ক্যাম্পাস

শিক্ষক স্বল্পতায় ফল প্রকাশে দীর্ঘসূত্রিতা: সেশনজটে জবির আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউটের শিক্ষার্থীরা

জবি প্রতিবেদক, রাফীদ আদ দ্বীন রাঈম: জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি) আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউটে বিভিন্ন ব্যাচের পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশে দীর্ঘসূত্রিতার কারণে শিক্ষার্থীদের মধ্যে উদ্বেগ, হতাশা ও ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। সময়মতো ফলাফল প্রকাশ না হওয়ায় একদিকে যেমন শিক্ষার্থীদের একাডেমিক কার্যক্রম দীর্ঘায়িত হচ্ছে, অন্যদিকে চাকরি ও উচ্চশিক্ষার সুযোগ নিয়েও অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়তে হচ্ছে তাদের। ফলে ধীরে ধীরে সেশনজটের আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে ইনস্টিটিউটটিতে।

শিক্ষার্থীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ইনস্টিটিউটে বর্তমানে মোট ছয়টি ব্যাচের একাডেমিক কার্যক্রম চলমান। এর মধ্যে ১৫ ব্যাচের একাডেমিক কার্যক্রম আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ হয়েছে। ১৬ ব্যাচের চতুর্থ বর্ষ দ্বিতীয় সেমিস্টারের পরীক্ষা গত ডিসেম্বর মাসে শেষ হলেও প্রায় ৮–৯ মাস পার হয়ে যাওয়ার পরও এখনো ফলাফল প্রকাশিত হয়নি। দীর্ঘ এই সময়ে অসংখ্য চাকরির নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত হয়েছে। এসব নিয়োগে আবেদন করার ক্ষেত্রে অনার্স সম্পন্নের প্রমাণ বা ফলাফল প্রয়োজন হওয়ায় ফল প্রকাশে বিলম্বের কারণে অনেক শিক্ষার্থী গুরুত্বপূর্ণ চাকরির সুযোগ থেকে বঞ্চিত হওয়ার আশঙ্কা করছেন।

এদিকে ১৭, ১৮ ও ১৯ ব্যাচের পরীক্ষাও রোজার আগেই শেষ হয়েছে। পরীক্ষা শেষ হওয়ার পর প্রায় পাঁচ মাসের কাছাকাছি সময় পার হলেও এসব ব্যাচের ফলাফল প্রকাশের বিষয়ে শিক্ষার্থীরা কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা জানতে পারছেন না। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, ১৬, ১৭, ১৮ ও ১৯ ব্যাচের ক্লাসও জুন মাসের মধ্যেই শেষ হয়েছে। এরপর জুলাই ও আগস্ট মাস পার হয়ে গেলেও ফলাফল প্রকাশের অগ্রগতি সম্পর্কে তাদের কাছে স্পষ্ট কোনো তথ্য নেই।

একই সময়ে ২০ ও ২১ ব্যাচের একাডেমিক কার্যক্রমও শেষ পর্যায়ে রয়েছে। ফলে একাধিক ব্যাচের ক্লাস ও পরীক্ষা শেষ হওয়ার পরও ফলাফল প্রকাশে এত দীর্ঘ সময় লাগায় ভবিষ্যতে আরও বড় ধরনের সেশনজট তৈরি হওয়ার আশঙ্কা করছেন শিক্ষার্থীরা।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউটের এক শিক্ষার্থী বলেন, ‘এই বিভাগে ভর্তি হওয়ার পর থেকেই একাডেমিক বিভিন্ন বিষয়ে আমরা নানা সমস্যার সম্মুখীন হয়ে আসছি। তবে আমাদের অনেক শিক্ষক বিভিন্ন সময়ে শিক্ষার্থীবান্ধব ছিলেন এবং সহযোগিতা করেছেন। এ কারণে এতদিন অনেক বিষয় নিয়ে আমরা প্রকাশ্যে কিছু বলিনি। কিন্তু বর্তমানে ফলাফল প্রকাশে যে দীর্ঘসূত্রিতা দেখা যাচ্ছে, তা নিয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে যথেষ্ট উদ্বেগ ও হতাশা তৈরি হয়েছে।’

শিক্ষার্থীরা জানান, একটি পরীক্ষার খাতা মূল্যায়ন, ফলাফল প্রস্তুত ও প্রকাশের ক্ষেত্রে একাডেমিক ও প্রশাসনিক কিছু প্রক্রিয়া রয়েছে—এ বিষয়টি তারা বুঝতে পারেন। শিক্ষক ও বিভাগীয় কর্তৃপক্ষের নিজস্ব কাজের চাপও রয়েছে। তবে একটি সেমিস্টারের ফলাফল প্রকাশে ৫ থেকে ৯ মাসের মতো সময় লাগাকে তারা কোনোভাবেই স্বাভাবিক বা গ্রহণযোগ্য মনে করছেন না।

১৬ ব্যাচের এক শিক্ষার্থী বলেন, ‘অনার্স শেষ করার পর একজন শিক্ষার্থীর সামনে চাকরি, উচ্চশিক্ষা, পরিবার ও ভবিষ্যৎ নিয়ে নানা পরিকল্পনা থাকে। অনেক শিক্ষার্থী পরিবারের আর্থিক চাপের কারণে অনার্স শেষ করেই চাকরিতে প্রবেশ করতে চায়। কিন্তু ফলাফল প্রকাশ না হওয়ায় যদি চাকরির আবেদনের সুযোগ হারাতে হয়, তাহলে এর দায়ভার কে নেবে?’

শিক্ষার্থীদের আরও অভিযোগ, একটি সেমিস্টারের কোর্স শেষ হওয়ার পর দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করে পরীক্ষা দেওয়া এবং এরপর আবার মাসের পর মাস ফলাফলের জন্য অপেক্ষা করা তাদের ওপর বাড়তি মানসিক চাপ তৈরি করছে। তাদের ভাষ্য, তারা শুধু একটি রোল নম্বর বা ফলাফলের অপেক্ষায় থাকেন না; এর সঙ্গে তাদের ভবিষ্যৎ, ক্যারিয়ার, স্বপ্ন এবং পরিবারের প্রত্যাশাও জড়িত।

শিক্ষার্থীরা আরও বলেন, তারা কোনো শিক্ষক বা বিভাগীয় কর্তৃপক্ষকে অসম্মান করতে চান না। বরং শিক্ষার্থীদের সমস্যাগুলোকে গুরুত্ব দিয়ে দ্রুত ফলাফল প্রকাশের কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ এবং ভবিষ্যতে ফলাফল প্রকাশে এমন অস্বাভাবিক দীর্ঘসূত্রিতা এড়ানোর দাবি তাদের।

এ বিষয়ে আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউটের পরিচালক সহযোগী অধ্যাপক দেবাশীষ বিশ্বাস বলেন, “আমরা বিষয়টি নিয়ে কাজ করছি। ইতোমধ্যে গত রোববার (২৩ আগস্ট) ফলাফল পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক দপ্তরে (এক্সামিনেশন কন্ট্রোলার অফিস) পাঠানো হয়েছে। তারা ফলাফল প্রকাশ করলেই শিক্ষার্থীরা তা পেয়ে যাবে।”

ফলাফল প্রকাশে পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক দপ্তরের পক্ষ থেকে কোনো ধরনের বিলম্ব হয়েছে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “না, আমাদের শিক্ষকের স্বল্পতার কারণে ফলাফল পাঠাতে দেরি হয়েছে।”

শিক্ষক স্বল্পতার বিষয়টি সমাধানে কী ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।” দ্রুত সময়ের মধ্যে শিক্ষক স্বল্পতার সমস্যার সমাধান হবে বলেও আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।

এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক দপ্তরের নিয়ন্ত্রক (অতিরিক্ত দায়িত্ব) অধ্যাপক ড. মোস্তফা হাসান বলেন, “তারা এইমাত্র আমার সঙ্গে এ বিষয়ে কথা বলে গেলেন। তাদের ফলাফল সংক্রান্ত কাজে একটি টেকনিক্যাল ভুল হয়েছিল। বিষয়টি ইতোমধ্যে সমাধান করা হয়েছে। আশা করছি, কয়েক দিনের মধ্যেই ফলাফল প্রকাশ করা সম্ভব হবে।”

গত রোববার (২৩ আগস্ট) আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউটের পক্ষ থেকে ফলাফল পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক দপ্তরে পাঠানো হয়েছিল কি না—এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “তারা ফলাফলের বিষয়টি নিয়ে আজকেই আমার সঙ্গে দেখা করেছেন। এর আগে এ বিষয়ে তাদের সঙ্গে আমার কোনো কথা হয়নি।”

শিক্ষার্থীদের প্রশ্ন, একটি পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশ করতে এত দীর্ঘ সময় কেন প্রয়োজন হচ্ছে। তাদের মতে, শিক্ষার্থীদের জীবন, সময় ও ভবিষ্যৎ অত্যন্ত মূল্যবান। তাই ১৬, ১৭, ১৮ ও ১৯ ব্যাচের দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে দ্রুত ফলাফল প্রকাশের পাশাপাশি ভবিষ্যতে নিয়মিত সময়ের মধ্যে ফল প্রকাশ নিশ্চিত করা জরুরি।

শিক্ষার্থীদের আশঙ্কা, দ্রুত ফলাফল প্রকাশ না হলে একের পর এক ব্যাচের একাডেমিক কার্যক্রম জমে গিয়ে আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউটে সেশনজট আরও প্রকট হতে পারে। তাই বিষয়টি দ্রুত সমাধানে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও ইনস্টিটিউট কর্তৃপক্ষের কার্যকর পদক্ষেপ প্রত্যাশা করছেন তারা।

এই বিভাগের আরও সংবাদ