সাহিত্য ও সংস্কৃতি

হারানো সেই সোনালী দিনগুলি  (পঞ্চম পর্ব)

মানুষগুলো নেই, স্মৃতিগুলো রয়ে গেছে গ্রামের প্রায় প্রতিটি মসজিদ ও মাদ্রাসায় বছরে একবার ওয়াজ মাহফিল হতো। দূর-দূরান্ত থেকে নামিদামি হুজুররা আসতেন। এশার নামাজের পর শুরু হতো ওয়াজ, আর চলত গভীর রাত পর্যন্ত।
মাহফিল ঘিরে থাকত বিরাট আয়োজন। আমাদের গ্রামের মসজিদেও নামকরা আলেমরা আসতেন। আর এই আয়োজনের অন্যতম প্রাণ ছিলেন আমাদের সবার শ্রদ্ধেয় আটলার হুজুর—মাওলানা মুখলেছুর রহমান।
তাঁর আসল নাম হয়তো অনেকেই জানতেন না। সবাই ভালোবেসে তাঁকে ডাকতেন—“আটলার হুজুর”।
তিনি ছিলেন গ্রামের মসজিদের ইমাম এবং হাফেজি মাদ্রাসার শিক্ষক। ছোট-বড়, ধনী-গরিব—সবার প্রতিই ছিল তাঁর সমান মমতা।

শিশুদের কাছে তিনি ছিলেন শ্রদ্ধার, আবার খানিকটা ভয়েরও। কিন্তু সেই ভয়ের ভেতরেও ছিল গভীর স্নেহ।
প্রায় এক দশক আগে তিনি ইন্তেকাল করেন। তাঁর জানাজার দিনের কথা মনে পড়লে আজও বুকটা ভার হয়ে আসে। গ্রামের যুবকেরা কাঁধে করে তাঁর মরদেহ নিয়ে এসেছিলেন। সর্বস্তরের মানুষ অশ্রুসিক্ত চোখে শেষ বিদায় জানিয়েছিলেন।
পরে তাঁর নিজ গ্রাম আটলায় তাঁকে দাফন করা হয়।

সেদিন মনে হয়েছিল—একজন মানুষ কতটা মানুষের হয়ে উঠলে তাঁর বিদায়ের দিনে এত মানুষ একসঙ্গে কাঁদে!
আটলার হুজুরের জানাজা যেন আমাদের শিখিয়ে দিয়েছিল—মানুষের প্রকৃত সম্পদ জমি-জমা নয়, মানুষের হৃদয়ে নিজের জন্য তৈরি করে যাওয়া জায়গা।

বর্ষাকালে পুরো গ্রামটাই আবার পানির বুকে ভাসমান ছোট ছোট দ্বীপে পরিণত হতো। বিকেল হলেই গ্রামের ছেলেরা নৌকা নিয়ে বেরিয়ে পড়ত। চারদিকে পানি, আকাশে মেঘ, দূরে সবুজ গাছপালা—প্রকৃতি যেন নিজ হাতে সাজিয়ে দিত এক অপার্থিব পৃথিবী।
কিন্তু সেই সৌন্দর্যের মাঝেও কখনো কখনো নেমে আসত মৃত্যুর কালো ছায়া।
এক কোরবানির ঈদের কথা আজও ভুলতে পারি না।
জিয়াউল ভাই কোরবানির মাংস নিয়ে ইদ্রিস কাকার বাড়ির দিকে যাচ্ছিলেন। দক্ষিণপাড়ার ভাঙা পার হওয়ার সময় তিনি নৌকা থেকে পানিতে পড়ে যান।
গ্রামের মানুষ প্রাণপণ চেষ্টা করে তাঁকে উদ্ধার করার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে।
ঈদের আনন্দ মুহূর্তেই পরিণত হয়েছিল কান্নায়। যে বাড়িগুলোতে সেদিন কোরবানির মাংস রান্না হচ্ছিল, সেখানেও নেমে এসেছিল শোকের ছায়া। মনে হয়েছিল, পুরো গ্রাম যেন একসঙ্গে কাঁদছে।
আরেকটি মৃত্যু আমাদের কিশোর মনকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছিল।
আখাউড়া শহীদ স্মৃতি কলেজের প্রথম বর্ষের ছাত্র সেলিম ভাই। অত্যন্ত ভদ্র, হাসিখুশি, প্রাণবন্ত একজন মানুষ। তিনি ছিলেন আমার চেয়ে মাত্র এক বছরের বড়।
একদিন ঘুমের মধ্যেই তিনি চলে গেলেন না-ফেরার দেশে।
কোনো বিদায় নেই, কোনো প্রস্তুতি নেই—শুধু হঠাৎ চলে যাওয়া।
তখন ছোট ছিলাম। মৃত্যুর অর্থ পুরোপুরি বুঝতাম না। শুধু বুঝেছিলাম, একজন মানুষ আর কোনোদিন আমাদের সঙ্গে কথা বলবে না।
আজ বুঝি—শৈশবে দেখা কিছু মৃত্যু মানুষের ভেতরে চিরস্থায়ী শূন্যতা তৈরি করে।
তবে জীবন শুধু মৃত্যু আর বেদনার গল্প নয়। তার ভেতরে আছে হাসি, আনন্দ, উৎসব আর অসংখ্য ছোট ছোট স্মৃতি।
হাসনা আপার বিয়ে ছিল আমাদের গ্রামের অন্যতম স্মরণীয় অনুষ্ঠান।
তখন বিয়ে মানেই ছিল রাতভর উৎসব। ভোরের দিকে বরযাত্রীরা ফিরে যেতেন। কয়েক দিন পর ফিরাযাত্রা হতো। আর ফিরাযাত্রার সঙ্গে থাকত কাদা খেলার এক বিশেষ আনন্দ।
কিন্তু আনন্দ করতে গিয়েই একবার বড় একটি কাদার ঢেলা বরের বুকে আঘাত করে।
তিনি অজ্ঞান হয়ে গেলেন।
মুহূর্তের মধ্যে হাসি-আনন্দ থেমে গেল। চারদিকে উৎকণ্ঠা। সবাই ছুটে এলেন। অনেক চেষ্টা করার পর তাঁর জ্ঞান ফিরল। তখন যেন সবাই আবার প্রাণ ফিরে পেল।
মিনার বিয়েতেও ঘটেছিল আরেকটি ঘটনা।
সন্ধ্যার ব্যস্ততার মধ্যে ছোট্ট আল-আমিন হঠাৎ হারিয়ে গেল। এক মুহূর্তেই বিয়ের বাড়ির আনন্দ বদলে গেল উৎকণ্ঠায়। চারদিকে খোঁজ শুরু হলো। সবাই নাম ধরে ডাকতে লাগল—
“আল-আমিন!”
“আল-আমিন!”
পুরো গ্রাম যেন তাকে খুঁজতে নেমে পড়ল।
শেষ পর্যন্ত জানা গেল, সে গোয়ালপাড়া রেখা আপার বাড়িতে চলে গিয়েছিল। তাকে ফিরে পাওয়ার পর যেন সবার বুকের ওপর থেকে বিশাল একটি পাথর নেমে গেল।
এই ছিল আমাদের গ্রাম।
একজনের দুঃখ ছিল সবার দুঃখ। একজনের আনন্দ ছিল সবার আনন্দ।
আমার নিজের শৈশবও ছিল এমনই ছোট ছোট দুষ্টুমি আর আনন্দে ভরা।
তখন আমি চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ি। বর্ষার দিনে আমি আর আমার চাচাতো ভাই আবন ভাই মরখুশ নৌকায় করে স্কুলে যেতাম।
একদিন বৃষ্টির মধ্যে কনু হাজী সাহেবের বাড়ির সামনের ডোবায় একটি বরুণ গাছের ওপর ভেজা একটি ডুপি পাখি বসে ছিল।
আমরা দুজন ঠিক করলাম—পাখিটা ধরব।
কিন্তু পাখি ধরার আগেই শুরু হলো আমাদের মধ্যে ঝগড়া—
পাখিটা কার হবে?
আমরা দুজন পাখি ধরার চেয়ে নিজেদের মধ্যে কে পাখিটা পাবে, তা নিয়েই বেশি ব্যস্ত হয়ে পড়লাম।
সেই সুযোগে পাখিটি ডানা মেলে উড়ে গেল।
শেষ পর্যন্ত পাখিও পেলাম না, ঝগড়ার জয়ও হলো না।
শুধু স্মৃতিটা রয়ে গেল।
আজ এত বছর পর সেই ঘটনা মনে পড়লে আবন ভাইয়ের সঙ্গে হাসতে হাসতে চোখে পানি চলে আসে।
কী অদ্ভুত ছিল আমাদের সেই ছোট্ট পৃথিবী! কত সামান্য জিনিসেই তখন কত আনন্দ!
আজ সবকিছু আছে, অথচ সেই আনন্দটুকু যেন কোথাও নেই।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে গ্রাম বদলে গেছে। আজ সেই গ্রামের বুক চিরে পাকা রাস্তা হয়েছে। বর্ষার পানি আগের মতো আসে না। ইঞ্জিনচালিত যানবাহন চলে। মানুষের জীবন অনেক সহজ হয়েছে।
সভ্যতার স্পর্শে গ্রাম বদলেছে।
কিন্তু সেই কাদামাখা পথ কোথায়?
সেই নৌকার সারি কোথায়?
সেই বাঁশের সাঁকো?
বড়ই গাছের নিচে বসে থাকা সেই মানুষটি?
সেই কিচ্ছার আসর?
শীতের রাতে যাত্রাপালার মঞ্চ?
সেই মানুষগুলো?
তারা সবাই যেন সময়ের বিশাল নদীতে কোথাও হারিয়ে গেছে।
তবুও আমাদের গ্রাম কখনো অন্ধকারে হার মানেনি। অভাব-অনটনের মধ্যেও গ্রামের মানুষ শিক্ষার আলোকে আঁকড়ে ধরেছিল।
ধনু হাজী কাকার ছেলে আব্দুল আউয়াল—আমাদের সাক্কু ভাই—সত্তরের দশকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হয়ে গ্রামের মুখ উজ্জ্বল করেছিলেন। পরে আজিজ কাকার ছেলে রাব্বি ভাইও একই কৃতিত্ব অর্জন করেন।
এই ছোট্ট গ্রাম থেকেই জন্ম নিয়েছেন অসংখ্য ডাক্তার, প্রকৌশলী, শিক্ষক, প্রশাসনিক কর্মকর্তা ও গুণী মানুষ।
আমাদের ইঞ্জিনিয়ার কমল ভাই ছিলেন সবার অত্যন্ত প্রিয়। কিন্তু এক মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় তিনি ও তাঁর সহধর্মিণী পলি ভাবি আমাদের সবাইকে কাঁদিয়ে চলে গেলেন।
তাঁদের মৃত্যুতে শুধু একটি পরিবার নয়, পুরো এলাকাই শোকে স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল।
তখন উপলব্ধি করেছিলাম—কিছু মানুষ শুধু নিজের পরিবারের মানুষ হন না; তাঁরা পুরো সমাজের সম্পদ হয়ে ওঠেন। তাঁদের চলে যাওয়া মানে একটি পরিবারের নয়, একটি সমাজেরও ক্ষতি।
পানি নেমে গেলে কৃষকেরা আবার মাঠে নেমে পড়তেন।
ধান, পাট, সরিষাসহ নানা ফসলের সবুজে চারদিক ভরে উঠত। মাঠের পর মাঠ যেন নতুন জীবনের বার্তা দিত।
প্রকৃতি যেন বলত—
জীবন থেমে থাকে না।
মানুষ হারায়, আবার নতুন মানুষ আসে। ফসল কাটে, আবার নতুন ফসল জন্মায়। নদীর পানি শুকিয়ে যায়, আবার বর্ষায় ফিরে আসে।
শুধু মানুষ আর ফিরে আসে না।
আজ এত বছর পর পেছনে ফিরে তাকালে মনে হয়—জীবন আসলে জন্ম, মৃত্যু, হাসি, কান্না, আনন্দ আর বেদনার এক দীর্ঘ যাত্রা।
যাঁদের একদিন পাশে দেখেছি, তাঁরা আজ কেউ নেই। যাঁদের কণ্ঠে গল্প শুনেছি, তাঁদের কণ্ঠ আজ নীরব। যাঁদের সঙ্গে কাদামাটির পথে হেঁটেছি, তাঁরা কেউ পৃথিবীর অন্য প্রান্তে, কেউ স্মৃতির ওপারে।
আমরাও একদিন চলে যাব।
পৃথিবীও একদিন ধ্বংস হয়ে যাবে। আমাদের ঘরবাড়ি থাকবে না, রাস্তা থাকবে না, সেতু থাকবে না, হয়তো সেই গ্রামটিও থাকবে না আগের মতো।
কিন্তু মানুষের জন্য করা ভালো কাজ, সততা, ভালোবাসা, মায়া, মানবিকতা আর মানুষের হৃদয়ে রেখে যাওয়া স্মৃতি—এসবই হয়তো আমাদের প্রকৃত পরিচয় হয়ে বেঁচে থাকবে।
আজও যখন চোখ বন্ধ করি, তখন দেখি—
দূরে নৌকার সারি।
বৃষ্টিভেজা আকাশ।
কাদামাখা পথ।
বড়ই গাছের নিচে বসে থাকা এক মানুষ।
কেউ কিচ্ছা শুনছে।
কোথাও যাত্রাপালার মঞ্চে আলো জ্বলছে।
দূরে মসজিদের মাইকে ভেসে আসছে ওয়াজের কণ্ঠ।
বর্ষার পানিতে নৌকা দুলছে।
আর সেই নৌকার এক কোণে বসে আছে ছোট্ট আমি—চোখভরা বিস্ময় নিয়ে তাকিয়ে আছি আমার প্রিয় সেই পৃথিবীর দিকে।
আজ সেই পৃথিবী আর নেই।
মানুষগুলো নেই।
সেই পথ নেই।
সেই নৌকা নেই।
সেই দিনগুলোও নেই।
তবুও তারা আমার ভেতরে বেঁচে আছে।
হারিয়ে গেছে সেই সোনালী দিনগুলো, কিন্তু হারিয়ে যায়নি তাদের আলো।
স্মৃতির আকাশে আজও সেই আলো জোনাকির মতো জ্বলে থাকে।
কখনো মৃদু, কখনো উজ্জ্বল, কখনো অশ্রুসিক্ত—
কিন্তু নিভে যায় না।
কখনোই না।
চলবে……

লেখক : কবীর আহমেদ ভূঁইয়া।
রাজনৈতিক ও উন্নয়ন কৌশলবিদ।
প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান, ভূঁইয়া গ্লোবাল ফাউন্ডেশন।

এই বিভাগের আরও সংবাদ