ভারতে চীনা প্রেসিডেন্টের জন্য নজীরবিহীন নিরাপত্তা বলয়


ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দিতে শনিবার (১২ সেপ্টেম্বর) ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে পৌঁছেছেন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। টানা সাত বছর পর এটিই তার প্রথম ভারত সফর।
সংক্ষিপ্ত কিন্তু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই ২৪ ঘণ্টার সফরে যোগ দিতে এক বিশাল বহর নিয়ে নতুন দিল্লিতে পা রেখেছেন তিনি। সফরকালে শনিবার সন্ধ্যায় ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে এক দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে বসার কথা রয়েছে শি জিনপিংয়ের।
দ্বিপক্ষীয় এই বৈঠকে দুই দেশের বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্পর্ক জোরদারের বিষয়টি আলোচনার প্রধান এজেন্ডা হিসেবে স্থান পেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে ভারত ও চীনের মধ্যে চলা একাধিক উচ্চপর্যায়ের কূটনৈতিক যোগাযোগের ধারাবাহিকতায় এই সফরটি অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
চীনা প্রেসিডেন্টের সঙ্গী হিসেবে রয়েছেন দেশটির জ্যেষ্ঠ সরকারি কর্মকর্তা ও শীর্ষ ব্যবসায়ীদের সমন্বয়ে গঠিত এক উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দল।
চীনা প্রেসিডেন্টের দিল্লি সফর ঘিরে গড়ে তোলা হয়েছে নজিরবিহীন ও বহুস্তরী নিরাপত্তা বলয়। একাধিক কেন্দ্রীয় ও রাজ্য নিরাপত্তা সংস্থা যৌথভাবে তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং সব ধরনের চলাচলের ওপর নজরদারির দায়িত্বে নিয়োজিত রয়েছে।
শি জিনপিং যে হোটেলে অবস্থান করছেন, তার চারপাশের আকাশসীমাকে সম্পূর্ণভাবে ‘নো-ফ্লাই জোন’ ঘোষণা করা হয়েছে। সেখানে মোতায়েন করা হয়েছে অ্যান্টি-টেরর এবং বোমা সনাক্তকরণ বিশেষজ্ঞ দল।
হোটেলের নিরাপত্তা তল্লাশি ও সার্বিক সুরক্ষায় নেওয়া হয়েছে সর্বোচ্চ সতর্কতা। এর মধ্যে সম্ভাব্য পারমাণবিক, তেজস্ক্রিয় ও বায়োকেমিক্যাল (জৈব-রাসায়নিক) হুমকির মতো মারাত্মক ঝুঁকি শনাক্ত ও প্রতিরোধ করার বিশেষ ব্যবস্থা রয়েছে। এমনকি হোটেলের চারপাশের ভূগর্ভস্থ পাইপলাইন ও অবকাঠামোও নিখুঁতভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে নিশ্চিত করা হয়েছে।
প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সফরকে কেন্দ্র করে চীন অন্তত ১০ দিন আগেই একটি বিশেষ কার্গো বিমানে করে তার চলাচলের ব্যবহৃত বিলাসবহুল ‘হংচি’ (Hongqi) স্টেট লিমুজিন গাড়ি, একটি ব্যাকআপ যান ও অত্যাধুনিক যোগাযোগ সরঞ্জাম ভারতে পাঠায়।
প্রায় ২৪ ঘণ্টার এই সফর শেষে রবিবার সকাল ১১টার দিকে ভারত মণ্ডপম থেকে বিমানবন্দরের উদ্দেশে রওনা হয়ে দিল্লি ত্যাগ করার কথা রয়েছে চীনা রাষ্ট্রপ্রধানের।
সফরে বিদেশি নিরাপত্তা দলগুলোর আনা সরঞ্জাম ও অস্ত্রের ক্ষেত্রে ভারতের নিজস্ব আইন ও বিধিমালা কঠোরভাবে কার্যকর করা হয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী, বিদেশি দলগুলোকে কোনো স্যাটেলাইট যোগাযোগ সরঞ্জাম ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া হয়নি।
সেই সঙ্গে দেশটির আইনে অননুমোদিত নির্দিষ্ট কিছু সামরিক অস্ত্র ও নিরাপত্তা সরঞ্জাম আমদানিতে নিষেধাজ্ঞা থাকায় তা পৌঁছানো মাত্রই শুল্ক কর্তৃপক্ষের (কাস্টমস) কাছে জমা রাখতে হয়েছে।
তবে ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিদ্যমান প্রোটোকল মেনে দিল্লি পুলিশ ও অন্যান্য এজেন্সির মধ্যে সমন্বয় করে চীনা সরকারের তোলা সব নিরাপত্তা সংক্রান্ত উদ্বেগের সুরাহা করা হচ্ছে।
রাষ্ট্রপ্রধানের যাতায়াতের জন্য শি জিনপিং ব্যবহার করছেন এয়ার চায়নার একটি বিশেষ রূপান্তর করা বোয়িং ৭৪৭-৮ উড়োজাহাজ। এটি চীনের প্রাথমিক রাষ্ট্রীয় প্লেন হওয়ার পাশাপাশি একটি উড়ন্ত কমান্ড সেন্টার বা আকাশপথের সামরিক নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র হিসেবেও কাজ করে।
২০১৪ সালে বাণিজ্যিক যাত্রীবাহী প্লেন হিসেবে বহরে যুক্ত করার পর ২০১৫ সালের মে মাসে এটি বহর থেকে তুলে নিয়ে কয়েক মাসব্যাপী ব্যাপক রূপান্তর ঘটানো হয়। ২০১৬ সালে এটি ভিআইপি অন্দরসজ্জা, অত্যন্ত নিরাপদ যোগাযোগব্যবস্থা ও বিশেষায়িত নিরাপত্তা প্রযুক্তি যুক্ত করে রাষ্ট্রীয় সেবায় আত্মপ্রকাশ করে।
উড়োজাহাজটিতে এনক্রিপ্ট করা স্যাটেলাইট যোগাযোগ সুবিধা রয়েছে, যা শি জিনপিংকে উড্ডয়নরত অবস্থাতেও চীন সরকার ও সামরিক কমান্ড সেন্টারের সঙ্গে সার্বক্ষণিক সরাসরি যোগাযোগের সুযোগ দেয়। এছাড়া বিমানের ইলেকট্রনিক সরঞ্জাম ও ফ্লাইট সুরক্ষায় রয়েছে থ্রেট-ডিটেকশন সিস্টেম, ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও তড়িৎ-চৌম্বকীয় তরঙ্গ নিরোধক ইএমপি (ইএমপি) শিল্ডিং প্রযুক্তি।
এদিকে, ব্রিকস সম্মেলন উপলক্ষে পুরো নয়াদিল্লিজুড়ে নিরাপত্তা ব্যবস্থা চরম মাত্রায় জোরদার করা হয়েছে। শহরজুড়ে মোতায়েন করা হয়েছে ১৫ হাজারের বেশি পুলিশ সদস্য এবং আধা-সামরিক বাহিনীর অন্তত ২০০টি বিশেষ কোম্পানি।
গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোতে বসানো হয়েছে পুলিশি ব্যারিকেড এবং প্রতিটি যানবাহনে চালানো হচ্ছে নিবিড় তল্লাশি। বিভিন্ন সেক্টর ও জোনে পুলিশ ভাগ হয়ে নিরাপত্তার তদারকি করছে, আর সার্বিক পরিস্থিতির ওপর নজর রাখতে ব্যবহৃত হচ্ছে উন্নত প্রযুক্তিগত নজরদারি ব্যবস্থা।
ইন্দিরা গান্ধী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে শান্তি পথ পর্যন্ত যাতায়াতের মূল পথে ৭০০টিরও বেশি সিসিটিভি ক্যামেরা ও পাঁচটি অস্থায়ী নিয়ন্ত্রণ কক্ষ স্থাপন করা হয়েছে।
এর পাশাপাশি তুঘলক রোড থানায় একটি ডেডিকেটেড সিসিটিভি কন্ট্রোল রুম চালু করা হয়েছে, যেখান থেকে প্রায় ৫০০টি সিসিটিভি ক্যামেরার লাইভ ফুটেজ সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। যাতায়াত রুটের ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা ও অতিরিক্ত সুরক্ষায় পথজুড়ে অতিরিক্ত আরও বহু নজরদারি ক্যামেরা যুক্ত করা হয়েছে।
সূত্র: এনডিটিভি



