আন্তর্জাতিক

মতবিরোধের মধ্যেই জি-২০ অর্থমন্ত্রীদের বৈঠক শেষ

রাশিয়ার একজন মন্ত্রীর উপস্থিতি নিয়ে ইউরোপীয় দেশগুলোর অসন্তোষের মধ্যেই দুই দিনের জি-২০ অর্থমন্ত্রীদের বৈঠক মঙ্গলবার শেষ হয়েছে। বৈঠক শেষে প্রকাশিত যৌথ বিবৃতিতে চীন ছাড়া প্রায় সব দেশই পূর্ণ সমর্থন জানিয়েছে।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্র বলেছে, বৈঠকে রাশিয়ার একজন মন্ত্রীর উপস্থিতি আলোচনায় কোনো প্রভাব ফেলেনি।

যুক্তরাষ্ট্রের অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট বলেন, প্রায় সব অংশগ্রহণকারী দেশ সম্মেলনের সভাপতির বিবৃতিতে সম্মত হওয়াই প্রমাণ করে যে রাশিয়ার উপস্থিতির কারণে আলোচনায় ‘কোনো প্রভাব পড়েনি’।

যুক্তরাষ্ট্রের আয়োজনে উত্তর ক্যারোলাইনার অ্যাশভিলে অনুষ্ঠিত বৈঠকে রাশিয়ার অর্থমন্ত্রী আন্তন সিলুয়ানভকে স্বাগত জানানোর ঘটনায় ইউক্রেনের ইউরোপীয় মিত্ররা অসন্তোষ প্রকাশ করেছিল।

বৈঠকে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধ ও প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আরোপ করা শুল্কনীতিও গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠে।

সম্মেলনের সভাপতির বিবৃতিতে হরমুজ প্রণালীতে ‘অবাধ, নিরাপদ ও নির্বিঘ্ন নৌ চলাচল’ নিশ্চিত করার আহ্বান জানানো হয়। তবে বিবৃতির এই অংশে চীন আপত্তি জানিয়েছে।

ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলার মাধ্যমে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে তেহরান গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথটি অনেকটাই অবরুদ্ধ করে রেখেছে।

সোমবার জি-২০ নেতাদের প্রচলিত ‘ফ্যামিলি ফটো’ তোলা হয়। ইউরোপীয় কর্মকর্তাদের প্রতিবাদের পর সেই ছবিতে রাশিয়ার অর্থমন্ত্রী সিলুয়ানভ ছিলেন না।

উত্তর ক্যারোলাইনার চ্যাপেল হিলে অনুষ্ঠিত জি-২০’র পৃথক একটি উদ্ভাবন বিষয়ক বৈঠকেও অংশগ্রহণকারীদের দুটি দলগত ছবি তোলা হয়। এতে ইউরোপীয় নেতারা রাশিয়ার প্রতিনিধিদল থেকে আলাদা থাকার সুযোগ পান।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) এক মুখপাত্র বলেন, সিলুয়ানভ বৈঠকে অংশ নেবেন— এ কথা প্রতিনিধিদের খুব অল্প সময় আগে জানানো হয়েছিল।

মঙ্গলবার সিলুয়ানভের উপস্থিতি আলোচনায় কোনো প্রভাব ফেলেছে কি না, তা জানতে চাইলে কানাডার অর্থমন্ত্রী ফ্রাঁসোয়া-ফিলিপ শ্যাম্পেন এএফপিকে বলেন, ‘এতে যে অস্বস্তি তৈরি হয়েছে, তা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই।’

ইইউর অর্থনীতি বিষয়ক প্রধান ভালদিস ডোমব্রোভস্কিস সাংবাদিকদের বলেন, এ ধরনের আন্তর্জাতিক বৈঠকে রাশিয়ার উপস্থিতিকে ‘স্বাভাবিক’ হিসেবে মেনে নেওয়ার সময় এখনো আসেনি।

তিনি আরো বলেন, রাশিয়াকে এসব বৈঠকে অন্তর্ভুক্ত করার অর্থ হলো এমন একটি সরকারের প্রতিনিধিদের সঙ্গে সংবেদনশীল অর্থনৈতিক বিষয় নিয়ে আলোচনা করা, যেই সরকার ইউক্রেনে ‘আগ্রাসী যুদ্ধ চালাচ্ছে’ এবং ‘প্রতিদিন বেসামরিক মানুষ হত্যা করছে’।

তবে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থমন্ত্রী বেসেন্ট এর পাল্টা জবাবে বলেন, ‘আমি জানি, কিছু ইউরোপীয় দেশ এতে অসন্তুষ্ট হয়েছে। কিন্তু আমার মনে হয়, যোগাযোগ ও আলোচনায় যুক্ত থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।’

তিনি আরো বলেন, ‘আমি এটাও উল্লেখ করতে চাই যে যেই অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে আমি বৈঠক করেছি, তিনি নিষেধাজ্ঞার আওতায় নেই।’

এদিকে মঙ্গলবার জার্মানি গত মাসে দেশটির একটি কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ বিমানবন্দরে ড্রোনের মাধ্যমে কথিত ‘হাইব্রিড হামলা’ চালানোর চেষ্টার জন্য রাশিয়াকে দায়ী করেছে। পাশাপাশি রাশিয়ার বিরুদ্ধে পাল্টা কূটনৈতিক ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও জানিয়েছে বার্লিন।

বর্তমানে জি-২০’র সভাপতির দায়িত্বে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এ সপ্তাহে ওয়াশিংটন ইরানের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ এবং বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর বিষয়ে মিত্র ও অংশীদার দেশগুলোর সমর্থন আদায়েরও চেষ্টা করছে দেশটি।

‘দীর্ঘস্থায়ী ভারসাম্যহীনতা’

আরেকটি বিষয়ে চীন আপত্তি জানিয়েছে। জি-২০’র বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘অতিরিক্ত ও দীর্ঘস্থায়ী ভারসাম্যহীনতা ঝুঁকি তৈরি করে এবং অর্থনীতিতে নানা ধরনের বিকৃতি ঘটাতে পারে।’

বিবৃতিতে দেশগুলোকে ‘বাজারব্যবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্যহীন নীতি’ বন্ধে পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ চীনের অতিরিক্ত শিল্প উৎপাদন সক্ষমতা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে যে সমালোচনা রয়েছে, এই বক্তব্যে তারই প্রতিফলন দেখা গেছে।

সমালোচকদের অভিযোগ, এর ফলে অন্য দেশগুলোর সঙ্গে অসম প্রতিযোগিতা তৈরি হয় ও পণ্যের দাম কমে যায়।

কানাডার অর্থমন্ত্রী শ্যাম্পেন বলেন, ‘আমাদের সম্মিলিত পদক্ষেপ নিয়ে আলোচনা করতে হবে এবং বিষয়টি খতিয়ে দেখতে হবে। কারণ বর্তমান বৈশ্বিক ভারসাম্যহীনতা টেকসই নয়। এ আলোচনার টেবিলে সবাইকে থাকতে হবে।’

জি-২০তে ১৯টি দেশ ছাড়াও ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) ও আফ্রিকান ইউনিয়ন রয়েছে। ১৯৯৭-৯৮ সালের এশীয় আর্থিক সংকটের পর বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ও আর্থিক স্থিতিশীলতা জোরদারের লক্ষ্যে জোটটি প্রতিষ্ঠা করা হয়।

অ্যাশভিলের অর্থমন্ত্রীদের বৈঠকের মধ্য দিয়ে আগামী ডিসেম্বরে মিয়ামিতে অনুষ্ঠেয় জি-২০ নেতাদের শীর্ষ সম্মেলনের প্রস্তুতিও এগিয়ে গেল। ওই সম্মেলনের আয়োজন করবেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।

বৈঠকের ফাঁকে ইউক্রেনকে সহায়তার বিষয়টিও আলোচনায় আসে। এ নিয়ে উন্নত অর্থনীতির দেশগুলোর জোট জি-৭-এর একটি বৈঠকেও আলোচনা হয়েছে।

চলতি গ্রীষ্মে মস্কো কিয়েভে হামলা আরও জোরদার করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় শান্তি আলোচনা এখন স্থবির হয়ে আছে। যুদ্ধ বন্ধের ক্ষেত্রে ক্রেমলিন এখনো সর্বোচ্চ পর্যায়ের কঠোর দাবিগুলো বজায় রেখেছে।

জার্মানির অর্থমন্ত্রী লার্স ক্লিংবাইল মঙ্গলবার বলেন, ‘বেসামরিক মানুষের ওপর ভয়াবহ রকেট হামলা বেড়েছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘এসব অবশ্যই বন্ধ করতে হবে।’

ক্লিংবাইল বলেন, তিনি ও ইউরোপের অন্যান্য অর্থমন্ত্রীরা ‘ইউক্রেন বিষয়ে নিজেদের অবস্থান একেবারে স্পষ্ট করে দিয়েছেন।’

সোমবার রাতে জি-৭ নেতাদের বৈঠকের সময় ইউক্রেনের অর্থমন্ত্রীও অনলাইনে যুক্ত হয়ে কিয়েভকে সহায়তার বিষয়ে আলোচনায় অংশ নেন বলে জানান তিনি।

এই বিভাগের আরও সংবাদ