Uncategorized

১০ম পর্ব : হারানো সেই সোনালী দিনগুলি…

আষাঢ় মাসের শুরু হলেই আমাদের আনন্দ যেন আরও বেড়ে যেত। বর্ষার পানি ধীরে ধীরে মাঠ-ঘাট, খাল-বিল আর চারপাশের নিচু জমিগুলো ভাসিয়ে দিতে শুরু করত। পাটক্ষেতে পানি জমলে সেই পানির সঙ্গে ছোট-বড় নানা জাতের মাছও এসে আশ্রয় নিত।

ভোরবেলা আমরা পাটক্ষেতের চারপাশে ছোট ছোট বাঁধ দিয়ে মাছ ধরতাম। ট্যাংরা, কানলা, কই, টাকি, শোল, মেনি—কত রকমের মাছ যে ধরতাম, তার কোনো হিসাব নেই।

সেই টাটকা মাছ দিয়ে আম্মা যখন ঝোল রান্না করতেন, ঘরজুড়ে ছড়িয়ে পড়ত এক অপূর্ব ঘ্রাণ। আমরা সবাই গোল হয়ে বসে মায়ের হাতের রান্না করা মাছের ঝোল দিয়ে ভাত খেতাম। পেট ভরে যেত, কিন্তু তার চেয়েও বেশি ভরে যেত মন।
কিন্তু দিনের আলোয় মাছ ধরার আনন্দ শেষ হতে না হতেই সন্ধ্যার পর শুরু হতো আমাদের আরেক রোমাঞ্চকর অভিযান।
সন্ধ্যা নামলেই আমরা বুন্দা কুপি নিয়ে মাছ ধরতে বের হতাম। বড় কুপি বাতিটিকে একটি টিনের বাক্সের মধ্যে এমনভাবে রাখা হতো, যাতে তার আলো সরাসরি পানির ওপর পড়ে। সেই আলোয় পানির নিচের মাছ দেখা যেত—এটাই ছিল আমাদের কৌশল।

আলমগীর ভাইকে সঙ্গে নিয়ে নৌকা নিয়ে বেরিয়ে পড়তাম। আমি নৌকা বাইতাম, আর আলমগীর ভাই চল দিয়ে মাছ শিকার করতেন।

পানির ওপর দিয়ে ধীরে ধীরে নৌকা এগিয়ে চলত। চারপাশে নিস্তব্ধ রাত, মাথার ওপর অসংখ্য তারা, আর কুপির আলোয় পানির নিচে মাছের ছুটে চলা—সেই দৃশ্য আমাদের কাছে ছিল এক অসাধারণ রোমাঞ্চ।

কাইক্কা, টাকি সহ নানা ধরনের মাছ আমরা শিকার করতাম। তবে এই আনন্দের মধ্যেও বিপদের কমতি ছিল না। মাছ ধরতে গিয়ে অনেক সময় বিষধর সাপের মুখোমুখি হতে হয়েছে। কখনো সাপ মেরেছি, কখনো আবার সাপ আমাদের ভয় দেখিয়ে পানির মধ্যে মিলিয়ে গেছে।

ভয় লাগত ঠিকই, কিন্তু মাছ ধরার নেশায় সেই ভয় বেশিক্ষণ স্থায়ী হতো না।

আমাদের গ্রামের মান্দিরবাড়ির লোকজনও মাছ ধরায় বেশ পারদর্শী ছিলেন। তাঁরা বড়া পেতে মাছ ধরতেন। বর্ষাকালে বড়াতে প্রচুর টাকি মাছ ধরা পড়ত।

বড়শির জন্য তাঁরা বিষকাটালি গাছের সঙ্গে পানি মিশিয়ে মাটিতে রেখে কেঁচো তুলতেন। সেই কেঁচো বড়শিতে গেঁথে পানিতে ছুড়ে দিতেন। কেউ সুতলি পেতে মাছ ধরতেন, কেউ চাই দিয়ে মাছ ধরতেন।

বর্ষাকালে পানির স্রোতে তেলাপোকা বড়শিতে গেঁথে গাওরা মাছও ধরতাম। কী যে অপূর্ব ছিল সেই মাছ ধরার বিকেলগুলো! আজও মনে পড়লে মনে হয়, সেই বিকেলের পানির গন্ধ, বাতাস আর মাছ ধরার উত্তেজনা যেন এখনো আমার চারপাশে ভেসে বেড়ায়।

তখন মাছ ধরার পদ্ধতিও ছিল কত বিচিত্র!
কেউ লাট টেনে মাছ ধরতেন। আমাদের বাড়ির আফরোজ কাকা আরও দুজনকে সঙ্গে নিয়ে লাট টেনে মাছ ধরতেন। দুজন বড় দড়ি নিয়ে পানিতে নামতেন, আর আরেকজন নৌকার মধ্যে পেলুইন ধরে রাখতেন। পানির ভেতর থেকে দুজন ধীরে ধীরে দড়ি টেনে আনতেন। একপর্যায়ে বিশেষ কায়দায় দড়িটিকে পেলুইনের বরাবর নিয়ে আসা হতো। দড়ির মধ্যে আটকে থাকা মাছগুলো ধীরে ধীরে পেলুইনের ভেতরে ঢুকে পড়ত।

একেকবার টান দিতেই দেখা যেত, নানা জাতের মাছ এসে পেলুইনের মধ্যে জমা হয়েছে। সেই মাছগুলো থাকত একেবারে টাটকা—কোনো আঘাত বা ক্ষত ছাড়াই। যেন পানির বুক থেকে সরাসরি আমাদের হাতে উঠে এসেছে।

কেউ ছটকি জাল দিয়ে মাছ ধরতেন, কেউ অন্য কোনো কৌশলে। হরেক রকম পদ্ধতি, হরেক রকম কৌশল—কিন্তু সবার উদ্দেশ্য ছিল একটাই—মাছ ধরা।

আমাদের বাড়ির দক্ষিণ দিকে জমিগুলো ডুবে গেলে সেখানে যেন মাছের এক বিশাল অভয়ারণ্য তৈরি হতো। একদিন আশপাশের অন্যান্য মানুষের সঙ্গে আমার আব্বাও পেলুইন দিয়ে মাছ ধরছিলেন। হঠাৎ একটি শিং মাছ আব্বার পায়ে কাঁটা বিধিয়ে দিল।

শিং মাছের কাঁটা বিধার পর যন্ত্রণায় আব্বা কাতরাতে লাগলেন। পরে তাঁকে তাজুল ইসলাম ভাইয়ের বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হলো। সেখানে বিভিন্ন কায়দায় শিং মাছের বিষ নামানোর চেষ্টা করা হয়। পায়ের যে অংশে কাঁটা বিধেছিল, সেখানে ব্লেড দিয়ে সামান্য কেটে বিষাক্ত রক্ত বের করা হয়। অনেকক্ষণ পর আব্বা কিছুটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন।

আমার নিজের পায়েও একবার শিং মাছের কাঁটা বিধেছিল। সেই যন্ত্রণা আজও মনে আছে। শিং মাছের কাঁটায় যেন বিষ থাকে—মনে হয়, সাপে ছোবল দিয়েছে। প্রচণ্ড ব্যথা করত। কিন্তু সেই যন্ত্রণার কথা জেনেও মাছ ধরার আনন্দ থেকে আমরা কখনো পিছিয়ে যাইনি।

প্রতিদিন বড়শি দিয়েও মাছ ধরতাম। বাড়ির চারপাশের পুকুর, ডোবা আর পানিভরা জমিতে অনেকেই বড়শি ফেলতেন। বড়শিতে আটা গুলে ছোট ছোট মন্ড করে গেঁথে পানিতে ফেললেই পুঁটি মাছ এসে ধরা পড়ত। এভাবে কত পুঁটি মাছ যে ধরেছি, তার কোনো হিসাব নেই।

আমার ছোট ফুফু লাইলী ফুফুও আমাকে নিয়ে বড়শি পাততেন। ফুফুর প্রায় দশ-বারোটা বড়শি ছিল। একবার ফুফু আমাকে বড়শিগুলোর পাশে বসিয়ে রেখে ঘরের অন্য কাজে চলে গিয়েছিলেন।

হঠাৎ দেখি, একটি বড়শির বোডাং পানির নিচে চলে গেছে। বুঝলাম, মাছ ধরা পড়েছে! আমি তখন প্রাণপণে বড়শিটি টেনে মাছটাকে তোলার চেষ্টা করতে লাগলাম। কিন্তু আমার ছোট্ট শরীরের শক্তি মাছটির সঙ্গে পেরে উঠছিল না। অনেক চেষ্টা করেও মাছটাকে উঠাতে পারলাম না। ফুফু ফিরে আসার আগেই মাছটি বড়শি থেকে ছুটে গেল।

সেই মাছটাকে ধরতে না পারার কষ্ট কতটা ছিল, তা ভাষায় বোঝানো কঠিন। ফুফু ফিরে এসে পরে আরও অনেক মাছ ধরেছিলেন। কিন্তু আমার হাত থেকে যে মাছটি ছুটে গিয়েছিল, তার জন্য আমার আফসোসের কোনো সীমা ছিল না।
লাইলী ফুফুকে ঘিরে আমার আরও কত স্মৃতি!

ফুফুকে নিয়ে আমরা ছোট ছোট পাখিও ধরতাম। বিশেষ করে ডাহুক পাখি ধরার জন্য কত চেষ্টা করেছি! কত পাখির বাচ্চা যে ধরেছি, তার হিসাব নেই। শালিক, ডাহুক, দোয়েল—বিভিন্ন পাখির বাচ্চা ধরতাম। আমাদের অঞ্চলের চৈটটল পাখি ধরে পোষ মানানোরও চেষ্টা করতাম।

পাখির খাবার জোগাড় করার জন্য ফড়িং ধরতাম। ছোট ছোট মাছ ধরে পাখিকে খাওয়াতাম। বিড়ালের হাত থেকে পাখিগুলোকে বাঁচিয়ে রাখতাম। সব মিলিয়ে তখন আমাদের ব্যস্ততার যেন কোনো শেষ ছিল না।

আমার মতোই সুলতান কাকার ছেলে বাহার ভাই, তাহের মিয়া, জাহের, লিটন, সবজু ভাই—সবাইকে নিয়ে সারাদিন কত কিছুতেই না ব্যস্ত থাকতাম!

বর্ষা যখন পানিতে টইটম্বুর হয়ে উঠত, তখন আমাদের প্রতিটি বাড়িই যেন একেকটি ছোট্ট দ্বীপে পরিণত হতো। বাড়ির আশপাশের ডুবে যাওয়া জমিগুলোতে শাপলা-শালুক হেসে উঠত। সাদা আর লাল শাপলার ফুলে পানির বিস্তীর্ণ এলাকা হয়ে উঠত রঙিন।

পানির নিচে জন্ম নিত লামকলা। আমরা লামকলা তুলে নিয়ে আসতাম। আম্মা কখনো লামকলা চিংড়ি মাছ দিয়ে রান্না করতেন, কখনো শাপলা দিয়ে চিংড়ি মাছের তরকারি বানাতেন। কী যে অসাধারণ স্বাদ ছিল সেই রান্নার! এত বছর পরও যেন সেই স্বাদ জিভে লেগে আছে।

আমাদের বাড়ির পূর্ব পাশে ছোট্ট একটি জায়গা ছিল। তার পূর্ব পাশে ছিল পুকুরের পাড়, দক্ষিণ পাশে ছিল আমাদের বাড়িতে প্রবেশের রাস্তা, আর পশ্চিম পাশে ছিল আমাদের বাড়ি। উত্তর দিকের অল্প কিছু জায়গা আমি মাটি দিয়ে ভরাট করে রেখেছিলাম; বাকিটুকু বর্ষার পানিতে তলিয়ে থাকত।

প্রতিদিন সেখানে মাছের খাবার দিতাম। আশপাশের নানা জাতের মাছ এসে সেই জায়গাটিতে আশ্রয় নিত। একদিন পরপর সেই জায়গার পানি আটকে শেঁচে মাছ ধরতাম। সারা বছরই সেখানে হরেক রকম মাছ পেতাম। কত মাছ যে ধরেছি, তার কোনো ইয়ত্তা নেই।

আশপাশের বাড়ির লোকজনও তখন বিভিন্ন কায়দায় মাছ ধরার কাজে ব্যস্ত থাকতেন। মনে হতো, বর্ষা যেন শুধু পানি নিয়ে আসেনি—সঙ্গে নিয়ে এসেছে আমাদের জন্য এক বিশাল আনন্দের উৎসব।

মাছ ধরার পাশাপাশি আমার শৈশবের সাথী আলম, বিল্লাল, জিতনসহ আরও অনেকে সারাদিন পানিতে ডুবাডুবি খেলায় মেতে থাকতাম। কলাগাছ দিয়ে ভেলা বানাতাম। সেই ভেলায় চড়ে পানির মধ্যে ঘুরে বেড়াতাম, খেলতাম, সাঁতার কাটতাম। কখনো কখনো সারাদিনই কেটে যেত পানির মধ্যে।

কত আনন্দ, কত হাসি, কত নির্মল স্মৃতি নিয়ে যে আমাদের শৈশব কেটেছে! আজ এত বছর পর ফিরে তাকালে মনে হয়—আমাদের শৈশব কতটা সমৃদ্ধ ছিল! আমাদের হাতে দামি খেলনা ছিল না। ছিল না মোবাইল ফোন। বিদ্যুৎ ছিল না, তাই টেলিভিশনের সামনে বসে থাকার অভ্যাসও ছিল না। আমাদের খেলনা ছিল মাটির পথ। আমাদের আনন্দ ছিল নদী-খাল-বিল। আমাদের বিনোদন ছিল মাছ ধরা, নৌকায় ঘুরে বেড়ানো, মাঠে দৌড়ানো আর বন্ধুদের সঙ্গে গল্প করা।

অভাব ছিল, কিন্তু আনন্দের কোনো অভাব ছিল না। আমাদের খাবার ছিল সাদামাটা, কিন্তু তাতে মিশে থাকত মায়ের ভালোবাসার স্বাদ। আমাদের পোশাক ছিল সাধারণ, কিন্তু তাতে ছিল নির্মল আনন্দ। আমাদের পথ ছিল মেঠো, কিন্তু সেই পথেই লুকিয়ে ছিল জীবনের সবচেয়ে সুন্দর স্মৃতিগুলো।

জীবনের একটা বড় অংশ এভাবেই কেটে গেছে—মাটির গন্ধে, সরিষার হলুদ ফুলের সৌন্দর্যে, পাটক্ষেতের পানিতে, কুপির ক্ষীণ আলোয় মাছ ধরতে ধরতে, আর মায়ের হাতের রান্নার ঘ্রাণে।

আজ এত বছর পর ফিরে তাকালে মনে হয়—
সেই দিনগুলো সত্যিই সোনালী ছিল।
সেই দিনগুলো আর কখনো ফিরে আসবে না।
মানুষ বদলে গেছে।
সময় বদলে গেছে।
গ্রাম বদলে গেছে।
আমরাও বদলে গেছি।
শুধু স্মৃতিগুলো আজও একই রকম রয়ে গেছে।

তাই তো আজও কখনো কখনো মনে মনে ফিরে যাই সেই মেঠোপথে—
সরিষার হলুদ ফুলের মাঝখান দিয়ে,
কুপির ক্ষীণ আলো হাতে নিয়ে,
নৌকার বৈঠা হাতে নিয়ে,
আর মায়ের রান্নার সেই চিরচেনা গন্ধের টানে।
ফিরে যাই আমার সেই হারানো সোনালী দিনগুলোর কাছে।
চলবে…..

লেখক : কবীর আহমেদ ভূঁইয়া ,আন্তর্জাতিক ব্যবসায়ী। রাজনৈতিক ও উন্নয়ন কৌশলবিদ প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান, ভূঁইয়া গ্লোবাল ফাউন্ডেশন।

এই বিভাগের আরও সংবাদ