গ্রিসে যাওয়ার চেষ্টা: ভূমধ্যসাগরে ৯ বাংলাদেশির মৃত্যু


লিবিয়া থেকে গ্রিস যাওয়ার পথে ভূমধ্যসাগরে প্রায় ১১ দিন খাবার ও পর্যাপ্ত পানি ছাড়া ভেসে থাকা একটি নৌকার ৯ বাংলাদেশি ও এক সুদানি নাগরিকের মৃত্যু হয়েছে। বাংলাদেশের প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় আজ সোমবার এ তথ্য নিশ্চিত করেছে।
মিশরের কায়রোতে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাসের প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে মন্ত্রণালয় জানায়, গত ৩ আগস্ট ৩৮ বাংলাদেশি ও চার সুদানি নাগরিককে নিয়ে নৌকাটি লিবিয়া থেকে গ্রিসের উদ্দেশে রওনা হয়। রাবারের তৈরি নৌকাটিতে যথাযথ নেভিগেশন ব্যবস্থা ছিল না। পরে এর জ্বালানি শেষ হয়ে গেলে সেটি ভূমধ্যসাগরে ভাসতে থাকে।
প্রায় ১১ দিন সাগরে ভেসে থাকার পর গত ১৩ আগস্ট সন্ধ্যায় নৌকাটি মিশরের মারসা মাতরুহ উপকূলে পৌঁছায়। স্থানীয় বাসিন্দারা নৌকাটি দেখতে পেয়ে পুলিশকে খবর দিলে উদ্ধার অভিযান শুরু হয়।
দূতাবাসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নৌকাটিতে থাকা ২৯ বাংলাদেশিকে উদ্ধার করা হয়। তাদের মধ্যে গুরুতর অসুস্থ ও আহত ১৮ জনকে মারসা মাতরুহ জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। বাংলাদেশ দূতাবাস তাদের শারীরিক অবস্থার ওপর নজর রাখছে এবং প্রয়োজনীয় কনস্যুলার সহায়তা দেওয়ার চেষ্টা করছে।
বেঁচে যাওয়া বাংলাদেশি আবদুল করিমের বক্তব্যের বরাত দিয়ে দূতাবাস জানায়, প্রচণ্ড গরম, খাবার ও পানির সংকটে নয়জন বাংলাদেশি ও একজন সুদানি নাগরিক মারা যান। পরে মরদেহগুলো পচন ধরতে শুরু করলে সেগুলো সাগরে ফেলে দেওয়া হয়।
সুনামগঞ্জের শান্তিগঞ্জ উপজেলার বাসিন্দা আবদুল করিম সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া এক ভিডিওতে জানান, নৌকাটিতে মোট ৪২ জন ছিলেন। তাদের মধ্যে ৩৮ জন বাংলাদেশি। গ্রিসের কাছাকাছি পৌঁছানোর পর নৌকার ইঞ্জিন বিকল হয়ে যায়। এরপর আর সামনে এগোতে পারেননি তারা।
দীর্ঘ সময় নোনা পানির মধ্যে থাকার কারণে বেঁচে থাকা যাত্রীদের শারীরিক অবস্থাও ভয়াবহ হয়ে ওঠে। করিম জানান, দীর্ঘ সময় লবণাক্ত পানিতে থাকার ফলে তাদের শরীরের বিভিন্ন অংশে পচন ধরে এবং দুর্গন্ধ ছড়াতে শুরু করে।
তিনি আরও জানান, নৌকাটিতে সর্বোচ্চ ২৫ জন যাত্রী বহনের সক্ষমতা থাকলেও ৪২ জনকে তোলা হয়েছিল। নৌকাটিতে ছিল মাত্র একটি ইঞ্জিন।
কায়রোতে বাংলাদেশ দূতাবাসের শ্রম কাউন্সেলর (প্রথম সচিব) মো. জাকির হোসেন জানান, দূতাবাসের কর্মকর্তারা স্থানীয় পুলিশ ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন। পরে তারা হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে আবদুল করিমের সঙ্গেও কথা বলেন।
তিনি জানান, স্থানীয় পুলিশ ও বাসিন্দাদের সহায়তায় উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের দুটি হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে। অনেকেই তখন অচেতন অবস্থায় ছিলেন। বর্তমানে তারা পুলিশি তত্ত্বাবধানে চিকিৎসাধীন।
দূতাবাসের পক্ষ থেকে জীবিতদের সঙ্গে কনস্যুলার যোগাযোগের অনুমতি চাওয়া হয়েছে। অনুমতি পাওয়া গেলে তাদের বিষয়ে আরও বিস্তারিত তথ্য জানা যাবে বলে জানিয়েছেন জাকির হোসেন।
এদিকে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে লিবিয়া থেকে গ্রিসে পৌঁছানো নাগরিকদের মধ্যে বাংলাদেশিরাই সবচেয়ে বেশি বলে জানিয়েছে ইউরোপীয় সীমান্ত ও উপকূলরক্ষী সংস্থা ফ্রন্টেক্সের তথ্য। ব্র্যাকের উদ্ধৃত তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত অন্তত ৩ হাজার ৬০৮ বাংলাদেশি লিবিয়া থেকে সমুদ্রপথে গ্রিসে পৌঁছেছেন। তালিকায় পরের অবস্থানে রয়েছে সুদান ও আফগানিস্তান।
লিবিয়া থেকে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপে প্রবেশের এই পথটি ‘সেন্ট্রাল মেডিটেরেনিয়ান রুট’ নামে পরিচিত। ব্র্যাকের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৯ সাল থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত এই পথে প্রায় ১ লাখ ১০ হাজার বাংলাদেশি ইউরোপে প্রবেশ করেছেন।
২০২৫ সালে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ২০ হাজার ২৫৯ বাংলাদেশি ইউরোপে প্রবেশ করেন। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে ৪ হাজার ২৪৯ বাংলাদেশি ইতালিতে এবং ৩ হাজার ৬০৮ বাংলাদেশি লিবিয়া থেকে সমুদ্রপথে গ্রিসে পৌঁছেছেন।
এর আগে গত মার্চেও লিবিয়া থেকে গ্রিস যাওয়ার পথে ভয়াবহ নৌকাডুবি ও দুর্ঘটনায় অন্তত ১৮ বাংলাদেশির মৃত্যু হয়েছিল। তাদের মধ্যে ১২ জনই ছিলেন সুনামগঞ্জের বাসিন্দা। ব্র্যাকের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত ২১ মার্চ লিবিয়ার তবরুক থেকে রওনা দেওয়া ওই নৌকাটি পথ হারিয়ে প্রায় ছয় দিন খাবার ও পানি ছাড়া সাগরে ভেসে ছিল। পরে পাচারকারীদের নির্দেশে নিহতদের মরদেহ সাগরে ফেলে দেওয়া হয়।
পরপর এমন ঘটনায় লিবিয়া থেকে ইউরোপে যাওয়ার ঝুঁকিপূর্ণ সমুদ্রপথে বাংলাদেশি অভিবাসনপ্রত্যাশীদের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।



