জাতীয়

অপরাধীকে রাজনৈতিক অ্যাফিলিয়েশন দেখে ছাড় দেওয়ার কোন সুযোগ নেইঃ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

অপরাধ দমন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় সরকারের ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির কথা পুনর্ব্যক্ত করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, অপরাধী সে অপরাধীই, কোনো রাজনৈতিক পরিচয় বা দলীয় অ্যাফিলিয়েশন দেখে ছাড় দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। তিনি বলেন, অপরাধী যে-ই হোক না কেন, তার বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

মন্ত্রী আজ সিলেটের সার্কিট হাউজ মিলনায়তনে সিলেট জেলা প্রশাসন আয়োজিত ‘জেলার সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও উন্নয়ন সংক্রান্ত মতবিনিময় সভা’য় প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন।

মন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে সিলেট অঞ্চলের সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজ, মাদক ব্যবসায়ী ও চোরাচালানিদের তালিকা সম্পূর্ণ নির্মোহভাবে তৈরির নির্দেশ দেন। তিনি বলেন, স্থানীয়ভাবে অপরাধীদের পরিচয় সবার জানা আছে। তাই তালিকায় যেন কোনো নিরীহ মানুষকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে হয়রানি করার জন্য না ঢোকানো হয় এবং কোনো প্রকৃত অপরাধীকে যেন রাজনৈতিক বিবেচনায় বাদ না দেওয়া হয়। আগামী এক মাসের মধ্যে এই নির্দেশনার দৃশ্যমান ফলাফল উপস্থাপনের জন্য দায়িত্বপ্রাপ্তদের নির্দেশ দিয়ে তিনি বলেন, আমরা পুলিশ বাহিনীতে ‘রিওয়ার্ড ও পানিশমেন্ট নীতি’ চালু করেছি। তিনি রেঞ্জ পুলিশ ও সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশ (এসএমপি) উভয়কেই এই নির্দেশনা কঠোরভাবে মেনে চলার নির্দেশনা দেন।

বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন-পরবর্তী দায়েরকৃত বিভিন্ন মামলা পর্যালোচনা করে মন্ত্রী বলেন, অনেক ক্ষেত্রে এজাহারে ঢালাওভাবে ৫০০, ১০০০ বা ২০০০ জনকে আসামি করা হয়েছে। বহু জায়গায় ভুক্তভোগী পরিবার মামলা না করে তৃতীয় পক্ষ তাদের স্বার্থসিদ্ধির জন্য বা ব্যবসায়ীদের হয়রানি ও চাঁদাবাজির উদ্দেশ্যে মামলা করেছে, যার ফলে প্রকৃত ভিকটিম বা শহীদ পরিবারগুলো ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। চট্টগ্রামের প্রথম শহীদ ওয়াসিম আকরামের উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, তার পরিবার বাদী হতে না পারলেও রাজনৈতিক আরেক ব্যক্তি বাদী হয়ে দেড় হাজার আসামি দিয়েছে, অথচ ভিডিও ফুটেজ ও পারিপার্শ্বিক প্রমাণের মাধ্যমে প্রকৃত জড়িতদের চিহ্নিত করা সম্ভব ছিল। এই প্রেক্ষিতে তিনি সিলেট রেঞ্জ ও মেট্রোপলিটন এলাকার এ সংক্রান্ত মামলাগুলো পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৭৩ ধারা অনুযায়ী নিরীহ ও অযথা হয়রানির শিকার ব্যক্তিদের তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার নির্দেশ দেন। একই সাথে তিনি সতর্ক করে দেন যে, এই প্রক্রিয়ায় যেন কোনো ধরনের দেনদরবার বা অনৈতিক লেনদেন না হয় এবং প্রকৃত নির্দেশদাতা ও অপরাধীদের যেন কোনোভাবেই বাদ দেওয়া না হয়।

সিলেটের বালি ও পাথর কোয়ারি বন্ধ থাকায় তৈরি হওয়া পরিবেশগত ও সামাজিক প্রভাব নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, পরিবেশ রক্ষা এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ব্যাপক কর্মসংস্থানের বিষয়টি বিবেচনায় রেখে তাঁর নেতৃত্বে ইতোমধ্যে একটি জাতীয় কমিটি কাজ করছে। পরিবেশ মন্ত্রণালয়, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় এবং আদালতের নির্দেশনা সমন্বয় করে প্রস্তুতকৃত রেজুলেউশন বা কার্যবিবরণী অনুযায়ী কাজ এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। তিনি এ সংক্রান্ত আদালতের মামলার দীর্ঘসূত্রতা কাটাতে অ্যাটর্নি জেনারেল অফিসের সাথে সমন্বয় রেখে দ্রুত আইনি জটিলতা নিরসনের নির্দেশ দেন। পাশাপাশি সীমান্ত এলাকায় পাহাড়ি ঢলে নদীর গতিপথ পরিবর্তন ও পরিবেশের ক্ষতি রোধে মনিটরিং টিমের মাধ্যমে সার্বিক তদারকি জোরদার করার আহ্বান জানান তিনি।

‘মব’ বা অরাজকতা সৃষ্টির অপসংস্কৃতি সরকার কোনোভাবেই সহ্য করবে না উল্লেখ করে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, দাবিদাওয়া আদায়ের নামে সড়ক অবরোধ বা ঘেরাও না করে প্রচলিত গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া, স্মারকলিপি প্রদান বা প্রেস কনফারেন্সের মাধ্যমে বিষয়টি উপস্থাপন করতে হবে। ২০২৫ সালের তুলনায় ২০২৬ সালে মবের ঘটনা ৫০ শতাংশের বেশি কমে এসেছে জানিয়ে তিনি সিলেট অঞ্চলকেও সম্পূর্ণ মবমুক্ত রাখার আহ্বান জানান।

বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির​ বিশেষ অতিথির বক্তব্যে বলেন, সিলেটকে মাদকমুক্ত করতে এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির সার্বিক উন্নয়নে পুলিশ প্রশাসনকে সর্বোচ্চ পারফরম্যান্স প্রদর্শন করতে হবে। তিনি বলেন, মাদকের সাধারণ সেবনকারীদের পেছনে না ছুটে শীর্ষ অন্তত ৫০ জন মাদক কারবারির একটি সুনির্দিষ্ট তালিকা প্রস্তুত করে এক থেকে দেড় মাসের মধ্যে দৃশ্যমান পরিবর্তন আনতে হবে। তিনি আরো বলেন, দেশের ভৌগোলিক আয়তনে সর্ববৃহৎ মেট্রোপলিটন পুলিশ এলাকা হিসেবে এসএমপির লজিস্টিক সংকট দূরীকরণ, নতুন পুলিশ ফাঁড়ি স্থাপন এবং পর্যাপ্ত পুলিশি যানবাহন সরবরাহ করতে হবে। এ বিষয়ে তিনি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সুদৃষ্টি কামনা করেন। তিনি সাধারণ মানুষের উত্তরোত্তর আস্থা ও বিশ্বাস অর্জনে প্রতিটি পুলিশ ইউনিটকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের আহ্বান জানান।

মতবিনিময় সভায় অন্যান্যের মধ্যে বক্তৃতা করেন সিলেট সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক আবদুল কাইয়ুম চৌধুরী, সিলেট-৩ আসনের সংসদ সদস্য আবদুল মালেক, সিলেট-৬ আসনের সংসদ সদস্য এমরান আহমদ চৌধুরী, সিলেট-৫ আসনের সংসদ সদস্য মুফতি মোহাম্মদ আবুল হাসান ও বিজিবি মহাপরিচালক (ডিজি) মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আশরাফুজ্জামান সিদ্দিকী।

এ সময় সিলেট উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রেজাউল হাসান কয়েস লোদী, সিলেট বিভাগীয় কমিশনার মোঃ মশিউর রহমান, সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার সারোয়ার মুর্শেদ শামীম, জেলা প্রশাসক আবদুল্লাহ আল মামুন, পুলিশ সুপার ড. চৌধুরী মোঃ যাবের সাদেক প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন সিলেটের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট পিংকী সাহা।

সভায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তাদের অপরাধ দমনে পূর্ব সতর্কতামূলক ব্যবস্থা জোরদার করা এবং অপরাধীদের তথ্য দ্রুত সংগ্রহ করে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দিকনির্দেশনা প্রদান করেন।

এই বিভাগের আরও সংবাদ