ইসলাম

সিজদায় নাক মাটিতে না লাগালে কি নামাজ হবে?

নামাজ ইসলামের দ্বিতীয় স্তম্ভ এবং একজন মুসলিমের দৈনন্দিন জীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ ইবাদত। এই নামাজের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রুকন হলো সিজদা— যে মুহূর্তে বান্দা সর্বোচ্চ বিনয়ের সঙ্গে আল্লাহ তাআলার সামনে নিজেকে নত করে। সিজদা শুধু একটি শারীরিক ভঙ্গি নয়; এটি আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আনুগত্য, আত্মসমর্পণ এবং ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ।

অনেক মুসল্লির মনে একটি প্রশ্ন আসে— যদি সিজদার সময় কপাল মাটিতে লাগে, কিন্তু নাক মাটিতে না লাগে, তাহলে কি সিজদা ও নামাজ শুদ্ধ হবে?

ফিকহবিদদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, যদি কপাল দ্বারা সিজদা সম্পন্ন হয়, তাহলে ফরজ সিজদা আদায় হয়ে যায় এবং নামাজ শুদ্ধ হয়। তবে ইচ্ছাকৃতভাবে কোনো ওজর ছাড়া নাক মাটিতে না লাগানো সুন্নতের খেলাফ এবং অধিকাংশ ফকিহের মতে মাকরুহ (অপছন্দনীয়)।

অন্যদিকে, যদি জখম, ব্যথা, অস্ত্রোপচার বা অন্য কোনো বাস্তব ওজর থাকে, তাহলে নাক মাটিতে স্পর্শ করাতে না পারলেও নামাজে কোনো অসুবিধা নেই।

রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সিজদার পদ্ধতি

হজরত ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—

أُمِرْتُ أَنْ أَسْجُدَ عَلَى سَبْعَةِ أَعْظُمٍ: عَلَى الْجَبْهَةِ وَأَشَارَ بِيَدِهِ عَلَى أَنْفِهِ، وَالْيَدَيْنِ، وَالرُّكْبَتَيْنِ، وَأَطْرَافِ الْقَدَمَيْنِ

‘আমাকে সাতটি অঙ্গের ওপর সিজদা করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে—কপাল (এ কথা বলে তিনি নাকের দিকেও ইশারা করেন), দুই হাত, দুই হাঁটু এবং দুই পায়ের আঙুলের অগ্রভাগ।’ (বুখারি ৮১২, মুসলিম ৪৯০)

হজরত আবু হুমাইদ আস-সায়িদী (রা.) বর্ণনা করেন—

كَانَ إِذَا سَجَدَ أَمْكَنَ أَنْفَهُ وَجَبْهَتَهُ مِنَ الْأَرْضِ

‘রাসুলুল্লাহ (সা.) যখন সিজদা করতেন, তখন তিনি তার কপাল ও নাক ভালোভাবে মাটিতে স্থাপন করতেন।’ (তিরমিজি ২৭০)

সিজদা—আল্লাহর সবচেয়ে নিকটবর্তী হওয়ার মুহূর্ত

রাসুলুল্লাহ (সা.) সিজদার মর্যাদা সম্পর্কে বলেছেন—

أَقْرَبُ مَا يَكُونُ الْعَبْدُ مِنْ رَبِّهِ وَهُوَ سَاجِدٌ، فَأَكْثِرُوا الدُّعَاءَ

‘বান্দা তার রবের সবচেয়ে নিকটে থাকে যখন সে সিজদায় থাকে। তাই তোমরা সিজদায় বেশি বেশি দোয়া কর।’ (মুসলিম ৪৮২)

কুরআনে সিজদার নির্দেশ

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا ارْكَعُوا وَاسْجُدُوا وَاعْبُدُوا رَبَّكُمْ

‘হে ঈমানদারগণ! তোমরা রুকু করো, সিজদা করো এবং তোমাদের রবের ইবাদত করো।’ (সুরা আল-হাজ্জ: আয়াত ৭৭)

মুসলিমের করণীয়

সিজদায় কপাল ও নাক—উভয়ই মাটিতে লাগানোর চেষ্টা করা।
সাতটি অঙ্গের ওপর সুন্নাহ অনুযায়ী সিজদা করা।
সিজদায় বেশি বেশি দোয়া ও ইস্তিগফার করা।
ওজর না থাকলে নাক মাটিতে না লাগানোর অভ্যাস পরিহার করা।
নামাজের প্রতিটি রুকন রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর শিক্ষা অনুযায়ী আদায় করার চেষ্টা করা।

সিজদা হলো একজন মুমিনের জন্য আল্লাহর সবচেয়ে নিকটবর্তী হওয়ার অনন্য মুহূর্ত। তাই সিজদাকে শুধু নামাজের একটি আনুষ্ঠানিক অংশ হিসেবে নয়, বরং আন্তরিক আত্মসমর্পণ ও বিনয়ের প্রতীক হিসেবে আদায় করা উচিত। কপালের পাশাপাশি নাকও মাটিতে স্থাপন করা রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহ এবং সিজদার পূর্ণাঙ্গ আদব। যদিও ওজর ছাড়া কেবল কপালের ওপর সিজদা করলে অধিকাংশ ফকিহের মতে নামাজ শুদ্ধ হয়ে যায়, তবু সুন্নাহ অনুযায়ী কপাল ও নাক উভয়ই মাটিতে রেখে সিজদা করাই উত্তম ও পরিপূর্ণ আমল।

আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহ অনুসারে খুশু-খুজুর সঙ্গে সালাত আদায় করার এবং প্রতিটি সিজদাকে তার নৈকট্য অর্জনের মাধ্যম বানানোর তৌফিক দান করুন। আমিন।

এই বিভাগের আরও সংবাদ