রাশিয়ার সঙ্গে গোপন আলোচনা, আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা চায় ইরান


উন্নত আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা সরবরাহের জন্য রাশিয়ার সঙ্গে গোপন আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে ইরান। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ‘দ্য টেলিগ্রাফের’ এক প্রতিবেদনে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এসেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন দাবি করছেন, রাশিয়া ইরানকে ‘একেবারেই’ সাহায্য করছে না, ঠিক তখনই মস্কোর সঙ্গে তেহরানের এই অস্ত্র চুক্তির খবর প্রকাশ্যে এল।
প্রতিবেদনে বলা হয়, পুতিন শেষ পর্যন্ত বহুল কাঙ্ক্ষিত ‘এস-৪০০’ আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা সরবরাহ করবেন বলে ইরান এবার অত্যন্ত ‘আশাবাদী’। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির বিশেষ বার্তা নিয়ে তার নিরাপত্তা প্রধান মোহসেন রেজায়ি গত বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) ক্রেমলিনে যান। রুশ প্রেসিডেন্টের কাছে পাঠানো ওই ব্যক্তিগত চিঠির মূল দাবিই ছিল এই সর্বাধুনিক অস্ত্রের সরবরাহ নিশ্চিত করা।
মস্কোয় বৈঠক শেষে মোহসেন রেজায়ি জানান, পুতিনের সঙ্গে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক বিষয়াদি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। এছাড়া যুদ্ধোত্তর পরিস্থিতি এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়েও সেখানে অর্থবহ কথা হয়েছে। একই সঙ্গে রাশিয়া ও ইরানের মধ্যে একটি নতুন গ্যাস পাইপলাইন নির্মাণের বিষয়টি নিয়েও আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্ভাব্য দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের মুখোমুখি হতে এবং নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে সম্প্রতি রাশিয়ার সঙ্গে বেশ কয়েকটি অস্ত্র চুক্তি করেছে ইরান। মার্কিন চাপ মোকাবিলা করতে এবং স্বাধীন পরাশক্তিগুলোর সঙ্গে সামরিক সম্পর্ক জোরালো করতে দেশটির নিরাপত্তা কর্মকর্তারা আগে থেকেই কিছু গোপন সুপারিশ তৈরি করেছিলেন। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যুদ্ধ শুরু করার ঠিক আগমুহূর্তে ইরানের সংসদের একটি গোপন কমিটি এই সুপারিশগুলো প্রণয়ন করে। যেখানে এয়ার ডিফেন্স, মিসাইল ও ড্রোন খাতকে সবচেয়ে বেশি শক্তিশালী করার ওপর জোর দেওয়া হয়।
মার্কিন ও ইসরায়েলি হামলায় ইরানের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এমনকি দেশটির আকাশসীমা, পারমাণবিক স্থাপনা এবং সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনিসহ শীর্ষ কমান্ডারদের নিরাপত্তা দিতেও এই ব্যবস্থা ব্যর্থ হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে এস-৪০০ ব্যবস্থা হাতে পাওয়া ইরানের প্রতিরক্ষা নীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, ইসরায়েল ও মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশের সঙ্গে নিজেদের সম্পর্ক নষ্ট হওয়ার আশঙ্কায় মস্কো দীর্ঘদিন ধরে এই অস্ত্র বিক্রির বিষয়টি ঝুলিয়ে রেখেছে। এছাড়া ইউক্রেনের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার মুখে রাশিয়ার নিজস্ব আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থাও প্রবল চাপের মধ্যে রয়েছে। ফলে তেহরানের চাহিদা থাকলেও মস্কোর জন্য এই প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাগুলো দেওয়া বেশ কঠিন হতে পারে।
এদিকে গত বৃহস্পতিবার ফাঁস হওয়া রুশ প্রতিরক্ষা শিল্পের নথিপত্র থেকে জানা গেছে, রাশিয়া গোপনে ইরানের জন্য হেলিকপ্টার-লঞ্চ করা ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করছে। ‘কে-১০’ কোডের আওতায় রুশ রাষ্ট্রীয় কারখানাগুলো ইরানের জন্য বিশেষায়িত ক্ষেপণাস্ত্র লঞ্চিং সরঞ্জাম তৈরি করছে। ২০২৪ সালের একটি ডেলিভারি সিডিউল অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে ইরানে পাঠানোর জন্য ৯০টি টুইন-রিল লঞ্চারের পাওয়ার ইউনিট তৈরির কাজ চলছে।
অন্যদিকে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধে মস্কোর সঙ্গে সরাসরি আলোচনার পথ খুঁজতে গিয়ে রাশিয়া ও ইরানের সম্পর্ককে লঘু করে দেখানোর চেষ্টা করছেন। গত ১২ অক্টোবর ট্রাম্প রুশ ও চীনা সহায়তার দাবিকে পাত্তাই দেননি। তার দাবি, গত ২১ অক্টোবর রুশ প্রেসিডেন্ট পুতিন মার্কিন দূত স্টিভ উইটকফকে জানান, সংকট সমাধানে তারা যেকোনো সাহায্য করতে প্রস্তুত।
ইরানের যুদ্ধ পরিকল্পনা সংক্রান্ত গোপন নথিতে বলা হয়েছে, গত চার দশক ধরে বহিরাগত চাপের মুখে ইরানি জনগণের প্রতিরোধ প্রমাণ করেছে যে ভেতর থেকে পতন ঘটানোর কৌশল সহজে সফল হবে না। চীন ও রাশিয়ার মতো নতুন বৈশ্বিক শক্তিগুলো মার্কিন এজেন্ডা মেনে চলতে নারাজ, যা ইরানকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আরও বেশি কূটকৌশল ব্যবহারের সুযোগ করে দিয়েছে। মার্কিন কৌশলের বিরুদ্ধে ‘বুদ্ধিদীপ্ত’ জবাব দিতে হলে প্রতিরোধ অর্থনীতি শক্তিশালী করা, তেল আয়ের ওপর নির্ভরতা কমানো এবং চীন ও রাশিয়ার মতো স্বাধীন পরাশক্তির সঙ্গে সামরিক সম্পর্ক গড়ে তোলার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
নথিতে আরও বলা হয়েছে, পশ্চিমা দেশগুলোর এই ভুল ধারণা বদলাতে হবে যে ইরান বর্তমানে দুর্বল অবস্থানে রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলটিতে বিশ্বের প্রায় ৬০ শতাংশ তেল এবং ৪০ শতাংশ গ্যাস এবং হরমুজ প্রণালি, বাবা আল-মান্দেব ও সুয়েজ খালের মতো কৌশলগত চোকপয়েন্ট রয়েছে, যার মধ্য দিয়ে বৈশ্বিক তেল বাণিজ্যের এক তৃতীয়াংশ যাতায়াত করে।
নিষেধাজ্ঞা প্রসঙ্গে নথিতে বলা হয়েছে, নিষেধাজ্ঞাগুলো ক্ষতিকর হলেও তা দেশের প্রতিরক্ষা প্রযুক্তির বিকাশকে মন্থর করেছে। যুদ্ধবিমান বা যন্ত্রাংশ কেনা অসম্ভব করে তুললেও এটি দেশীয় প্রযুক্তিতে বাবর-৩৭৩ আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা এবং শাহেদ-১৩৬ ও আবাবিলের মতো ড্রোন তৈরির পথ প্রশস্ত করেছে। নিষেধাজ্ঞাগুলো কখনও ইরানকে থামাতে পারেনি।



