খাদ্য নিরাপত্তা ও পুষ্টি উন্নয়নে WFP এর কারিগরি ও আর্থিক সহায়তা চাইলেন খাদ্যমন্ত্রী


খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, পুষ্টিমান উন্নয়ন, ফর্টিফায়েড চালের কার্যকারিতা মূল্যায়ন এবং সরকারি খাদ্যশস্যের মজুত ব্যবস্থাপনা আরও কার্যকর করতে জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (WFP)-এর কারিগরি ও আর্থিক সহায়তা চেয়েছেন খাদ্যমন্ত্রী আফরোজা খানম এমপি।
আজ সোমবার সকালে খাদ্যমন্ত্রীর অফিসকক্ষে WFP বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর মিস কোকো উশিয়ামার নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদলের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে তিনি এ সহায়তা কামনা করেন।
বৈঠকে খাদ্য নিরাপত্তা ও পুষ্টি উন্নয়নে চলমান সহযোগিতা জোরদার, ফর্টিফায়েড চালের পুষ্টিগত কার্যকারিতা যাচাইয়ে গবেষণা, কৌশলগত খাদ্যশস্যের মজুত ব্যবস্থাপনা এবং সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সম্প্রসারণসহ পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা হয়।
বৈঠকে খাদ্যমন্ত্রী বলেন, “বাংলাদেশ সরকারের অগ্রাধিকার হচ্ছে দেশের প্রতিটি মানুষের খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং পুষ্টিসমৃদ্ধ খাবারের প্রাপ্যতা বাড়ানো। এ লক্ষ্য অর্জনে WFP দীর্ঘদিন ধরে আমাদের গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন সহযোগী হিসেবে কাজ করছে। আমরা এই সহযোগিতাকে আরও সম্প্রসারণ করতে চাই।”
খাদ্যমন্ত্রী বলেন, দেশের খাদ্যশস্যের গুণগত মান দীর্ঘদিন ধরে বজায় রাখা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। বিশেষ করে সরকারি খাদ্যগুদামে সংরক্ষিত চালের মান রক্ষা এবং দীর্ঘমেয়াদি মজুত ব্যবস্থাপনা আরও কার্যকর করতে একটি সমন্বিত নীতিমালা ও স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউর (SOP) প্রণয়নে WFP-এর কারিগরি সহায়তা প্রয়োজন।
তিনি আরও বলেন, সরকারের খাদ্যবান্ধব কর্মসূচিসহ বিভিন্ন সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে পুষ্টিসমৃদ্ধ ও ফর্টিফায়েড চাল বিতরণ করা হচ্ছে। তবে এ কর্মসূচির প্রকৃত পুষ্টিগত প্রভাব ও কার্যকারিতা সম্পর্কে নিজস্ব গবেষণালব্ধ তথ্য থাকা জরুরি। এ লক্ষ্যে একটি প্রভাব মূল্যায়ন গবেষণা পরিচালনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। গবেষণাটি সম্পন্ন করতে প্রায় ৪ লাখ থেকে সাড়ে ৪ লাখ মার্কিন ডলার প্রয়োজন হতে পারে। এ গবেষণায় WFP-এর আর্থিক ও কারিগরি সহায়তা আশা করেন তিনি।
খাদ্যমন্ত্রী বলেন, “ফর্টিফায়েড চালের কার্যকারিতা সম্পর্কে বৈজ্ঞানিক ও নির্ভরযোগ্য প্রমাণ পাওয়া গেলে এ কর্মসূচির পরিধি আরও বাড়ানো এবং নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ সহজ হবে। বর্তমানে প্রায় ৩০০ উপজেলায় এ কর্মসূচি চালু রয়েছে। কর্মসূচিটি আরও সম্প্রসারণের আগে এর পুষ্টিগত সুফল সম্পর্কে শক্তিশালী প্রমাণ থাকা প্রয়োজন।”
তিনি আরও বলেন, দেশে চাল ও অন্যান্য খাদ্যপণ্যে পুষ্টি উপাদান সংযোজনের কার্যক্রম সম্প্রসারণে প্রয়োজনীয় নীতিমালা ও আইন প্রণয়নের বিষয়টিও বিবেচনায় রয়েছে। এ ক্ষেত্রে সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ, পণ্যের গুণগত মান নিশ্চিতকরণ এবং আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা কাজে লাগাতে WFP-এর সহযোগিতা প্রয়োজন।
বৈঠকে খাদ্যমন্ত্রী দেশের কৌশলগত খাদ্যশস্যের মজুত আরও কার্যকর ও দুর্যোগ-সহনশীল করার বিষয়ে গুরুত্বারোপ করেন। বন্যা, খরা, তাপপ্রবাহ, ভূমিকম্পসহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি ও সারের মূল্যবৃদ্ধির মতো অর্থনৈতিক অভিঘাত মোকাবিলায় খাদ্য মজুত ও সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির মধ্যে কার্যকর সমন্বয় গড়ে তোলার ওপর তিনি গুরুত্ব দেন।
WFP-এর কান্ট্রি ডিরেক্টর মিস কোকো উশিয়ামা বলেন, বাংলাদেশের খাদ্য নিরাপত্তা ও পুষ্টি উন্নয়নে WFP-এর সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে। আগামী পাঁচ বছরের পরিকল্পনায় কৌশলগত খাদ্য মজুত ব্যবস্থাপনা, সামাজিক নিরাপত্তা, খাদ্যশস্যের পুষ্টিমান উন্নয়ন ও স্কুল ফিডিং কর্মসূচিকে গুরুত্ব দেওয়া হবে।
তিনি বলেন, ফর্টিফায়েড চালের কার্যকারিতা যাচাইয়ে নিরপেক্ষ ও বৈজ্ঞানিক গবেষণা জরুরি। এ ক্ষেত্রে WFP সম্ভাব্য আর্থিক ও কারিগরি সহায়তার পাশাপাশি অন্যান্য উন্নয়ন সহযোগীদের সম্পৃক্ত করার উদ্যোগ নিতে পারে। এ জন্য বিস্তারিত ধারণাপত্র (Concept Note) তৈরির পরামর্শ দেন তিনি। পাশাপাশি পাকিস্তানসহ বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতা বিনিময়ের আশ্বাস দেন।
বৈঠকে স্থানীয় কৃষকদের উৎপাদিত খাদ্য দিয়ে স্কুল ফিডিং কর্মসূচি সম্প্রসারণ এবং এ বিষয়ে খাদ্য, কৃষি, শিক্ষা ও সামাজিক সুরক্ষাসংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর সমন্বিত উদ্যোগের সম্ভাবনা নিয়েও আলোচনা হয়।
উভয় পক্ষ আগামী পাঁচ বছরের সহযোগিতা পরিকল্পনা প্রণয়ন এবং ২০২৮ সাল থেকে নতুন অংশীদারত্ব কার্যক্রম শুরু করার বিষয়ে আলোচনা করে। এ সহযোগিতার মাধ্যমে খাদ্য নিরাপত্তা, পুষ্টি উন্নয়ন ও দুর্যোগ মোকাবিলায় বাংলাদেশের সক্ষমতা আরও জোরদার হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়।
বৈঠকে খাদ্যসচিব আবু তাহের মোহাম্মদ মাসুদ রানা, খাদ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. জসীম উদ্দিন খান, WFP বাংলাদেশের সিনিয়র পার্টনারশিপ অ্যাডভাইজার মো. মহসিন চৌধুরী, হেড অব প্রোগ্রাম জেসি উডসহ খাদ্য মন্ত্রণালয় ও WFP-এর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
একই দিন বিকেলে খাদ্যমন্ত্রী আফরোজা খানম এমপির সঙ্গে তাঁর সচিবালয়ের অফিসকক্ষে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন বাংলাদেশে নিযুক্ত ইটালির রাষ্ট্রদূত মি. আন্তোনিও আলেসান্দ্রো। এ সময় দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক, খাদ্য নিরাপত্তা ও খাদ্যশস্য সংরক্ষণে পারস্পরিক সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা হয়। সাক্ষাৎকালে খাদ্যসচিব, খাদ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক, বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যানসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।



