অতিবৃষ্টি ও উজানের ঢলে গাইবান্ধার কৃষিতে বিপর্যয়


পলাশবাড়ী (গাইবান্ধা) প্রতিনিধি : টানা পাঁচ দিনের অতিবৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা ঢলে গাইবান্ধার কৃষিতে নেমে এসেছে ভয়াবহ বিপর্যয়। জেলার সাতটি উপজেলায় ১২৪ দশমিক ৪ হেক্টর (প্রায় ১ হাজার বিঘা) জমির ফসল সম্পূর্ণ নষ্ট হয়েছে। এছাড়া ৩৭৯ দশমিক ৫ হেক্টর (প্রায় ২ হাজার ৯০০ বিঘা) জমির বিভিন্ন ফসল এখনো পানিতে তলিয়ে রয়েছে, যা নিয়ে চরম উদ্বেগে দিন কাটাচ্ছেন কৃষকরা।
গত ১২ থেকে ১৬ জুলাই পর্যন্ত টানা বৃষ্টিপাত এবং উজানের ঢলে সৃষ্টি হওয়া জলাবদ্ধতায় এ ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, ক্ষতিগ্রস্ত ফসলের মধ্যে রয়েছে আমনের বীজতলা, আউশ ধান, পাট, মরিচ, আদা, হলুদ ও বিভিন্ন শাক-সবজি। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে আমনের বীজতলা ও আউশ ধান। সম্পূর্ণ নষ্ট হওয়া ফসলের মধ্যে রয়েছে ৩৩ দশমিক ৫ হেক্টর আমনের বীজতলা (প্রায় ২৫২ বিঘা) এবং ৬২ হেক্টর আউশ ধান (প্রায় ৪৬৫ বিঘা)। এছাড়া পাট, মরিচ, আদা, হলুদ ও শাক-সবজিরও উল্লেখযোগ্য ক্ষতি হয়েছে।
অন্যদিকে, পানিতে আক্রান্ত ফসলের মধ্যে রয়েছে ১৪১ হেক্টর আউশ ধান এবং ১৩২ হেক্টর আমনের বীজতলা, যা দ্রুত পানি না নামলে সম্পূর্ণ নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
কৃষি সংশ্লিষ্টরা জানান, অতিবৃষ্টির কারণে দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতায় আমনের বীজতলা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। গত বছরও একই কারণে আমনের চারার তীব্র সংকট দেখা দিয়েছিল এবং কয়েকগুণ দাম বেড়ে যায়। অনেক কৃষক দুই থেকে তিনবার রোপণ করেও ফসল ঘরে তুলতে পারেননি। এবারও একই পরিস্থিতির আশঙ্কা করছেন তারা।
তবে কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, ১৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আমনের চারা রোপণের সময় রয়েছে। এর মধ্যে পানি দ্রুত নেমে গেলে নতুন করে বীজ বপনের সুযোগ থাকতে পারে।
সরেজমিনে সদর উপজেলার বোয়ালী ইউনিয়নের পশ্চিম রাধাকৃষ্ণপুর গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, বিস্তীর্ণ বীজতলা পানির নিচে তলিয়ে আছে। কোথাও কোথাও সামান্য চারা চোখে পড়লেও অধিকাংশ জমিতে চারার কোনো অস্তিত্ব নেই। চারদিকে শুধু জলাবদ্ধতা।
স্থানীয় কৃষক জফের উদ্দিন বলেন, “এক জমির প্রায় এক মণ ধানের বীজতলা নষ্ট হয়েছে। বীজ, সার, হালচাষ ও শ্রমিক মিলিয়ে ১০ হাজার টাকার বেশি খরচ করেছি। এখন কীভাবে জমিতে আমন রোপণ করব, বুঝতে পারছি না।”
বর্গাচাষি শাহারুল মিয়া বলেন, “দুই বিঘা জমির জন্য ১২ কেজি ধানের বীজ ফেলেছিলাম। চারা গজানোর পরই বৃষ্টির পানিতে সব নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। গত বছরও দুই দফা আমন রোপণ করে এক কেজি ধানও পাইনি। সরকারিভাবে বীজ ও চারা সহায়তা প্রয়োজন।”
আরেক কৃষক মতিন মিয়া বলেন, “দেড় থেকে দুই কিলোমিটার নালা না থাকায় প্রতি বছর জলাবদ্ধতায় আমাদের বীজতলা ও ফসল নষ্ট হয়। স্থায়ী পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা না হলে এই দুর্ভোগ থেকে মুক্তি মিলবে না।”
উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা উম্মে কুলসুম বলেন, “আমনের বীজ বপনের সময় এখনো আছে। তবে অধিকাংশ জমির পানি নামেনি, আবার থেমে থেমে বৃষ্টিও হচ্ছে। ক্ষয়ক্ষতির তালিকা তৈরি করে জেলায় পাঠানো হচ্ছে।”
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের ভারপ্রাপ্ত উপপরিচালক আসাদুজ্জামান বলেন, “অতিবৃষ্টি ও উজানের ঢলে জেলায় ১২৪ দশমিক ৪ হেক্টর জমির ফসল সম্পূর্ণ নষ্ট হয়েছে। এছাড়া ৩৭৯ দশমিক ৫ হেক্টর জমির বিভিন্ন ফসল এখনো পানিতে আক্রান্ত। দ্রুত পানি নিষ্কাশন করা গেলে ক্ষতিগ্রস্ত ফসলের একটি বড় অংশ রক্ষা করা সম্ভব হতে পারে।”



