আন্তর্জাতিক

ড্রোন হামলায় সৌদির গুরুত্বপূর্ণ তেল পাইপলাইন বন্ধ

ইরান যুদ্ধের মধ্যে সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ ইস্ট-ওয়েস্ট তেল পাইপলাইন ব্যবস্থায় ড্রোন হামলা হয়েছে। বৃহস্পতিবার পাইপলাইনটির কাছে কয়েকটি পাম্প স্টেশনে হামলা চালানো হয় বলে জানিয়েছে সৌদি আরবের জ্বালানি মন্ত্রণালয় ও মার্কিন কর্মকর্তারা। মার্কিন বার্তাসংস্থা সিএনএনের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানা যায়।

সৌদি জ্বালানি মন্ত্রণালয় শুক্রবার জানায়, হামলার পর সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে পাইপলাইনটি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। মার্কিন এক কর্মকর্তা জানান, প্রাথমিক বিশ্লেষণে পাইপলাইনের পাশে থাকা পাম্প স্টেশনগুলোতে হামলার প্রমাণ পাওয়া গেছে। শুক্রবারের একটি স্যাটেলাইট ছবিতে একটি পাম্প স্টেশনে ব্যাপক অগ্নিকাণ্ডের চিহ্ন দেখা গেছে। বৃহস্পতিবার তোলা আরেকটি ছবিতে একটি পাম্প স্টেশন থেকে ঘন কালো ধোঁয়া বের হতে দেখা যায়।

হামলার দায় তাৎক্ষণিকভাবে কেউ স্বীকার করেনি। তবে এক মার্কিন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ইরাক থেকে উৎক্ষেপণ করা ড্রোন দিয়ে হামলাটি চালানো হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। পরে সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও জানায়, ইরাক থেকে আসা বেশ কয়েকটি ড্রোন রিয়াদ ও মদিনা অঞ্চলের ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইনে হামলা চালিয়েছে। এতে কয়েকজন আহত এবং কিছু ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।

সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় হামলার নিন্দা জানিয়ে বলেছে, ইরাকের প্রধানমন্ত্রী সৌদি আরবকে পাল্টা জবাব না দিয়ে বাগদাদকে নিজেদের ভূখণ্ড থেকে পরিচালিত হামলা ঠেকানোর জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ দিতে অনুরোধ করেছেন। সেই অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে আপাতত কোনো প্রতিক্রিয়া না দেখানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে রিয়াদ।

ইরান যুদ্ধ চলতে থাকায় সৌদি আরবের তেলসম্পদ ও তা রপ্তানির সক্ষমতার ওপর বাড়তে থাকা হুমকির বিষয়টি এই হামলার মাধ্যমে আরও স্পষ্ট হয়েছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর সৌদি আরবের জন্য ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইনটি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

হরমুজ প্রণালির মাধ্যমে পারস্য উপসাগর থেকে ট্যাংকারে পাঠানোর পরিবর্তে সৌদি আরব প্রতিদিন প্রায় ৫০ লাখ ব্যারেল তেল এই পাইপলাইনের মাধ্যমে লোহিত সাগরের ইয়ানবু বন্দরে পাঠাচ্ছে। সেখান থেকে তেল আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানি করা হচ্ছে।

তবে ইয়ানবু হয়ে তেল রপ্তানির পথও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। ইয়েমেনের হুথি যোদ্ধারা লোহিত সাগর থেকে বাব আল-মান্দেব প্রণালি দিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা সৌদি জাহাজে হামলার হুমকি দিয়েছে।

মার্কিন কর্মকর্তাদের মতে, পাম্প স্টেশনগুলোর ক্ষতি মেরামত করা সম্ভবত পাইপলাইনের মূল অংশে বড় ধরনের ক্ষতি মেরামতের চেয়ে তুলনামূলক সহজ হবে। তবে ক্ষয়ক্ষতি পুরোপুরি মেরামত করতে কত সময় লাগবে, তা এখনও স্পষ্ট নয়।

স্যাটেলাইটে বৃহস্পতিবার সৌদি আরবের ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইনের আশপাশে নয়টি বড় আগুন শনাক্ত করা হয়। তবে এর মধ্যে অন্তত ছয়টি আগুন এমন এলাকায় ছিল, যেখানে জরুরি পরিস্থিতিতে তেল ও গ্যাস পোড়ানোর জন্য ফ্লেয়ার পিট ব্যবহৃত হয়। ফলে সবগুলো আগুন হামলার কারণে হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত নয়।

ইরান-সমর্থিত ইরাকি মিলিশিয়াগুলো অতীতেও সৌদি আরবে ড্রোন হামলা চালিয়েছে। ইরানের প্রক্সি গোষ্ঠীগুলোকে কাজে লাগিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক উপস্থিতির বিরোধিতা জোরদার করার বৃহত্তর কৌশলের অংশ হিসেবে এবারও এমন হামলা হয়ে থাকতে পারে বলে মন্তব্য করেছেন ফাউন্ডেশন ফর ডিফেন্স অব ডেমোক্রেসিজের ইরানবিষয়ক বিশেষজ্ঞ বেহনাম বেন তালেব্লু।

এদিকে, হামলার আগে জুলাইয়ের শেষ দিকে সৌদি প্রতিরক্ষামন্ত্রী খালিদ বিন সালমান ওয়াশিংটনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের সঙ্গে বৈঠক করেছিলেন। সে সময় সৌদি পক্ষ আশঙ্কা প্রকাশ করেছিল, ইরান উত্তেজনা বাড়িয়ে প্রভাব তৈরির চেষ্টা করতে পারে এবং ইরাকের মিলিশিয়া ও ইয়েমেনের হুথিদের মতো অবশিষ্ট প্রক্সি গোষ্ঠীগুলোকে কাজে লাগাতে পারে।

সৌদি রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি আরামকো হামলা নিয়ে তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য করেনি। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর, হোয়াইট হাউস ও মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডও এ বিষয়ে তাৎক্ষণিক মন্তব্য করেনি।

এরই মধ্যে সৌদি আরব ওপেককে জানিয়েছে, গত মাসে দেশটির অপরিশোধিত তেল উৎপাদন ব্যাপকভাবে কমে ১৯৯০ সালের পর সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমেছে। নতুন এই হামলা মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতের মধ্যে বৈশ্বিক তেল সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে তুলেছে।

এই বিভাগের আরও সংবাদ