সিরাজগঞ্জ

শাহজাদপুরে শিক্ষার্থী নিখোঁজের তিন বছর পর হত্যার রহস্য উদঘাটন করলো সিআইডি

মাহবুবুল আলম, শাহজাদপুর (সিরাজগঞ্জ) প্রতিনিধি: সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরে তিন বছর পূর্বে নিখোঁজ হওয়া অষ্টম শ্রেণির ছাত্র মোঃআশরাফুল ইসলামকে অপহরণের পর হত্যার রহস্য উদঘাটন করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। এ ঘটনায় মোঃ রফিকুল ইসলাম (৫৪) নামের সমকামী এক ব্যক্তিকে গ্রেফতার করেছে সিআইডি।

নিহত স্কুলছাত্র আশরাফুল জামিরতা জোতপাড়া গ্রামের দিনমজুর সাইফুল ইসলামের ছেলে, নিখোঁজের সময় জামিরতা উচ্চ বিদ্যালয়ের ৮ম শ্রেণীর ছাত্র ছিল। অভিযুক্ত রফিকুল উপজেলার গাড়াদহ গ্রামের মৃত নুর হোসেন মোল্লার ছেলে। গত ১২ই আগস্ট জামিরতা বাজার এলাকা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।

প্রাথমিক তদন্তে জানা যায়, ২০২৩ সালের ৩১ আগস্ট সন্ধ্যার পর রফিকুল মোবাইল ফোনে আশরাফুলকে একাধিকবার ফোন করে বাড়ি থেকে ডেকে জামিরতা বাজারে নিয়ে যায়। এরপর আশরাফুল আর বাড়িতে ফিরে আসেনি। রাতে পরিবারের সদস্যরা তার অপেক্ষায় থাকলেও সে বাড়িতে না ফেরায় বিভিন্ন স্থানে খোঁজাখুঁজি শুরু করেন। পরদিন তার মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে সেটিও বন্ধ পাওয়া যায়। আত্মীয়-স্বজনসহ সম্ভাব্য বিভিন্ন স্থানে খোঁজ করেও আশরাফুলের সন্ধান না পাওয়ায় তার বাবা শাহজাদপুর থানায় সাধারণ ডায়েরি করেন।

আশরাফুলের নিখোঁজের পর তার পরিবারের সদস্যরা রফিকুলের কাছে গিয়ে আশরাফুলের বিষয়ে জানতে চাইলে রফিকুলের অবস্থান ও কথাবার্তায় তারা সন্তুষ্ট হতে পারেননি। দীর্ঘদিন ধরে আশরাফুলের কোনো সন্ধান না পাওয়ায় তার মা মোছা. নাছিমা খাতুন ২০২৩ সালের ১৩ই নভেম্বর আদালতে তিনজনকে আসামি করে মামলা দায়ের করেন। পরবর্তীতে বিজ্ঞ আদলত মামলাটির তদন্ত ভার সিআইডি সিরাজগঞ্জ এর উপর ন্যস্ত করেন।

সিআইডি সূত্রে জানা যায়, দীর্ঘদিন তদন্ত করেও ভিকটিমের অবস্থান বা তার সঙ্গে কী ঘটেছে সে বিষয়ে নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যাচ্ছিল না। পরবর্তীতে তদন্তকারী কর্মকর্তা মামলার আরজি পুনঃবিশ্লেষণের পাশাপাশি প্রযুক্তিগত তথ্য বিশ্লেষণ এবং স্থানীয়ভাবে গোপন ও প্রকাশ্য তদন্ত শুরু করেন।

তদন্তে আসামি মো. রফিকুল ইসলামের ভূমিকা বিশেষভাবে সামনে আসে। মামলাটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর ও চাঞ্চল্যকর হওয়ায় অধিকতর নিবিড় তদন্তের স্বার্থে মামলা থেকে নিয়মিত এফআইআর হিসেবে শাহজাদপুর থানায় রুজুর আবেদন করেন। বিজ্ঞ আদালতের আদেশে মামলাটি নিয়মিত এফআইআর হিসেবে রুজু হওয়ার পর তদন্ত আরও গতিশীল হয়।

এরই ধারাবাহিকতায় গত ১২ আগস্ট শাহজাদপুর থানাধীন জামিরতা বাজার এলাকা থেকে এজাহারনামীয় আসামি মো. রফিকুল ইসলামকে গ্রেফতার করা হয়। গ্রেফতারের পর তাকে নিবিড়ভাবে জিজ্ঞাসাবাদে আশরাফুলের নিখোঁজ হওয়ার ঘটনার অন্তরালে থাকা চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে আসে।

জিজ্ঞাসাবাদে রফিকুল জানায়, ভিকটিম আশরাফুলের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ শারীরিক সম্পর্ক ছিল। তাদের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকা অবস্থায় রফিকুল জানতে পারে যে, আশরাফুল তার আরও দুই বন্ধুকে সঙ্গে নিয়ে একজন যৌনকর্মীর সঙ্গে অনৈতিক সম্পর্কে জড়িয়েছে।বিষয়টি রফিকুলের কাছে অত্যন্ত অপমানজনক ও ক্ষোভের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। একপর্যায়ে সেই ক্ষোভ থেকেই সে আশরাফুলকে হত্যার পরিকল্পনা করে।

পরিকল্পনা অনুযায়ী, ঘটনার দিন রফিকুল মোবাইল ফোনে আশরাফুলকে ডেকে যমুনা নদীর পাড়ে নিয়ে যায়। সেখানে যৌন উত্তেজক ট্যাবলেট দেওয়ার কথা বলে রফিকুল কৌশলে আশরাফুলকে ঘুমের ওষুধ খাওয়ায়। ওষুধের প্রভাবে আশরাফুল অচেতন হয়ে পড়লে রফিকুল তাকে যমুনা নদীর পানিতে ফেলে দেয়। পরে নদীর স্রোতে আশরাফুলের মরদেহ ভেসে যায় বলে জিজ্ঞাসাবাদে রফিকুল জানায়।

রফিকুল ইসলাম পরবর্তীতে স্বেচ্ছায় দোষ স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি প্রদানের আগ্রহ প্রকাশ করলে তাকে বিজ্ঞ আদালতে সোপর্দ করা হয়। বিজ্ঞ আদালত ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় তার স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি লিপিবদ্ধ করেন।

তদন্তে আরও জানা যায়, রফিকুল ইসলামের বিরুদ্ধে ইতিপূর্বেও গুরুতর অপরাধে জড়িত থাকার ইতিহাস রয়েছে। প্রায় ৭/৮ বছর আগে উল্লাপাড়া থানা এলাকায় মন্টু মিয়া নামে এক ব্যক্তির বাড়িতে তাঁতের কাজে সহযোগিতা করার সময় তার বড় ছেলে শাহিনের সঙ্গে রফিকুলের অনৈতিক সম্পর্ক তৈরি হয় বলে স্থানীয়ভাবে জানা যায়। পরবর্তীতে শাহিনের বিয়ের বিষয় জানতে পেরে রফিকুল ক্ষুব্ধ হয়ে একপর্যায়ে ঘুমন্ত অবস্থায় ধারালো অস্ত্র দিয়ে শাহিনের পুরুষাঙ্গের অংশবিশেষ কেটে দেয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এ ঘটনায় মন্টু মিয়ার মামলায় বিচারিক কার্যক্রম শেষে সে সাত বছরের কারাদণ্ডে দণ্ডিত হয়ে সাজা ভোগ করে।

এই বিষয়ে শাহজাদপুর থানার অফিসার ইনচার্জ মোঃ সাইফুল ইসলাম বলেন, তদন্তে আশরাফুলকে অপহরণের আড়ালে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটিত হলেও ভিকটিমের মরদেহ এখনো উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। রফিকুলের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে এবং সম্ভাব্য অন্যান্য উৎস থেকে মরদেহের সন্ধান অব্যাহত রয়েছে। যমুনা নদীর ভাটি অঞ্চলের সংশ্লিষ্ট থানাগুলোতে অজ্ঞাতনামা মরদেহ সংক্রান্ত তথ্য চাওয়া হয়েছে এবং সরেজমিনে সংশ্লিষ্ট থানার রেজিস্টার ও নথিপত্র যাচাই করা হচ্ছে।

ভিকটিমের মরদেহ উদ্ধার, আসামির দেওয়া তথ্যের সত্যতা যাচাই ও ঘটনার সঙ্গে অন্য কারও সম্পৃক্ততা রয়েছে কি না, তা উদঘাটনে সিআইডির তদন্ত কার্যক্রম চলমান রয়েছে।

এই বিভাগের আরও সংবাদ