আন্তর্জাতিক

ইরানের প্রস্তাবে ‘না’, নিজের বিপদ বাড়াচ্ছেন ট্রাম্প?

ইরানের দেওয়া যুদ্ধবিরতি প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তেহরানের ওপর আরও চাপ বাড়ানোর কৌশল অবলম্বন করছেন। কিন্তু এই কৌশল শেষ পর্যন্ত উল্টো তার জন্য বড় ধরনের সংকট তৈরি করতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

ট্রাম্প কেন এই প্রস্তাব এখনই গ্রহণ করতে চাইছেন না, আল জাজিরার এক বিশ্লেষণে বলা হচ্ছে, এর পেছনে রয়েছে ইরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ বাড়ানোর হিসাব। ওয়াশিংটনের ধারণা, নিষেধাজ্ঞা, নৌ অবরোধ এবং ইরানের জ্বালানি আয়ের ওপর চাপ আরও বাড়ালে তেহরান শেষ পর্যন্ত আরও বড় ছাড় দিতে বাধ্য হবে। ফলে এখনই সমঝোতায় না গিয়ে আরও কিছু সময় অপেক্ষা করাকে ট্রাম্প প্রশাসন দর-কষাকষির হাতিয়ার হিসেবে দেখছে।

কিন্তু এখানেই তৈরি হচ্ছে বড় ঝুঁকি। বিশ্লেষক রিচার্ড ওয়েইটজের মতে, হোয়াইট হাউস হয়তো মনে করছে সময় যত গড়াবে, ইরানের অর্থনৈতিক দুরবস্থা তত বাড়বে এবং শেষ পর্যন্ত আরও ভালো শর্তে চুক্তি করা সম্ভব হবে। কিন্তু এই হিসাবের দুর্বলতা হলো, সময় শুধু ইরানের ওপরই চাপ তৈরি করে না, যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের ওপরও চাপ বাড়ায়।

এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় প্রভাবক হরমুজ প্রণালি। সেখানে জাহাজ চলাচল দীর্ঘ সময় ব্যাহত হলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেল ও গ্যাসের সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ আরো বাড়বে। এর প্রভাব পড়বে জ্বালানির দাম, পরিবহন ব্যয় এবং শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ওপর, যুক্তরাষ্ট্রের মানুষও এর বাইরে নয়।

হরমুজের সাথে আছে বাব আল-মানদেব প্রণালির ঝুঁকিও। যুক্তরাষ্ট্র চাপ বাড়ালে ইরানের মিত্র ইয়েমেনের হুথিরা লোহিত সাগরের এই গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশপথে চাপ সৃষ্টি করতে পারে। হরমুজের পাশাপাশি আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যপথে অস্থিরতা তৈরি হলে বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থায় বিশাল ধাক্কা আসবে।

বিশ্লেষকদের আরেকটি আশঙ্কা, অর্থনৈতিক চাপ বাড়লেই তেহরান যে আত্মসমর্পণ করবে, বিষয়টি মোটেই এত সরল নয়। বরং দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থাকে ইরান নিজেদের কৌশলগত সুবিধায় পরিণত করার চেষ্টা করতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, তেহরানের হিসাব হতে পারে, সময় যত যাবে, জ্বালানি বাজার, উপসাগরীয় মিত্র এবং মার্কিন অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও চাপ তত বাড়বে। ফলে তারাও সময় কেনার পক্ষপাতী।

এই মুহূর্তে এমনিতেই ইরান যুদ্ধ ও তার জেরে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধিসহ নানা ইস্যুতে চাপে আছে ট্রাম্প প্রশাসন। যুদ্ধ চলতে থাকলে নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনে এসব বড় প্রভাব রাখবে বলেই মনে করা হচ্ছে। রয়টার্স-ইপসোসের সাম্প্রতিক এক জরিপে ৬৩ শতাংশ মার্কিন নাগরিক ইরান যুদ্ধের বিরোধিতা জানিয়েছে।

ফলে ট্রাম্পের জন্য পরিস্থিতি অনেকটা সময়ের সঙ্গে পাল্লা দেওয়ার মতো। ওয়াশিংটন মনে করছে, অপেক্ষা করলে ইরান দুর্বল হবে। অন্যদিকে তেহরানও ধরে নিতে পারে, দীর্ঘ সংঘাতের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক মূল্য শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের জন্য আরও অসহনীয় হয়ে উঠবে।

কিংস কলেজ লন্ডনের সহযোগী অধ্যাপক আন্দ্রেস ক্রিগের মতে, ট্রাম্পের কৌশলের সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো, ইরানের ওপর তৈরি হওয়া চাপকে তেহরানের আত্মসমর্পণের ইচ্ছা হিসেবে ধরে নেওয়া। চাপ ইরানকে আলোচনায় আনতে পারে, কিন্তু তার মানে এই নয় যে চাপ বাড়ালে তেহরান প্রতিবারই আরও বেশি ছাড় দেবে।

ইরানের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে ট্রাম্প হয়তো এখন আরও ভালো চুক্তির জন্য অপেক্ষা করছেন। কিন্তু সেই অপেক্ষার মধ্যেই যদি হরমুজ ও বাব আল-মানদেব ঘিরে জ্বালানি সংকট আরও গভীর হয়, মিত্রদের ওপর চাপ বাড়ে এবং মার্কিন জনগণের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যায়, তাহলে দর-কষাকষির এই কৌশলই উল্টো বুমেরাং হয়ে উঠতে পারে ট্রাম্পের জন্য।

বিশ্লেষকরা বলছেন, দুই পক্ষই শেষ পর্যন্ত একটি চুক্তি চায়। কিন্তু সমস্যা হলো, ওয়াশিংটন ও তেহরান, উভয়েই বিশ্বাস করছে, এখনই সমঝোতায় যাওয়ার চেয়ে আরও কিছুদিন অপেক্ষা করলে নিজেদের জন্য আরও ভালো ছাড় আদায় করা সম্ভব হবে। আর এই পারস্পরিক অপেক্ষাই সংঘাতকে আরও দীর্ঘায়িত করার ঝুঁকি তৈরি করছে।

এই বিভাগের আরও সংবাদ