ফের হামলা হলে উপসাগরীয় ইন্টারনেট সেবায় আঘাতের হুমকি ইরানের


যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল আবার ইরানে হামলা চালালে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে সমুদ্রতলের যোগাযোগ কেবলগুলোতে আঘাত হানার বিস্তারিত পরিকল্পনা তৈরি করেছে তেহরান। ইরানের দুই জ্যেষ্ঠ নিরাপত্তা কর্মকর্তা বার্তাসংস্থা রয়টার্সকে এ তথ্য জানিয়েছেন।
তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, ওয়াশিংটনের সঙ্গে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা ব্যর্থ হলে নতুন করে সংঘাত শুরু হওয়ার ক্ষেত্রে সমুদ্রতলের ইন্টারনেট কেবলও ইরানের সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তু হতে পারে। তবে ঠিক কোথায় বা কীভাবে এসব কেবলে হামলা চালানো হবে, সে বিষয়ে বিস্তারিত জানাননি কর্মকর্তারা।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে তাদের একজন বলেন, হামলার পর কেবল মেরামতের কাজ বাধাগ্রস্ত করারও লক্ষ্য থাকবে ইরানের, যাতে ইন্টারনেট সংযোগসহ বিভিন্ন যোগাযোগসেবা দীর্ঘ সময় ধরে বিঘ্নিত হয়।
ওই কর্মকর্তা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, ‘ইরানে হামলা হলে আর কোনো সীমারেখা থাকবে না সমুদ্রতলের কেবল থেকে শুরু করে সামরিক ঘাঁটি, এমনকি গোপন ঘাঁটিও লক্ষ্যবস্তু হতে পারে।’
ওয়াশিংটনকে ‘আগুন নিয়ে না খেলার’ সতর্কবার্তা দিয়ে তিনি দাবি করেন, সমুদ্রতলের কেবলগুলোর অবস্থান ও ব্যবস্থায় ইরানের পূর্ণ প্রবেশাধিকার রয়েছে এবং দেশটি সহজেই সেগুলো ধ্বংস করতে পারে।
ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) রাজনীতিবিষয়ক উপপ্রধান ইয়াদোল্লাহ জাভানি বুধবার বলেছেন, ইরানের অবকাঠামোয় হামলা হলে হরমুজ প্রণালির নিচ দিয়ে যাওয়া সাতটি গুরুত্বপূর্ণ ইন্টারনেট কেবল লক্ষ্যবস্তু করা হতে পারে।
ইরান ও ওমানকে পৃথককারী হরমুজ প্রণালি পারস্য উপসাগরকে ওমান উপসাগর ও আরব সাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে। আন্তর্জাতিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে এই অঞ্চলের কেবলগুলো গুরুত্বপূর্ণ হলেও বিশ্বব্যাপী ইন্টারনেট ব্যবস্থায় এর প্রভাব কতটা পড়বে, তা নিয়ে বিশেষজ্ঞদের ভিন্ন মূল্যায়ন রয়েছে।
জাতিসংঘের সংস্থা আন্তর্জাতিক টেলিযোগাযোগ ইউনিয়নের (আইটিইউ) তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের প্রায় ৯৯ শতাংশ আন্তর্জাতিক ইন্টারনেট ট্রাফিক সমুদ্রতলের কেবলের মাধ্যমে পরিবাহিত হয়।
তবে টেলিযোগাযোগ গবেষণা প্রতিষ্ঠান টেলিজিওগ্রাফির গবেষণা পরিচালক অ্যালান মলডিনের মতে, হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিশ্বের আন্তর্জাতিক ব্যান্ডউইথের এক শতাংশেরও কম প্রবাহিত হয়। ফলে শুধু এই প্রণালির কেবলে হামলার কারণে বিশ্বব্যাপী ইন্টারনেট ব্যবস্থায় বড় ধরনের প্রভাব সীমিত থাকতে পারে।
সম্ভাব্য হামলার পরিকল্পনা ইঙ্গিত দিচ্ছে, নতুন করে মার্কিন সামরিক অভিযান শুরু হলে আগের তুলনায় আরও কঠোর জবাব দেওয়ার বিষয়ে ইরানের নেতৃত্বের মধ্যে অবস্থান জোরালো হচ্ছে।
ইরানের জ্যেষ্ঠ নিরাপত্তা কর্মকর্তা মোহসেন রেজায়ি চলতি মাসে সতর্ক করে বলেছেন, নতুন করে সংঘাত শুরু হলে উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ডিজিটাল অবকাঠামো বিশেষ করে ডেটা সেন্টার ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) স্থাপনাগুলো লক্ষ্যবস্তু হতে পারে।
উপসাগরীয় দেশগুলো তেলনির্ভর অর্থনীতি থেকে বেরিয়ে প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতি গড়ে তুলতে বিপুল বিনিয়োগ করছে। একই সঙ্গে তারা নিজেদের এআই প্রযুক্তির বৈশ্বিক কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করছে এবং মার্কিন প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করছে।
ইরানের দ্বিতীয় নিরাপত্তা কর্মকর্তা বলেন, উপসাগরীয় দেশগুলোর সরকার ও মার্কিন প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠানগুলোর উচিত সমুদ্রতলের কেবলে ক্ষয়ক্ষতি হলে তার দায় তেহরানের পরিবর্তে ওয়াশিংটনের ওপর দেওয়া।
ওয়াশিংটনভিত্তিক মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউটের ইরান কর্মসূচির পরিচালক অ্যালেক্স ভাতানকার মতে, এ ধরনের হুমকির উদ্দেশ্য নতুন করে সংঘাত শুরু হওয়া ঠেকানো এবং যুক্তরাষ্ট্রের ওপর চাপ সৃষ্টি করা।
তিনি বলেন, ‘তেহরান চায়, উপসাগরীয় দেশগুলো ও করপোরেট নির্বাহীরা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে তার নীতির কারণে এ অঞ্চলে তাদের বিনিয়োগ পরিকল্পনার ঝুঁকি সম্পর্কে চাপ দিক।’
বিশ্লেষকদের মতে, একাধিক সমুদ্রতলের কেবল একসঙ্গে বিচ্ছিন্ন হলে ইন্টারনেটের গতি কমে যেতে পারে এবং বিভিন্ন ডিজিটাল সেবা ব্যাহত হতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে—
– আর্থিক লেনদেন: আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং ও ডিজিটাল পেমেন্টে বিলম্ব বা বিঘ্ন ঘটতে পারে।
– ই-কমার্স: অনলাইন কেনাকাটা, অর্ডার প্রক্রিয়াকরণ ও আন্তসীমান্ত বাণিজ্য ব্যাহত হতে পারে।
– ক্লাউড কম্পিউটিং: দূরবর্তী সার্ভার, ডেটা সেন্টার ও অনলাইন সফটওয়্যার ব্যবহারে সমস্যা দেখা দিতে পারে।
– আন্তর্জাতিক যোগাযোগ: বিভিন্ন দেশের মধ্যে ডেটা আদান-প্রদানের গতি কমে যেতে পারে।
তবে ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা নির্ভর করবে ইন্টারনেট অপারেটররা কত দ্রুত বিকল্প পথে ডেটা প্রবাহ পরিচালনা করতে পারে এবং বিকল্প সংযোগগুলোর সক্ষমতা কতটা রয়েছে, তার ওপর।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যুদ্ধের সময় সমুদ্রতলের কেবল মেরামত করা কঠিন হয়ে পড়তে পারে। এর সঙ্গে বীমার ব্যয় বৃদ্ধি এবং সংশ্লিষ্ট দেশের জলসীমায় প্রবেশের অনুমতি পেতে বিলম্ব যুক্ত হলে মেরামতপ্রক্রিয়া আরও জটিল হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, হরমুজ প্রণালির তুলনায় লোহিত সাগর সমুদ্রতলের যোগাযোগ কেবলের জন্য আরও গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্যবস্তু হতে পারে। বিশেষ করে ইয়েমেনে ইরানের মিত্র হুতি গোষ্ঠীর সহায়তা পাওয়া গেলে এ অঞ্চলে ঝুঁকি বাড়তে পারে। তবে লোহিত সাগরের কেবল হামলার পরিকল্পনা রয়েছে এমন কোনো ঘোষণা তেহরান প্রকাশ্যে দেয়নি।
টেলিজিওগ্রাফির অ্যালান মলডিনের মতে, লোহিত সাগর দিয়ে ইউরোপ, পূর্ব আফ্রিকা ও এশিয়ার মধ্যে বিপুল পরিমাণ ডেটা আদান-প্রদান হয়। এ পথে থাকা কেবলগুলোর সক্ষমতা বিশ্বব্যাপী আন্তর্জাতিক ডেটার চাহিদার প্রায় তিন শতাংশ এবং বিভিন্ন অঞ্চলের মধ্যে চলাচলকারী ট্রাফিকের প্রায় ১০ শতাংশের সমতুল্য।
গত মার্চে ইরানের হামলায় সংযুক্ত আরব আমিরাতে অ্যামাজন ওয়েব সার্ভিসেসের (এডব্লিউএস) দুটি স্থাপনা সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। একই সময়ে বাহরাইনে তাদের আরেকটি স্থাপনার কাছাকাছি অবকাঠামোও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল।
যুদ্ধের তীব্র পর্যায়ে আইআরজিসি মাইক্রোসফট, গুগল, অ্যাপল ও এনভিডিয়ার মতো মার্কিন প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠানকে বৈধ লক্ষ্যবস্তু হিসেবে উল্লেখ করেছিল।
এ পরিস্থিতিতে উপসাগরীয় দেশ ও মার্কিন প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠানগুলো ইন্টারনেট সংযোগের বিকল্প পথ তৈরিতে বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে। স্থলভিত্তিক যোগাযোগব্যবস্থাও সমুদ্রতলের কেবলের বিকল্প হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
মাইক্রোসফট ২০৩০ সালের মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যে সমুদ্রতল ও স্থলভিত্তিক যোগাযোগ অবকাঠামো উন্নয়নে ৪০ কোটি ডলারের বেশি বিনিয়োগের পরিকল্পনা করেছে।
এদিকে রয়টার্সের পক্ষ থেকে ইরানের নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের বক্তব্য নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর ও ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছে মন্তব্য চাওয়া হলেও তাৎক্ষণিকভাবে কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। উপসাগরীয় দেশগুলোর পক্ষ থেকেও তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য আসেনি।
বিশ্লেষকদের মতে, সমুদ্রতলের যোগাযোগ কেবলকে লক্ষ্যবস্তু করার ইরানি হুমকি শুধু সামরিক সংঘাতের পরিসর বাড়ার আশঙ্কাই তৈরি করছে না; বরং উপসাগরীয় অঞ্চলে প্রযুক্তি, বিনিয়োগ ও বৈশ্বিক ডিজিটাল যোগাযোগের নিরাপত্তা নিয়েও নতুন উদ্বেগ সৃষ্টি করছে।



