সাহিত্য ও সংস্কৃতি

হারানো সোনালী সেই দিনগুলি… (৯ম পর্ব)

১৯৮৫ সালের পর থেকেই আমার আর আলামিনের আখাউড়ায় যাতায়াত শুরু হয়। পঞ্চম শ্রেণিতে পড়াশোনা শেষ করে আমি ভর্তি হলাম আখাউড়া রেলওয়ে হাই স্কুলে। জীবনের প্রথম বড় স্কুলে ভর্তি হওয়ার সেই স্মৃতি আজও আমার মনে গভীরভাবে গেঁথে আছে।

সেই সময় রেলওয়ে হাই স্কুলে ভর্তি হওয়া মোটেও সহজ ছিল না। ভর্তি প্রক্রিয়ায় ছিল নানা নিয়ম-কানুন। রেলওয়ে কর্মকর্তাদের সন্তানদের জন্য নির্দিষ্ট সুযোগ থাকলেও বাইরের সাধারণ পরিবারের সন্তানদের জন্য আসন ছিল সীমিত। ফলে সেই অল্প কয়েকটি আসনের জন্য তীব্র প্রতিযোগিতা হতো।

প্রথমে লিখিত পরীক্ষা, এরপর ভাইভা, আর সবশেষে স্বাস্থ্য পরীক্ষা—সব ধাপ সফলভাবে পেরিয়ে তবেই একজন শিক্ষার্থী ভর্তি হওয়ার সুযোগ পেত। আলহামদুলিল্লাহ, আমিও সেই কঠিন প্রক্রিয়া সফলভাবে পেরিয়ে আখাউড়া রেলওয়ে সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় ভর্তি হওয়ার সুযোগ পেলাম।

আমার ছোট্ট জীবনে সেটিই ছিল এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা।

স্কুলে ভর্তি হওয়ার পর চারপাশটা যেন হঠাৎ বদলে গেল। নতুন স্কুল, স্কুল ড্রেস, নতুন শিক্ষক, নতুন বন্ধু, নতুন নিয়ম—সবকিছুই ছিল আমার কাছে একেবারে নতুন। জীবনে প্রথমবারের মতো ফুল প্যান্ট পরার সুযোগ হলো। এর আগে আমাদের কোনো নির্দিষ্ট ড্রেস কোড ছিল না।

পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত গ্রামের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করে ষষ্ঠ শ্রেণিতে উঠে সাদা শার্ট, সাদা প্যান্ট পরে নির্দিষ্ট সময়ে স্কুলে যাওয়া—আমার কাছে যেন এক নতুন পৃথিবীতে প্রবেশ করার মতো ছিল।

আমাদের বাড়ি থেকে স্কুলের দূরত্ব ছিল প্রায় তিন কিলোমিটার। প্রতিদিন সেই তিন কিলোমিটার পথ পায়ে হেঁটেই স্কুলে যেতে হতো। সকালে মাথার ওপর সূর্য, বিকেলে ফেরার সময়ও সেই সূর্য। কখনো কাদামাটির পথ, কখনো মেঠো আইল, কখনো মাঠের মধ্য দিয়ে হাঁটা—এই পথই হয়ে উঠেছিল আমার প্রতিদিনের সঙ্গী।

তবে আজ ভাবলে মনে হয়, সেই তিন কিলোমিটারের পথটাই ছিল আমার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর পথ।

কারণ, স্কুলে যাওয়া-আসা শুধু পড়াশোনার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। সেই পথের প্রতিটি বাঁকে, প্রতিটি মাঠে, প্রতিটি গাছের নিচে লুকিয়ে থাকত আমাদের শৈশবের কোনো না কোনো গল্প।

শীতের সকালে গ্রামের মাঠজুড়ে যখন সরিষার ফুল ফুটত, পুরো গ্রামটা যেন হলুদ রঙের চাদরে ঢেকে যেত। সেই হলুদ ফুলের মাঝখান দিয়ে আঁকাবাঁকা মেঠো আইল ধরে আমরা স্কুলের দিকে এগিয়ে যেতাম। চারদিকে সরিষার ফুলের গন্ধ, শিশিরভেজা ঘাস আর নির্মল গ্রামের বাতাস—আজও চোখ বন্ধ করলে সেই দৃশ্য স্পষ্ট দেখতে পাই।

স্কুল থেকে ফেরার পথে অনেক সময় সরিষার পাতা তুলে নিয়ে আসতাম। আম্মা সেই সরিষার পাতা শিং মাছ দিয়ে রান্না করতেন। কী যে স্বাদ ছিল সেই তরকারির!

আজ কত নামী-দামি খাবার খাই, কিন্তু মায়ের হাতের সেই সরিষার পাতা আর শিং মাছের তরকারির স্বাদ আজও আমার জিভে লেগে আছে। মনে হয়, সেই স্বাদের সঙ্গে মিশে ছিল মায়ের মমতা, গ্রামের মাটির গন্ধ আর আমাদের শৈশবের নির্মল আনন্দ।

কখনো গমের খেতের পাশ দিয়ে আসার সময় বথুয়া শাক তুলে নিয়ে আসতাম। আম্মা সেটিও কী যত্ন করে রান্না করতেন! আমরা ভাই-বোনেরা তৃপ্তি করে খেতাম। খাবার শেষে তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলতাম।

তখন খাবারের বৈচিত্র্য হয়তো কম ছিল, কিন্তু আনন্দের কোনো কমতি ছিল না।

কখনো স্কুল থেকে ফেরার পথে কই মাছের উখরি ধরে বাড়ি ফিরতাম। কয়েক সপ্তাহের কই মাছের পোনাকে আমরা বলতাম ‘কইয়ের উখড়ি’। ছোট্ট সেই মাছগুলো রান্না হলে কী যে সুস্বাদু লাগত!

কখনো টাকি মাছের, সোল মাছের বা গজার মাছের পোনা কিংবা মাছের ঝাঁক দেখতে পেলে বাড়ি ফিরে আর স্থির থাকতে পারতাম না। আবার ছুটে যেতাম সেই মাছ ধরতে।

সত্যিই, আমরা ছিলাম সেই অর্থে মাছে-ভাতে বাঙালি।

নিজেদের হাতে মাছ ধরেছি, বাড়িতে নিয়ে এসেছি, আর সেই টাটকা মাছ দিয়ে মায়ের রান্না করা গরম ভাত খেয়েছি। আজকের জীবনে অনেক কিছু পেয়েছি, কিন্তু সেই সহজ-সরল আনন্দ আর কোথাও খুঁজে পাইনি।

জীবন তখন ছোট ছিল, কিন্তু আনন্দ ছিল বিশাল।

সরিষা ক্ষেত, গম ক্ষেত অথবা মাসকলাই ক্ষেতের আইল দিয়ে হেঁটে হেঁটে স্কুলে যেতাম। কখনো কখনো কোনো কোনো জমিতে সবজি চাষ হতো, কোথাও মরিচের চাষ, আবার একটু নিচু জমিতে তৈরি করা হতো জালা ক্ষেত।

‘জালা’ ছিল ধানের বীজতলা। ইরি ধানের চাষের জন্য প্রথমে বীজতলা তৈরি করা হতো। সেখানে ধানের বীজ ফেলে জালা তৈরি করা হতো। জালা বড় হলে সেখান থেকে চারা তুলে মূল জমিতে রোপণ করা হতো।

ধান রোপণের আগে জমিকেও প্রস্তুত করতে হতো। জমিতে পানি দিয়ে কাদামাটি তৈরি করে হাল চাষ করা হতো, এরপর মই দিয়ে জমি সমান করে ইরি ধান চাষের উপযোগী করা হতো। তারপর সারিবদ্ধভাবে কৃষকেরা সেই জমিতে ইরি ধানের চারা রোপণ করতেন।

পুরো প্রক্রিয়াটিই ছিল এক অপূর্ব দৃশ্য।

প্রথমে জালা, তারপর জমি প্রস্তুত, এরপর ধান রোপণ। পরবর্তীতে ধানের গাছগুলো যখন একটু বড় হতো, আর মাঠজুড়ে যখন সবুজের সমারোহ দেখা দিত—কী যে সুন্দর লাগত সেই দৃশ্য! চারদিকে শুধু সবুজ আর সবুজ। মনে হতো, প্রকৃতি যেন দিগন্তজুড়ে সবুজের চাদর বিছিয়ে রেখেছে।

ধান গাছ যখন আরও বড় হতো এবং ধানে ফলন আসতে শুরু করত, তখন মাঠের সৌন্দর্য যেন আরও বেড়ে যেত। প্রতিটি গাছের মধ্যে ধানের থোড় দুলত, আর পুরো মাঠজুড়ে তৈরি হতো এক অপূর্ব সৌন্দর্য।

এরপর যখন ধান পাকতে শুরু করত, তখন সেই দৃশ্য হয়ে উঠত আরও মধুময়। চারদিক ধীরে ধীরে সোনালি রং ধারণ করত। কৃষকদের মনেও তখন হাসির ঝিলিক দেখা দিত। তারা অপেক্ষা করতেন—কখন এই পাকা ধান কেটে বাড়িতে নিয়ে আসবেন।

তবে ধান কাটার পরও ছিল দীর্ঘ পরিশ্রমের আরেক অধ্যায়।

ধান কেটে বাড়িতে এনে ধানের মুঠগুলো সারিবদ্ধভাবে গুছিয়ে রাখা, এরপর মাড়াই করে খড় থেকে ধান আলাদা করা, ধান সিদ্ধ করা, সিদ্ধ ধান আবার রোদে শুকানো এবং সবশেষে সেই শুকনো ধান গোলায় তুলে রাখা—প্রতিটি ধাপেই ছিল কৃষকের অক্লান্ত পরিশ্রম।

কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, সেই কঠোর পরিশ্রমের মধ্যেও কৃষকদের মুখে লেগে থাকত হাসি।

একজন কৃষক হিসেবে আমার বাবার পরিশ্রম এবং পাশাপাশি আমার মায়ের সহযোগিতার সেই দৃশ্য আজও আমার চোখে ভাসে। তাঁদের শ্রম, ভালোবাসা আর সংগ্রামের মধ্যেই যেন আমাদের শৈশবের সুখের দিনগুলো গড়ে উঠেছিল।

আজ মনে হয়, বাংলাদেশের প্রতিটি অঞ্চলের কৃষকদের যদি আরও একটু যত্ন, সহযোগিতা ও আধুনিক সুযোগ-সুবিধা দেওয়া যেত, তাহলে দেশের কৃষি উৎপাদন আরও বহুগুণ বাড়তে পারত।

আমার মনে পড়ে সেই চমৎকার সময়গুলোর কথা—যে সময়গুলো আমি পেরিয়ে এসেছি, কিন্তু আমার সন্তানেরা যার কিছুই জানে না।

সময় এত দ্রুত বদলে গেছে যে, আজ তাদের কাছে এসব গল্প বললে অনেক সময় রূপকথার মতো মনে হয়। কিন্তু এটাই ছিল বাস্তব। এটাই ছিল আমাদের জীবন। এটাই ছিল আমাদের শৈশব।

আজ যখন পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন শহরে ঘুরে বেড়াই, শহরের চাকচিক্য, আভিজাত্য আর আধুনিক জীবন দেখি, তখন বারবার মনে পড়ে আমার সেই গ্রাম্য জীবনের কথা—যেখানে ছিল অল্পে তুষ্টি, নির্মল আনন্দ আর অফুরন্ত সুখ।

এত চাকচিক্য, এত আভিজাত্য, এত আধুনিকতার মাঝেও সেই সুখ খুঁজে পাওয়া যায় না।

তাই আমি বারবার ফিরে যাই আমার স্মৃতির কাছে। খুঁজে ফিরি সেই শৈশবের দিনগুলো, সেই সুমধুর সময়গুলো, সেই মেঠো পথ, সরিষার ক্ষেত, ধানের মাঠ, মায়ের রান্নার গন্ধ আর বাবার ঘামে ভেজা পরিশ্রমের স্মৃতি।

আমি চাই, আমার লেখনীর মাধ্যমে আমার সন্তানদের কাছে আমার সেই শৈশবকে পরিচিত করে তুলতে। তারা জানুক—তাদের বাবার শৈশব কেমন ছিল, কীভাবে কেটেছিল সেই সোনালি দিনগুলো।
চলবে…

লেখক : কবীর আহমেদ ভূঁইয়া।
আন্তর্জাতিক ব্যবসায়ী, রাজনৈতিক ও উন্নয়ন কৌশলবিদ।
প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান, ভূঁইয়া গ্লোবাল ফাউন্ডেশন।

এই বিভাগের আরও সংবাদ