ব্রিটিশ দাপ্তরিক নথিতে চাটগাঁ: চেন্নাই মিউজিয়াম থেকে ব্রিটিশ এডমিরালটি ও আধুনিক চট্টগ্রাম বন্দরের জন্ম


হাবিব ফারুকী: ইতিহাসের পাঠ্যপুস্তকে ঔপনিবেশিক শাসনের শুষ্ক পরিসংখ্যান পড়া এক জিনিস, আর সেই ইতিহাসের দাপ্তরিক প্রাতিষ্ঠানিক দলিলে চোখ রাখা সম্পূর্ণ ভিন্ন এক রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা। সম্প্রতি দক্ষিণ ভারতের চেন্নাই সরকারি জাদুঘরে (Government Museum, Chennai) কাঁচের ফ্রেমে সংরক্ষিত ১৮৫০-এর দশকের কয়েকটি স্পর্শকাতর প্রাতিষ্ঠানিক শেয়ার সনদের মুখোমুখি হয়েছিলাম।
কাঁচের আড়ালে রাখা ১৮৫৪ সালের ইস্ট ইন্ডিয়ান আয়রন কোম্পানি, ১৮৫৮ সালের ওরিয়েন্টাল ইনল্যান্ড স্টিম কোম্পানি এবং মাদ্রাজ রেলওয়ে-র সনদগুলোকে লন্ডনের ব্রিটিশ লাইব্রেরিতে (British Library) সংরক্ষিত ইন্ডিয়া অফিস রেকর্ডস (India Office Records – IOR) এবং ব্রিটিশ অ্যাডমিরালটির (British Admiralty) প্রাতিষ্ঠানিক নথিপত্রের সাথে মেলালে দেখা যায়—এই প্রাতিষ্ঠানিক দলিলগুলোর ভেতরে লুকিয়ে রয়েছে ১৮৫৭ সালের ঐতিহাসিক বিদ্রোহ, নদীভিত্তিক বাষ্পচালিত বিপ্লব এবং বঙ্গোপসাগরের কোলঘেঁষা চট্টগ্রাম বন্দরকে (Chittagong Port) আধুনিক বিশ্ববাণিজ্যের মানচিত্রে বসানোর রূপরেখা।
১৮৫৪-এর ‘ইস্ট ইন্ডিয়ান আয়রন কোম্পানি’ ও চট্টগ্রাম বন্দরের প্রথম লোহার জেটি (১৮৭৯) তৈরির ইতিহাসে যুক্ত চেন্নাই জাদুঘরে প্রদর্শিত ‘ইস্ট ইন্ডিয়ান আয়রন কোম্পানি’ (East Indian Iron Company)-এর ১৮৫৪ সালের ১৩ সেপ্টেম্বরের শেয়ার সনদটি যা (£১০ মূল্যমানের) ১৮৫৪ সালের ১৮ আগস্টের ব্রিটিশ রাজকীয় সনদ বা ‘রয়েল চার্টার’-এর অধীনে অনুমোদিত ছিল।
ইন্ডিয়া অফিস রেকর্ডস (IOR) প্রমাণ ও ব্রিটিশ লাইব্রেরিতে রক্ষিত IOR/L/F/4 নথিপত্র অনুযায়ী, তামিলনাড়ুর পোর্টো নোভো (বর্তমান পরঙ্গিপেট্টাই)-তে জোসায়াহ মার্শাল হিথের প্রবর্তিত আকরিক লোহা গালানোর কারখানাকে আধুনিক ও বৈশ্বিক রূপ দিতে এই কোম্পানি গঠন করা হয়।
চট্টগ্রাম বন্দরের জেটি অবকাঠামো নির্মাণে ব্রিটিশ পাবলিক ওয়ার্কস ডিপার্টমেন্ট (PWD)-এর নথিতে দেখা যায়, এই সময়ে উত্তোলিত লোহা ও ইস্পাত বোম্বে, মাদ্রাজ ও ক্যালকাটা ছাড়াও চট্টগ্রাম বন্দরের মতো প্রাকৃতিকভাবে সুরক্ষিত পোতাশ্রয়ের নেভিগেশনাল কাজের জন্য সরবরাহ করা হতো। পরবর্তীতে ১৮৭৯ সালে চট্টগ্রাম বন্দরের সদরঘাটে নির্মিত বন্দরের ইতিহাসের প্রথম আয়রন জেটি (Iron Jetty)-র প্রযুক্তিগত ও অর্থনৈতিক বীজ এই পর্বেই বোনা হয়েছিল।
১৮৫৭-এর সিপাহী বিদ্রোহ এবং চট্টগ্রাম চ্যানেলে বাষ্পচালিত স্টিম বিপ্লবের ইতিহাসের স্বাক্ষী, ‘ওরিয়েন্টাল ইনল্যান্ড স্টিম কোম্পানি লিমিটেড’ (Oriental Inland Steam Company Limited)-এর ১৮৫৮ সালের ৭ এপ্রিলের শেয়ার সনদে তৎকালীন নামকরা ব্রিটিশ প্রকৌশলী জন বোর্ন (John Bourne)-এর স্বাক্ষর দৃশ্যমান।
১৮৫৭ সালের চট্টগ্রাম ট্র্যাজেডি ও ব্রিটিশ সামরিক রেকর্ড অনুযায়ী, ১৮৫৭ সালের ১৮ নভেম্বর রাতে চট্টগ্রামে অবস্থানরত ৩৪তম বেঙ্গল নেটিভ ইনফ্যান্ট্রির সিপাহীরা হাবিলদার রজনীংশের নেতৃত্বে সশস্ত্র বিদ্রোহ করেন। তাঁরা তৎকালীন চট্টগ্রাম ট্রেজারি থেকে ২,৭৮,২৬৭ টাকা দখল করে ত্রিপুরার দিকে রওয়ানা হন।
কর্ণফুলী ও মেঘনা নদীতে স্টিমার সার্ভিস চালু না থাকায় চট্টগ্রাম বিদ্রোহ ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে চরম ঝাঁকুনি দেয়। ফলে সমুদ্র ও নদীপথে দ্রুত সেনা ও রসদ পাঠাতে গঙ্গা, মেঘনা, সুরমা ও কর্ণফুলী নদীতে বাষ্পচালিত স্টিমার চালনা ত্বরান্বিত হয়। ‘ওরিয়েন্টাল ইনল্যান্ড স্টিম কোম্পানি’-র তৈরি ‘ফ্ল্যাট-বার্জ’ চালনার মাধ্যমে আসামের চা ও চাটগাঁয়ের তুলা দ্রুত নদীপথে চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছে দেওয়ায় গতি আসে।ব্রিটিশ রাজের সূচনার মাধ্যমে (১৮৫৮) এই জলপথ ও প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ন্ত্রণ সুসংহত করেই ১৮৫৮ সালে ‘গভর্নমেন্ট অব ইন্ডিয়া অ্যাক্ট’ পাশের মাধ্যমে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সমাপ্তি ঘটে । ব্রিটেনের রানি ভিক্টোরিয়ার প্রত্যক্ষ রাজপ্রশাসন বা ‘ব্রিটিশ রাজ’ (British Raj) কায়েম করা হয়।
ব্রিটিশ অ্যাডমিরালটি জরিপে প্রকৌশলী বায়ার্সের সহায়তায় ‘চট্টগ্রাম পোর্ট ট্রাস্ট’ (১৮৮৭) গঠন হয়।
ইউকে হাইড্রোগ্রাফিক অফিস (UK Hydrographic Office – UKHO) এবং ব্রিটিশ পার্লামেন্টারি পেপারসের (British Parliamentary Papers) ১৮৬০ থেকে ১৮৯০-এর দশকের রেকর্ড থেকে চট্টগ্রাম বন্দরের আধুনিকায়নের প্রাতিষ্ঠানিক ধাপগুলো পাওয়া যায়।
রয়্যাল নেভি অ্যাডমিরালটি চার্টস (Admiralty Charts) ১৯ শতকের উত্তরার্ধে ব্রিটিশ রয়্যাল নেভির হাইড্রোগ্রাফিক ডিপার্টমেন্ট বঙ্গোপসাগর উপকূল এবং কর্ণফুলী নদী মোহনার একাধিক অফিশিয়াল মানচিত্র ও ‘নৌ-চার্ট’ প্রকাশ করে। এতে কুতুবদিয়া বাতিঘরের নেভিগেশনাল সংকেত এবং সীতাকুণ্ড ও কুমিরা উপকূলের সেফ অ্যানঙ্করেজ নির্দেশ করে কর্ণফুলীকে একটি চমৎকার “প্রাকৃতিক পোতাশ্রয়” (Natural Harbor) হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।
ব্রিটিশ রেলওয়ে নথি অনুযায়ী, ১৮৮২ সালে প্রকৌশলী জে. ডব্লিউ. বায়ার্স (J. W. Buyers) প্রস্তাব করেন যে উত্তর-পূর্ব ভারতের চা ও পাট দ্রুত ইউরোপে রপ্তানি করতে সরাসরি চট্টগ্রাম বন্দর পর্যন্ত রেললাইন প্রয়োজন। এর ওপর ভিত্তি করেই ১৮৯২ সালে লন্ডনে নিবন্ধিত হয় আসাম-বেঙ্গল রেলওয়ে কোম্পানি (Assam Bengal Railway – ABR), যার সদর দপ্তর চাটগাঁর বিখ্যাত সিআরবি (CRB) এলাকায় স্থাপিত হয়। যুক্তরাজ্যের কার্জন কালেকশনে Photo 430/16-এ ১৯০৪ সালে ভাইসরয় লর্ড কার্জন কর্তৃক এই অবকাঠামোগত চেইন পরিদর্শনের ঐতিহাসিক রেকর্ড সংরক্ষিত রয়েছে ।
এসব অবকাঠামোগত প্রস্তুতির পর ১৮৮৭ সালে পাস হয় ‘Chittagong Port Commissioner’s Act’ এবং ১৮৮৮ সালের ২৫ এপ্রিল আনুষ্ঠানিকভাবে গঠিত হয় ‘Port Commissioners of Chittagong’ (চট্টগ্রাম পোর্ট ট্রাস্ট)। এর মাধ্যমে চট্টগ্রাম বন্দর আন্তর্জাতিক সমুদ্রবন্দরের আইনি ভিত্তি পায়।
দলিলে অতীতের আলো: আধুনিক চট্টগ্রাম বন্দর
আজকের চট্টগ্রাম বন্দর শুধু বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তিই নয়, বরং পুরো দক্ষিণ এশিয়ার প্রধান সামুদ্রিক হাব। বে-টার্মিনাল, আধুনিক কনটেইনার শিপিং কিংবা সুবিশাল কার্গো জাহাজের যে চেনা রূপ আমরা আজ দেখি, তার সুদূরপ্রসারী ঐতিহাসিক সূচনা হয়েছিল ১৯ শতকের সেই প্রাতিষ্ঠানিক পরিকাঠামোর মাধ্যমেই।
চেন্নাই মিউজিয়ামের কাঁচের ফ্রেমে রাখা ১৮৫০-এর দশকের ক্ষয়ে যাওয়া শেয়ার সনদগুলোর পাশাপাশি ব্রিটিশ লাইব্রেরি ও রয়্যাল নেভির এই ঐতিহাসিক নথিপত্র প্রমাণ করে—আজকের স্বনামধন্য চট্টগ্রাম বন্দরের সাফল্যের নেপথ্যে লুকিয়ে আছে ১৮৫০-এর দশকের শিল্পায়ন, সিপাহী বিদ্রোহের দাবানল, রিভারাইন স্টিমার বিপ্লব এবং বঙ্গোপসাগরীয় সামুদ্রিক বাণিজ্যের সুদীর্ঘ ও রোমাঞ্চকর ইতিহাস।


