পটুয়াখালী

জলদস্যুদের আতঙ্কে সাগরে মাছ ধরতে যেতে পারছেন না রাঙ্গাবালীর উপকূলের জেলেরা

এম এ ইউসুফ আলী,স্টাফ রিপোর্টারঃ উত্তাল ঢেউ,বৈরী আবহাওয়া আর জীবনের ঝুঁকি সব কিছুকে একপাশে সরিয়ে রেখে জীবিকার তাগিদে গভীর বঙ্গোপসাগরে পাড়ি জমান উপকূলের জেলেরা। দিনের পর দিন কখনো বা সপ্তাহের পর সপ্তাহ পরিবার-পরিজন ছেড়ে গভীর সাগরে অবস্থান করে তারা। উদ্দেশ্য একটাই জাল ফেলে রুপালি ইলিশ ও মাছ শিকার করে পরিবারের মুখে হাসি ফুটানো। কিন্তু রক্তপানি করা এই মেহনতির পরও জেলেদের জীবনে এখন দুশ্চিন্তা। প্রকৃতির নানান বিপর্যয়ের পাশাপাশি এখন তাদের বড় আতঙ্ক হয়ে দাঁড়িয়েছে জলদস্যু।

জলদস্যুদের আতঙ্কে সাগরে মাছ ধরতে যেতে পারছেন না পটুয়াখালী রাঙ্গাবালীর উপকূলের জেলেরা। এতে বন্ধ হওয়ার পথে তাদের জীবিকার প্রধান উৎস। দস্যুরা ট্রলার নিয়ে জেলেদের কাছে গিয়ে ছিনিয়ে নেয় মাছ, তেল, মোবাইল ফোন ও নগদ টাকাসহ সবকিছু। এ অভিযোগ উপকূলের জেলেদের। নিরাপদে মাছ ধরার পরিবেশ নিশ্চিত করতে প্রশাসনের দ্রুত ও কার্যকর সহযোগিতা চান এই উপকূলের জেলেরা।

উপজেলার চরমোন্তাজের মৎস্যঘাট ঘুরে দেখা যায়,শত শত ট্রলার ঘাটে নোঙর করে জেলেরা বসে আছেন। প্রতিবেদক তাদের সাথে কথা বলতে গেলে অনেকেই জলদস্যুদের ভয়ে ক্যামেরার সামনে কথা বলতে চায় না। তাদের দাবি, জলদস্যু খুব ভয়ংকর। ওরা আমাদের জানে বাঁচতে দিবে না। অনেকেই আবার কথা বলতে রাজি হন যদি এই জলদস্যু থেকে কোনোভাবে রক্ষা পাওয়া যায়।

তারমধ্যে একজনের সাথে কথা হয় তিনি ২০১০ সাল থেকে সাগরে মাছ শিকার করেন আলী আহম্মেদ কথা হয় তার সাথে তিনি বলেন,’অনেক ট্রলার একসাথে ১৪ দিন পর্যন্ত কেউ আবার ১০ দিন কেউ আবার এক সপ্তাহ পর্যন্ত ঘাটে ট্রলার নোঙর করে রেখেছি। শুনছি সাগরে নাকি জলদস্যু ডেইলি (দৈনিক) দুই একটা ট্রলার ডাকাতির খবর পাই। ২০১৫ সালের রাত ২ টায় সোনারচরের দক্ষিণে আমার একবার ট্রলার ডাকাতি হইছে। সেসময় জলদস্যুরা আমার ট্রলারের কাছে এসে আমার ট্রলারের সাথে রসি লাগাইয়া গভীর সাগরের দিকে ট্রলার চালাইছে আর আমার ট্রলার ডাকাতি করছে। আর আমারে হাতে একটা রট দিয়া বাড়ি দিছে এখনও সেই হাত ভালো হয় নাই কয়দিন আগে ঢাকা গিয়া ডাক্তার দেখাইছি এই হাত পুরাপুরি ঠিক করতে ১ থেকে দেড় লক্ষ টাকা লাগবে ডাক্তার বলছে। এই ২০১৫ সালের পর সাগরে যে কয়বার জাল বাইছি(মাছ শিকার) করছি মোটামুটি একটা নিরাপদ ছিলো। কিন্তু আবার বঙ্গোপসাগরে সেই জলদস্যুদের উৎপাত বাড়ছে। অবরোধ (নিষেধাজ্ঞা) বাকি আর কয়দিন এর মধ্যে সাগরে মাছ শিকার করতে যেতে পাড়ছি না। এখন না খাওয়ার মত অবস্থা হয়ে যাচ্ছে। আমরা চাই সরকার জলদস্যুদের থেকে আমাদের রক্ষা করুক।’

রাঙ্গাবালীর চরমোন্তাজের সোনারচরের দক্ষিণে বঙ্গোপসাগরে মাছ শিকার করেন জেলে ইব্রাহিম আকন এখন জলদস্যুর আতঙ্কে চরমোন্তাজ ঘাটে বসেই দিন পাড় করছেন তিনি বলেন,’কয়েকদিন পর ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা অথচ এখন সাগরে মাছ শিকার করতে যেতে পারছি না জলদস্যুর ভয়ে। শেষ মুহূর্তে সাগরে যেতেও পারছি না আর কামাই রোজগাড়ও করতে পারছি না। সাগরে গেলেই জলদস্যুর হাতে পরবোই আর ওরা আমাদের পেলে সব নেয় তো নেই তারপরও এমনও মারধর করে জীবনের কিছু থাকেনা। এরকমভাবে চলতে থাকলে জেলেরা না খেয়ে মরে যাবে। আর প্রশাসনের কেউ সাগরে নদীতে কেউ টহল দেয় না। সরকারের কাছে আকুল আবেদন জলদস্যু থেকে জেলেদের বাঁচান।’

এর মধ্যে গত বৃহস্পতিবার সোনারচর থেকে ৯ জন জলদস্যু অভিযোগে আটক করেন এক ভুক্তভোগী জেলে ট্রলার পরে নৌ পুলিশরে কাছে তাদেরকে সোপর্দ করেন।

দস্যুতার শিকার হওয়া ট্রলারটির মালিক দশমিনা উপজেলার রণগোপালদী ইউনিয়নের দক্ষিণ রণগোপালদীর আবু তালেব গাজী তিনি বলেন,’প্রায় ১৫ দিন আগে সোনারচরের দক্ষিণে মাছ ধরার সময় রূপারচরের দিক থেকে একটি ট্রলার এসে তাদের থামার সংকেত দেয়। পরে ট্রলারটি তাদের গতিরোধ করে। এ সময় মারধর করে তেল, দুই ককসিট মাছ, প্রায় সাড়ে ৪০০ ফুট জাল, মোটর, লাইট ও মোবাইল ফোন লুট করে নিয়ে যাওয়া হয়। আবু তালেব আরও বলেন, বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় সোনারচরের বড় খালের কাছে ওই ট্রলারটি দেখতে পেয়ে তারা চিনতে পারেন। পরে ট্রলারে থাকা ৯ জেলেকে ধরে চরমোন্তাজ ঘাটে এনে নৌপুলিশের কাছে সোপর্দ করেন।’ এদের বিরুদ্ধে মৎস্য আইনে মামলাও হয়।

এ বিষয়ে শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ফিশারিজ ও মেরিন সায়েন্স অনুষদের সহকারী অধ্যাপক মীর মোহাম্মদ আলী বলেন,’বঙ্গোপসাগর কিন্তু আমরা আমাদের জেলেদের জন্য নিরাপদ করতে পারি নাই। এটা না হওয়ার কারণে যেটা হয়েছে। এই জলদস্যু বেড়ে যাওয়ার কারণে এখন কিন্ত মাছ ধরতে পারছেন না।বঙ্গোপসাগর ও সোনারচরের বেশ কিছু জায়গায় জলদস্যু বেড়ে যাওয়ার কারণে জেলেরা কিন্ত সাগরে যেতে পাড়ছেন না। এবং সবচেয়ে বড় কারণ সামনের ৮ তারিখ থেকে মা ইলিশের ২২ দিন নিষেধাজ্ঞা সুতরাং এই সময়ে জেলেরা মাছ ধরতে পারছেন না। এতে যেমন জেলেরা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন এবং গতবছরের ধেনার দায়ও কিন্তু কাটাতে পারছেন না। সুতরাং তারা যদি মাছ ধরতে হয় অবশ্যই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর এই জায়গায় নিরাপদ দেওয়া ধরকার। নাহলে জেলেরা এই পেশায় থেকে সরে যাবে এবং সরকারের যে ইনকাম সেটাও আর পাবে ন। তাই সাগরে জেলেদের নিরাপদের জন্য বিশেষভাবে কোষ্টগার্ড ও নৌবাহিনী টহল জোরদার করতে হবে। ‘

রাঙ্গাবালী নৌপুলিশের ইনচার্জ আন নূর যায়েদ বলেন,’ গভীর সাগর আমাদের এড়িয়ার মধ্যে পড়েনা। আমার যে এড়িয়ার এখন পর্যন্ত সেরকম কোনো ঘটনা ঘটেনি এবং কেউ কোনো অভিযোগও দেয়নি। এবং আমরা নিয়মিত টহল করছি গতকাল মিটিং করছি এবং সামনে যে নিষেধাজ্ঞা সেই নিষেধাজ্ঞা সফল করতে আমরা মিটিং করছি। কিন্তু কোনো জেলে বা কেউ আমাদের এমন কোনো অভিযোগ করেনি। যদি জেলেরা কোনো অভিযোগ করে অবশ্যই আমরা তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিবো।’

রাঙ্গাবালী উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা (অতিরিক্ত দায়িত্ব) ভিক্টর বাইন বলেন,’ইতিমধ্যে আমি বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে জানিয়েছি। এছাড়া জেলেরা যাতে নির্বিঘ্নে মাছ ধরতে পারে এজন্য নিকটবর্তী যেসব আইনশৃঙ্খলা বাহিনী রয়েছে যেমন কোষ্টগার্ড, নৌ-পুলিশ আমি তাদের জোরালো অভিযান পরিচালনা করার জন্য অনুরোধ জানাবো।’

এই বিভাগের আরও সংবাদ