অনির্দিষ্টকালের জন্য উত্তরার ৫ পোশাক কারখানা বন্ধ ঘোষণা


মনির হোসেন জীবন/ শহিদুল ইসলাম সাগর : রপ্তানিমুখি পোশাক কারখানায় কর্মরত পোশাক শ্রমিকদের মাসিক বকেয়া বেতন বৃদ্ধি, নূন্যতম বেতন ১২ হাজার ৫০০ টাকার পরিবর্তে ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণ, শ্রমিক ছাঁটাই ও নির্যাতন বন্ধ, বন্ধ কারখানা চালু, গাড়ির জ্বালানি তৈল, গ্যাস, বিদ্যুৎসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম কমানো সহ বিভিন্ন দাবিতে আজ বৃহস্পতিবার সকাল ৯টা থেকে দক্ষিণখান ও উত্তরার পোশাক শ্রমিকেরা চতুর্থ দিনের মতো ঢাকা ময়মনসিংহ মহাসড়কে অবস্থান নিয়ে অবরোধ ও বিক্ষোভ করেছে। প্রায় চার ঘণ্টা অবরোধের পর আজ বৃহস্পতিবার দুপুর ১২টার পর রাজধানীর উত্তরার আজমপুর ও বিএনএস সেন্টার সড়ক থেকে পোশাক শ্রমিকদের সরিয়ে দিয়েছে পুলিশ। এসময় হঠাৎ করে শ্রমিকরা সড়কে আজমেরী গ্লোরী বাসের সামনের গ্লাস ভাঙচুরের চেষ্টা কালে আন্দোলন উত্তপ্ত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। তখনই শুরু হয় শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ।

পরবর্তীতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা উত্তরা আজমপুরে সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ, মৃদু লাঠিচার্জ, পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ, ধাওয়া দিয়ে আন্দোলনরত কয়েকশত গার্মেন্টস শ্রমিকদের মহাসড়ক অবরোধ ছত্রভঙ্গ করে দেয়। এসময় পুলিশ সদস্য, গার্মেন্টস শ্রমিক, বাসযাত্রী ও পথচারীসহ অনেকেই আহত হয়। পুলিশি বাঁধারমুখে বৃহস্পতিবার দুপুর ১২টার পর সকল ধরনের যান চলাচল স্বাভাবিক হয়।
এদিকে পোশাক শ্রমিকদের ধর্মঘট ও কর্মস্থলে উত্তেজনাকর পরিস্থিতি সৃষ্টির অভিযোগে রাজধানীর উত্তরায় রপ্তানীমুখী পাঁচটি পোশাক কারখানা অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করেছে কর্তৃপক্ষ।
বন্ধ ঘোষণা করা কারখানাগুলোর মধ্যে রয়েছে – ভার্সেটাইল ফ্যাশনস (প্রা.) লিমিটেড, এমব্রেলা লিমিটেড, নাইস অ্যাপারেলস ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড, ড্যাজলিং ড্রেসেস লিমিটেড ও ওলিও অ্যাপারেলস লিমিটেড প্রমুখ ।
আজ বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) ডিএমপির উত্তরা পশ্চিম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) খালিদ মনসুর এসব তথ্যের সত্যতা এ প্রতিবেদককে নিশ্চিত করেছেন।
পথচারী, পুলিশ, গার্মেন্টস শ্রমিক ও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, শ্রমিকদের সরাতে পুলিশ লাঠিচার্জ ও সাউন্ড গ্রেনেড ব্যবহার করে। এ সময় ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ায় কয়েকজন শ্রমিক আহত হন। উত্তেজিত শ্রমিকরা বেশ কয়েকটি যানবাহনও ভাঙচুর করে। উক্ত ঘটনার পরে দুপুর ১২টার অল্প কিছু সময় পর ঢাকা ময়মনসিংহ মহাসড়কে পুলিশের উপস্থিতে সকল ধরনের যান চলাচল স্বাভাবিক হতে শুরু করে বলে জানিয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
জানা যায়, ন্যূনতম মজুরিবৃদ্ধি, সময়মতো বেতন ও ভাতা পরিশোধ এবং ইচ্ছামতো ছাঁটাই বন্ধের দাবিতে বৃহস্পতিবার সকাল ৯টার পর রাজধানীর উত্তরার আজমপুর, বিএনএস সেন্টার ও রাজলক্ষ্মী অংশে মহাসড়ক অবরোধ ও বিক্ষোভ মিছিল করার সময় শ্রমিকরা পুলিশের বাঁধার সম্মুখীন হয়। অবরোধের কারণে মহাসড়কের উভয় পাশে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়। এতে সাধারণ যাত্রী ও দূরপাল্লার বাসের যাত্রীরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা আটকে থাকেন।
পোশাক শ্রমিক হাসি আক্তার, সুমি ও মুক্তার হোসেন অভিযোগ করে বলেন, বর্তমানে বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্যের দাম খুব চড়া। পণ্যের উচ্চ মূল্যের বাজারে ১০ হাজার ৫০০ টাকার মাসিক বেতনে সংসার চালানো অসম্ভব হয়ে পড়েছে। বকেয়া পরিশোধ ও নির্দিষ্ট দাবিতে বারবার সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলেও কোনো ধরনের সুরাহা না পাওয়ায় তাঁরা বাধ্য হয়ে রাজপথে নেমেছেন।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা জানান, পোশাক শ্রমিকেরা দীর্ঘ সময় মহাসড়কে অবস্থান নেওয়াযর কারণে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। অনুরোধের পরও তাঁরা রাস্তা থেকে সরে না যাওয়ায় ধাওয়া দিয়ে ও সাউন্ড গ্রেনেড ছুড়ে তাঁদের সড়ক থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। এরপর দুপুর ১২টার পর রাস্তায় যান চলাচল স্বাভাবিক করা হয়।
একই দাবিতে গত মঙ্গল ও বুধবার দক্ষিণ খান ও উত্তরা এলাকার পোশাক শ্রমিক (তাঁরা) সড়ক অবরোধ ও বিক্ষোভ করেন। টানা ৩/৪ দিন ধরে চলা পোশাক শ্রমিকদের সড়কে বিক্ষোভের কারণে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলোতে যান চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছিল। বিশেষ করে আজমপুর, হাউজ বিল্ডিং, বিএনএস সেন্টার ও রাজলক্ষ্মীসংলগ্ন এলাকায় যানবাহন চলাচল পুরোপুরি বন্ধ থাকায় উত্তরা থেকে শুরু করে বিমানবন্দর সড়ক পর্যন্ত তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়েছে। এর ফলে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন অফিসগামী মানুষ, সাধারণ যাত্রী ও পথচারীরা।
অবরোধের কারণে যান চলাচল ব্যাহত হওয়ায় সড়কে আটকা পড়ে নির্ধারিত সময়ে গন্তব্যে পৌঁছাতে দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে যাত্রীদের।
এবিষয়ে উত্তরা জোনের সহকারী পুলিশ কমিশনার আরিফুল ইসলাম রনি সাংবাদিকদের জানান, উত্তরার আজমপুর মহাসড়ক থেকে পোশাক শ্রমিকদের সরাতে পুলিশ মৃদু লাঠিচার্জ করে এবং কয়েকটি সাউন্ড গ্রেনেড ব্যবহার করেছে। এতে শ্রমিকরা সড়ক ছেড়ে চলে যান।
উত্তরার ৫ পোশাক কারখানা বন্ধ ঘোষণা :
শ্রমিকদের ধর্মঘট ও কর্মস্থলে উত্তেজনাকর পরিস্থিতি সৃষ্টির অভিযোগে রাজধানীর উত্তরায় পাঁচটি পোশাক কারখানা অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করেছে কর্তৃপক্ষ।
আজ বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) জারি করা নোটিশে বাংলাদেশ শ্রম আইন-২০০৬-এর ১৩(১) ধারা অনুযায়ী কারখানাগুলোর নিরাপত্তা বিভাগ ছাড়া অন্য সব বিভাগের কার্যক্রম বন্ধের কথা জানানো হয়।
বন্ধ ঘোষণা করা কারখানাগুলো হলো ভার্সেটাইল ফ্যাশনস (প্রা.) লিমিটেড, এমব্রেলা লিমিটেড, নাইস অ্যাপারেলস ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড, ড্যাজলিং ড্রেসেস লিমিটেড ও ওলিও অ্যাপারেলস লিমিটেড।
নোটিশে বলা হয়, গত ১২ থেকে ১৪ অক্টোবর পর্যন্ত তিন দিন কিছু শ্রমিক বিভিন্ন দাবি তুলে কর্মস্থলে উপস্থিত হয়েও কাজ না করে ধর্মঘট পালন করেন। এ সময় কর্তৃপক্ষের কাজে ফেরার অনুরোধ উপেক্ষা করে উত্তেজনাকর ও ভীতিকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করা হয় বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
এতে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জীবনের নিরাপত্তা এবং কারখানার সম্পদ ঝুঁকির মুখে পড়ে। এ পরিস্থিতিতে স্বাভাবিক কার্যক্রম পরিচালনা অসম্ভব হয়ে পড়ায় কারখানা বন্ধের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে নোটিশে উল্লেখ করা হয়।
পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত নিরাপত্তা বিভাগ ছাড়া কারখানাগুলোর অন্য সব বিভাগের কার্যক্রম বন্ধ থাকবে। কারখানাগুলো পুনরায় চালুর তারিখ ও সময় পরে নোটিশের মাধ্যমে জানানো হবে।



