রাঙ্গাবালীতে ফারহানার মৃত্যু ঘিরে রহস্য, আত্মহত্যা নাকি খুন?


এম এ ইউসুফ আলী, স্টাফ রিপোর্টারঃপটুয়াখালীর রাঙ্গাবালীতে ফারহানা ইয়াসমিন শীলা (৪৩) নামে এক নারীর মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। শুক্রবার দুপুরে উপজেলার সদর ইউনিয়নের বাহেরচর বাজার এলাকার নিজ বসতঘর থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পরে সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করে ময়নাতদন্তের জন্য পটুয়াখালী মর্গে পাঠানো হয়।
নিহতের পরিবারের দাবি, এটি আত্মহত্যা নয়, তাকে হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে। এ ঘটনায় তার স্বামী রাসেল বয়াতীর বিরুদ্ধে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন স্বজনেরা। তবে রাসেলের দাবি, তার স্ত্রী গলায় ওড়না পেঁচিয়ে আত্মহত্যা করেছেন।
নিহত ফারহানা রাঙ্গাবালী উপজেলা বিএনপির প্রয়াত সাধারণ সম্পাদক সাজাদুল ইসলাম শামীম স্যারের মেয়ে। তার স্বামী রাসেল বয়াতী উপজেলা যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক। প্রায় এক বছর আগে তাদের বিয়ে হয়। দুজনেরই এটি দ্বিতীয় বিয়ে। ফারহানার রাফিন (১৭) ও লাবিবা (১৩) নামে দুই সন্তান রয়েছে। ছেলে পটুয়াখালীতে পড়াশোনা করে। মেয়ে মায়ের সঙ্গে থাকত।
নিহত ফারহানার ভাই রাইসুল ইসলাম কমল বলেন, ফারহানা আত্মহত্যা করেননি, তাকে হত্যা করা হয়েছে বলে তাদের সন্দেহ। ঘটনার রাতেও পরিবারের সবার সঙ্গে তিনি হাসিখুশি ছিলেন। ফারহানার জমিজমা বিক্রি করে টাকা চাইতেন তার স্বামী রাসেল। তাকে গলাটিপে বা শ্বাসরোধ করে হত্যার পর ওড়না দিয়ে ঝুলিয়ে রাখা হয়ে থাকতে পারে বলে তাদের ধারণা। কোন মানুষ গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যার সময় বাঁচার চেষ্টা করলে যে ধরনের আলামত থাকার কথা, তেমন কিছু তারা দেখতে পাননি। পরিবারের পক্ষ থেকে ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও দোষীর বিচার দাবি করেন তিনি।
ফারহানার আরেক ভাই রাশেদুল ইসলাম সজল ও চাচাতো ভাই জাহিদুল ইসলাম সাগর বলেন, পরিবারের কাউকে না জানিয়ে এবং আশপাশের কাউকে অবহিত না করে রাসেল কেন মরদেহ নামিয়েছেন, তা নিয়ে তাদের সন্দেহ রয়েছে। রাসেল নিজেই মরদেহ নামিয়ে ফেলেছেন।
ফারহানার মেয়ে লাবিবার বরাত দিয়ে সজল ও কমল জানান, ফারহানা ও রাসেলের মধ্যে প্রায়ই ঝগড়াঝাঁটি হতো। ফারহানাকে মারধর করা হতো। কখনো ঘরের দরজা বন্ধ করে দেওয়া হতো। তখন ফারহানা বাইরে বসে কান্নাকাটি করতেন। পরে রাসেল বাইরে গেলে দরজা খুলে লাবিবা তার মাকে ঘরে তুলতেন।
অন্যদিকে নিহত ফারহানার পরিবারের অভিযোগ অস্বীকার করে যুবদল নেতা রাসেল বয়াতী বলেন, ফারহানার সঙ্গে তার এক বছরের সংসার। বুধবার রাতে রাসেল বাসায় গিয়ে মোবাইল ফোন ব্যবহার করলে তাদের মধ্যে সামান্য মনমালিন্য হয়। তবে পরে একসাথেই ঘুমিয়ে পড়েন৷ কিন্তু তাদের মধ্যে কথা কম হয়েছে। বৃহস্পতিবার রাতেও খাওয়া-দাওয়া করে দুজন একসঙ্গেই ঘুমাতে যান। রাত ১২টার পর তিনি ঘুমিয়ে পড়েন। শুক্রবার ভোর পাঁচটার দিকে ফারহানা নামাজ পড়তে উঠেছেন বলে তিনি টের পান। পরে সকাল পৌনে ৮টার দিকে ঘুম থেকে উঠে স্ত্রীকে ঘরে না পেয়ে খোঁজাখুঁজি শুরু করেন। একপর্যায়ে ঘরের অন্য একটি কক্ষে ওড়না দিয়ে ঝুলন্ত অবস্থায় ফারহানাকে দেখতে পান। পরে পাশের বাড়ির এক দম্পতিকে ডেকে আনেন। তবে তারা ঘটনাটি দেখে কাছে যাননি। পরে চাচাতো ভাই সোহানকে নিয়ে নিজেই ফারহানাকে নামিয়ে বিছানায় শুইয়ে দেন। কিন্তু ফারহানা কি কারণে আত্মহত্যা করেছেন, তা তিনি জানেন না।
এ ব্যাপারে রাঙ্গাবালী থানার ওসি (তদন্ত) ইলিয়াস হোসেন মুন্সি বলেন, স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে পারিবারিক কলহের তথ্য পাওয়া গেছে। নিহতের মেয়ে রাসেল-ফারহানার মধ্যে প্রায়ই ঝগড়া হওয়ার কথা জানিয়েছেন। মৃত্যুর আগের দিনও তাদের মধ্যে ঝগড়া হয়েছিল বলে জানা গেছে । ফারহানা সারাদিন স্বামীর সঙ্গে কথা বলেননি বলেও তথ্য পাওয়া গেছে। অন্যদিকে, স্বামী রাসেল বয়াতীর দাবি, তার স্ত্রী গলায় ওড়না পেঁচিয়ে আত্মহত্যা করেছেন। সকালে তাকে ঝুলন্ত অবস্থায় দেখতে পেয়ে তিনি মরদেহ নামান।
ওসি (তদন্ত) আরও বলেন, পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে মরদেহ ঝুলন্ত অবস্থায় পায়নি। সন্দেহ দূর করতে এবং মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানতে মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানো হয়েছে। এ ঘটনায় নিহতের ভাই রাইসুল ইসলাম কমল বাদী হয়ে থানায় একটি অপমৃত্যু মামলা করেছেন। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়ার পর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানা যাবে। প্রতিবেদনে অস্বাভাবিক কিছু পাওয়া গেলে সে অনুযায়ী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।



