২৬ বছর পর কারামুক্ত মুসা কালিমোল্লা: ভিটায় ফিরে প্রিয়জনদের জায়গায় শুধুই শূন্যতা


ইয়ামিন হোসেন, ভোলা : জীবনের সেরা ২৬টি বসন্ত কেটেছে কারাগারের চার দেয়ালের মাঝে। লাল ফিতার দৌড় আর আদালতের রায়ে জীবন থেকে খসে গেছে যৌবনের পুরোটা সময়। দীর্ঘ দুই যুগেরও বেশি সময় কারাভোগের পর অবশেষে মুক্ত বাতাসে নিঃশ্বাস ফেললেন ভোলার মুসা কালিমোল্লা ওরফে কালু। কিন্তু কারাফাটক পেরিয়ে নিজ ভিটায় ফিরে যার মুখে হাসির ঝিলিক ফোটার কথা ছিল, তার চোখে এখন কেবল অশ্রুর বন্যা। দীর্ঘ অপেক্ষার পর ঘরে ফিরে দেখেন, আপনজনদের অনেকেই আর বেঁচে নেই।
ভোলা সদর উপজেলার রাজাপুর ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক লতিফ মেম্বারের ছেলে মুসা কালিমোল্লা। পারিবারিক আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে তৎকালীন সময় স্থানীয় মিলন মেম্বার ও লতিফ মেম্বার গ্রুপের মধ্যে এক রক্তক্ষয়ী সংঘাত ঘটে। ওই বিরোধের জের ধরে খুন হন মিলন মেম্বারের ভাই দুলাল। ঘটনার পর মিলন মেম্বার বাদী হয়ে মুসাকে প্রধান আসামি করে হত্যা মামলা দায়ের করলে পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে। দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে আদালত তাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড প্রদান করেন। সেই থেকে বন্দিজীবনই হয়ে ওঠে তার ঠিকানা।
সোমবার দুপুরে কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে এলাকায় ফেরেন মুসা। তবে ২৬ বছরের ব্যবধানে পরিচিত চারপাশটা আজ একেবারেই বদলে গেছে। কারাভোগের এই দীর্ঘ সময়ে একে একে চিরতরে হারিয়ে গেছেন তার দুই চাচা, ফুফু, মামাসহ প্রায় ১৫ জন নিকটাত্মীয়। যাদের স্মৃতি বুকে নিয়ে কারাগারে দিন গুনেছিলেন, তাদের কাউকে আর কাছে পাননি তিনি।
প্রিয়জনদের হারানোর খবরের পাশাপাশি তার চোখে পড়ে সময়ের নির্মম ছাপ। কারাগারে যাওয়ার সময় যে স্ত্রীকে রেখে গিয়েছিলেন তরুণী হিসেবে, সেই সহধর্মিণী আজ জীবনসংগ্রামের ঝড়ে বৃদ্ধা। কোলজুড়ে রেখে যাওয়া অবুঝ শিশুকন্যাটি এখন বড় হয়ে নিজে সন্তানের মা হয়েছেন। এক সন্তানকে কোলে নিয়ে মুসার স্ত্রী দীর্ঘ ২৬টি বছর যে একা একা কঠিন লড়াই চালিয়ে গেছেন, তা আজ স্পষ্ট ফুটে উঠেছে তার চেহারার বলিরেখায়।
মুক্তির পর আবেগাপ্লুত মুসা কালিমোল্লা বলেন, “অপরাধ যাই হোক, জীবনের সব আলো কারাগারে শেষ হয়ে গেছে। আজ মুক্ত কিন্তু আমার আপন বলতে আর অনেকেই নেই। কাকে গিয়ে দেখব, সেই ঘর-ভিটাই তো খালি।”
এককালের রক্তাক্ত রাজনৈতিক ও পারিবারিক শত্রুতার জের ধরে একটি পরিবারের ২৬টি বছর কীভাবে নিভে যায়, মুসা কালিমোল্লার এই করুণ ফেরা যেন তারই এক জলন্ত দলিল।



