১২ মাসের মধ্যে নিজস্ব ‘সার্বভৌম এআই’ অবকাঠামো চালুর পরিকল্পনা সরকারের


কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) বিশ্বে দ্রুত বদলে যাচ্ছে অর্থনীতি, শিল্প ও ব্যবসার চিত্র। যে দেশ যত বেশি নিজস্ব প্রযুক্তি তৈরি করতে পারছে, বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় এগিয়ে যাওয়ার সুযোগও তৈরি হচ্ছে তাদের। বাংলাদেশেও এআই ব্যবহারের প্রবণতা বাড়ছে। কিন্তু বিদেশি প্রযুক্তি ব্যবহার করেই কি এই প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা সম্ভব? সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শুধু প্রযুক্তির ব্যবহারকারী হয়ে থাকলে চলবে না, বাংলাদেশকে নিজস্ব এআই তৈরি, গবেষণা, দক্ষ জনবল ও প্রযুক্তিগত অবকাঠামো গড়ে তুলতে হবে। অন্যদিকে প্রযুক্তি খাতে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং নতুন শিল্প গড়ে তোলার সম্ভাবনাও তৈরি হচ্ছে।
তবে এই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে প্রযুক্তিগত সক্ষমতা অর্জন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় শুধু বিদেশি প্রযুক্তি ব্যবহার করে এগিয়ে থাকা সম্ভব নয়। দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক সক্ষমতা ও প্রযুক্তিগত স্বাধীনতা অর্জন করতে হলে নিজস্ব এআই অবকাঠামো, বাংলা ভাষার লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল (এলএলএম), গবেষণা, দক্ষ মানবসম্পদ এবং দেশীয় উদ্ভাবন গড়ে তুলতে হবে।
এ লক্ষ্যে আগামী ১২ মাসের মধ্যে বাংলাদেশের নিজস্ব সার্বভৌম এআই অবকাঠামো চালুর পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। একই সঙ্গে এআইকে কেন্দ্র করে নতুন বিনিয়োগ, প্রযুক্তি উদ্যোক্তা তৈরি এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের সম্ভাবনাও তৈরি হচ্ছে।
এ প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তিবিষয়ক উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ জানিয়েছেন, আগামী বছরের মধ্যে বাংলাদেশে সার্বভৌম এআই অবকাঠামো চালু করা হবে। এ জন্য প্রয়োজনীয় কম্পিউটিং চিপ ও মেমোরি মডিউল সংগ্রহের ব্যবস্থা নিশ্চিত হয়েছে। এ অবকাঠামো বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, স্টার্টআপ, বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষার্থীদের জন্য উন্মুক্ত রাখা হবে। এর মাধ্যমে দেশীয় প্রযুক্তিবিদরা বাংলা ভাষার নিজস্ব এলএলএম তৈরি এবং নতুন এআইভিত্তিক সেবা উদ্ভাবনের সুযোগ পাবেন। বর্তমানে এআইয়ের ব্যবহার বাড়লেও উন্নত মডেল তৈরি ও পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় কম্পিউটিং অবকাঠামো, উচ্চক্ষমতার জিপিইউ, বিপুল তথ্যভাণ্ডার এবং গবেষণার সুযোগ সীমিত। ফলে বিদেশি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের তৈরি মডেল ও ক্লাউড সেবার ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। নিজস্ব অবকাঠামো তৈরি হলে এ নির্ভরতা কমানোর পাশাপাশি স্থানীয় উদ্যোক্তাদের নতুন পণ্য ও সেবা তৈরির সুযোগ বাড়বে।
উপদেষ্টার ভাষ্য অনুযায়ী, শুরুতেই বিশাল কোনো এআই কেন্দ্র নির্মাণের পরিবর্তে ছোট ও মডিউলার অবকাঠামো গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। বেসরকারি খাতের চাহিদা বাড়লে স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলোও সেখানে নিজস্ব প্রযুক্তিগত সক্ষমতা যুক্ত করতে পারবে। উন্নতমানের জিপিইউ সংগ্রহের জন্য আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আলোচনা চলছে।
এদিকে এআই ও সেমিকন্ডাক্টর খাতকে কেন্দ্র করে বিনিয়োগের নতুন সম্ভাবনা দেখছে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা)। বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন (আশিক চৌধুরী) প্রযুক্তিনির্ভর শিল্প, উচ্চমূল্য সংযোজন এবং উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। বিশেষ করে সেমিকন্ডাক্টর খাতে বাংলাদেশের বিনিয়োগ সম্ভাবনা রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেছেন।
তিনি বলেন, এ খাতে বিপুল বিনিয়োগের সুযোগ থাকলেও তৈরি পোশাকশিল্পের মতো ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে না; বরং প্রযুক্তিগত দক্ষতা, উচ্চমূল্যের উৎপাদন ও নতুন বাজার তৈরির সম্ভাবনা বেশি। এখানে বিনিয়োগের বিষয়টি শুধু এআই সফটওয়্যার তৈরিতে সীমাবদ্ধ নয়। ডেটা সেন্টার, ক্লাউড কম্পিউটিং, সেমিকন্ডাক্টর, চিপ ডিজাইন, সাইবার নিরাপত্তা, সফটওয়্যার উন্নয়ন এবং এআইভিত্তিক শিল্পসেবা সব ক্ষেত্রেই নতুন বিনিয়োগের সুযোগ রয়েছে। তবে এসব খাতে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের পাশাপাশি স্থানীয় প্রতিষ্ঠান ও উদ্যোক্তাদের সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি।
সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইকোনমিক রিসার্চের (সিএসইআর) চেয়ারম্যান ও ল্যাবএইড হাসপাতাল গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সাকিফ শামীমের মতে, বাংলাদেশকে এখন প্রযুক্তি ব্যবহারের পর্যায় থেকে নিজস্ব প্রযুক্তি তৈরির সক্ষমতা অর্জনের দিকে যেতে হবে। বিদেশি প্রতিষ্ঠানের তৈরি সফটওয়্যার, ক্লাউড সেবা কিংবা এআই মডেল ব্যবহার করে তাৎক্ষণিক সুবিধা পাওয়া সম্ভব। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক মূল্য তৈরি করতে হলে নিজস্ব গবেষণা, দক্ষ মানবসম্পদ, স্থানীয় তথ্যভাণ্ডার, প্রযুক্তি উন্নয়নের অবকাঠামো এবং উদ্ভাবনী উদ্যোগ প্রয়োজন।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের কৃষি, জলবায়ু, জনসংখ্যার ঘনত্ব, ভাষা ও শিল্পের সামঞ্জস্যতা উন্নত দেশগুলোর চেয়ে আলাদা। ফলে বিদেশে তৈরি প্রযুক্তি সরাসরি ব্যবহার করে দেশের সব সমস্যার কার্যকর সমাধান পাওয়া সম্ভব নয়। আকস্মিক বন্যার পূর্বাভাস, কৃষকের জন্য আবহাওয়াভিত্তিক পরামর্শ, নগর পরিবহনের যানজট নিয়ন্ত্রণ, পোশাকশিল্পের উৎপাদন ক্ষমতা বৃদ্ধি এবং বাংলা ভাষায় নির্ভুল ডিজিটাল সেবা নিশ্চিতকরণে স্থানীয় তথ্য ও বাস্তবতার ভিত্তিতে এআই তৈরি করতে হবে। তার মতে, গুরুত্ব দিতে হবে বাংলা ভাষাভিত্তিক এআই উন্নয়নে। শুধু প্রমিত বাংলা নয়, আঞ্চলিক ভাষা, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটও বুঝতে সক্ষম প্রযুক্তি তৈরি করা প্রয়োজন। এ জন্য মানসম্মত বাংলা ডিজিটাল তথ্যভাণ্ডার, ভাষা প্রক্রিয়াকরণে গবেষণা এবং নিজস্ব এআই মডেল উন্নয়নে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ জরুরি।
সাকিফ শামীমের বিশ্লেষণে আরও উঠে এসেছে, বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও শিল্প খাতের মধ্যে কার্যকর সহযোগিতা ছাড়া এ সক্ষমতা তৈরি হবে না। বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণাকে শিল্পের বাস্তব সমস্যার সমাধানে কাজে লাগাতে যৌথ গবেষণা, প্রযুক্তি স্থানান্তর, গবেষণায় অর্থায়ন এবং মেধাস্বত্ব সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে এআই, ডেটা সায়েন্স, মেশিন লার্নিং, রোবটিক্স ও সাইবার নিরাপত্তায় প্র্যাক্টিক্যাল লার্নিং বাড়াতে হবে। বিদ্যমান কর্মীদেরও নতুন প্রযুক্তির সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর জন্য পুনঃদক্ষতা অর্জনের সুযোগ দিতে হবে।
সাকিফ শামীমের মতে, বাংলাদেশের ডিজিটাল অগ্রযাত্রার পরবর্তী ধাপ হওয়া উচিত প্রযুক্তি ব্যবহারের পাশাপাশি প্রযুক্তি তৈরির সক্ষমতা অর্জন। বিদেশি প্রযুক্তি গ্রহণের প্রয়োজন থাকবে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের জন্য নিজস্ব জ্ঞান, গবেষণা ও উদ্ভাবনের ভিত্তি তৈরি করতে হবে। এআই খাতে বিনিয়োগের সম্ভাবনা শুধু প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ব্যাংকিং, স্বাস্থ্যসেবা, কৃষি, শিক্ষা, তৈরি পোশাক, পরিবহণ ও সরবরাহব্যবস্থায় এআইয়ের ব্যবহার বাড়লে উৎপাদনশীলতা এবং সেবার মান বাড়বে। পাশাপাশি দেশীয় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের জন্য নতুন বাজার তৈরি হবে।



