব মনে আছে—তিনি ভীষণ একাকী ছিলেন। সারাদিন বড়ই গাছের নিচে বসে থেকে পথচারীদের সঙ্গে গল্প করার জন্য মনটা যেন ছটফট করত।
কেউ একটু কাছে দিয়ে গেলেই ডাক দিতেন—
“এই যে, একটু বসেন!”
কিন্তু গ্রামের মানুষ তো কাজের মানুষ। বেশিক্ষণ বসে থাকার সুযোগ কারও ছিল না।
তাই মানুষকে একটু বেশি সময় কাছে রাখার জন্য তিনি বের করেছিলেন এক অভিনব উপায়—কিচ্ছা!
তিনি গল্প বলা শুরু করতেন। আর তাঁর কিচ্ছার এমনই টান ছিল যে, কেউ একবার বসে শুনতে শুরু করলে গল্প শেষ না হওয়া পর্যন্ত উঠে যেতে পারত না।
আমরা যখন স্কুলে যেতাম, তখন প্রায়ই দেখতাম বড়ই গাছের নিচে অনেক মানুষ বসে তাঁর কিচ্ছা শুনছে।
আমাদেরও ডাকতেন।
আমরা লোভ সামলানোর চেষ্টা করতাম। স্কুলে দেরি হয়ে যাবে—এই ভয়ে কোনো রকমে নিজেদের টেনে নিয়ে যেতাম।
কিন্তু আমাদের ক্লাসমেট বাশার ভাই সবসময় এতটা সংযমী ছিলেন না।
বাশার ভাই—যিনি কিছুদিন আগে এই পৃথিবীর মায়া ছেড়ে চলে গেছেন।
তিনি ছিলেন দুরন্ত, ডানপিটে, ভীষণ দুষ্টু। অনেকেই তাঁকে একটু ভয়ও পেতেন। স্কুল ফাঁকি দিয়ে তিনি সেই বড়ই গাছের নিচে বসে কিচ্ছা শুনতেন।
আজ যখন বাশার ভাইয়ের কথা মনে পড়ে, তখন মনে হয়—কী অদ্ভুত! যে মানুষটিকে একসময় দুষ্টুমি করার জন্য বকা খেতে দেখেছি, সেই মানুষটিই আজ কেবল স্মৃতি।
মানুষ চলে যায়, কিন্তু তার দুষ্টুমিও যেন স্মৃতির পাতায় হাসতে থাকে।
বাশার ভাইয়ের আরেকটি নেশা ছিল সিনেমা।
স্কুল ফাঁকি দিয়ে কখনো রেলকার ট্রেনে চড়ে ভৈরব চলে যেতেন সিনেমা দেখতে। তখন সিনেমাই ছিল আমাদের বড় বিনোদন। গ্রামে টেলিভিশন ছিল না, মোবাইল ছিল না, ইন্টারনেটের কোনো অস্তিত্বই ছিল না।
ছিল মানুষের মুখোমুখি বসা, গল্প, গান, যাত্রাপালা আর উৎসব।
শীতের সময় আমাদের গ্রামে যাত্রাপালার আসর বসত। রাত গভীর হওয়া পর্যন্ত চলত অভিনয়। বাশার ভাই প্রায়ই রাজার চরিত্রে অভিনয় করতেন। আমাদের পাড়ার আকবর কাকা, শামসুল হক কাকা, নুরুল হক কাকা এবং বাশার ভাই—তাঁরা নাটকে অভিনয় করতেন। তাঁদের সহযোগিতা করতেন বেপারী বাড়ির ফরিদ ভাই এবং আমাদের জামশেদ ভাই।
নরসিংদী কিংবা ঢাকা থেকে আসতেন সহযোগী অভিনেত্রী ও সংগীতশিল্পীরা।
সারাদিনের কাজ শেষে রাত নামলেই গ্রামের হাজারো মানুষ—ছেলে, মেয়ে, যুবক, বৃদ্ধ—সবাই জড়ো হতেন সেই নাটকের আসরে।
শুরুতেই বাজত—
“সালাম সালাম হাজার সালাম…”
তারপর জাতীয় সংগীত।
এরপর শুরু হতো অভিনয়।
কেউ অট্টহাসিতে ফেটে পড়তেন, কেউ চোখের পানি মুছতেন। কেউ চরিত্রের সঙ্গে এতটাই একাত্ম হয়ে যেতেন যে মনে হতো, অভিনয় নয়—আমাদের নিজেদের জীবনেরই গল্প চলছে মঞ্চে।
শীতের কুয়াশা, হাড়কাঁপানো ঠান্ডা, কখনো শিশিরে ভেজা রাত—সবকিছুকে উপেক্ষা করে মানুষ শেষ পর্যন্ত নাটক দেখত।
সেই রাতগুলো ছিল আমাদের আনন্দের রাত।
আজ এত আলো, এত প্রযুক্তি, এত বিনোদন—তবুও সেই আনন্দ যেন আর কোথাও খুঁজে পাই না।
চলবে……
লেখক : কবীর আহমেদ ভূঁইয়া



