উত্তরার বসে মানুষ বেচাকেনার হাঁট !


মনির হোসেন জীবন : কাক ডাকা ভোরের আলো তখনো পুরোপুরি ছড়িয়ে পড়েনি। ঘড়ির কাঁটায় সকাল সাড়ে ৬টা বাজতেই রাজধানীর অভিজাত ও ব্যস্ততম এলাকা উত্তরার আজমপুর বাসস্ট্যান্ডের মোড়ে একে একে জড়ো হতে থাকেন প্রায় শতাধিক নারী- পুরুষ মানুষ। কারও হাতে কোঁদাল, কারও হাতে বেলচা, কেউ আবার খালি হাতেই দাঁড়িয়ে আছেন রাস্তার পাশে।
তাদের সবার লক্ষ্য একটাই—আজকের দিনের জন্য একটি কাজ জোটানো। তবে এটি কোনো পশুর হাঁট নয়, নয় কোনো পণ্যের বাজারও। এটি শ্রমের হাঁট, মানুষ বেচাকেনার হাঁট। এখানে প্রতিদিন নিজেদের শ্রম বিক্রি করতে আসেন নির্মাণ শ্রমিক, মাটি কাটার শ্রমিক, রাজ মিস্ত্রির, রং মিস্ত্রি, কৃষি শ্রমিকসহ বিভিন্ন পেশার দিন মজুররা। সকাল সাড়ে ৬টা থেকে শুরু হয়ে চলে প্রায় সকাল সাড়ে ১০টা পর্যন্ত। এই সময়ের মধ্যেই ঠিকাদার, বাড়ির মালিক কিংবা বিভিন্ন কাজের জন্য শ্রমিক প্রয়োজন, এমন ব্যক্তিরা এসে দরদাম করে শ্রমিক নিয়ে যান। স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষায় এটি ভাড়াটে ‘শ্রমিকের হাঁট’, মানুষ কেনাবেচার হাঁট। একই চিত্র দেখা যায় উত্তরার আব্দুল্লাহপুর, কামার পাড়া, বিমানবন্দর ও টঙ্গী রেলস্টেশন মোড়েও। ভোর থেকে সেখানে কাজের আশায় অপেক্ষা করেন অসংখ্য দিনমজুর নারী- পুরুষ। কাজ মিললে দিন ভালো কাটে, আর কাজ না পেলে খালি হাতেই মুখ কালো করে বাড়ি ফিরতে হয় তাদের। খবর সংশ্লিষ্ট একাধিক তথ্য সূত্রের।
আজ শনিবার সকালে উত্তরার আজিমপুর বাসস্ট্যান্ডে মানুষ বেচাকেনার হাঁটে সরেজমিনে ঘুরে দেখা যায়, এসব শ্রমিকদের কারও বয়স ২০ ও ২৫। কারও আবার ৩৫-৫৫ ছুঁইছুঁই। বয়স বাড়লেও থেমে নেই কাজের গতি ও সংগ্রাম। পরিবারের ভরণপোষণ, সন্তানের লেখাপড়া কিংবা চিকিৎসার খরচ মেটাতে প্রতিদিনই তাদের দাঁড়াতে হয় এই হাঁটে। এই ধরনের শ্রমিকের হাট দেশের অনানুষ্ঠানিক শ্রমবাজারের একটি বাস্তব চিত্র। যেখানে প্রতিদিন হাজারো মানুষ কোনো স্থায়ী চাকরি বা সামাজিক নিরাপত্তা ছাড়া শুধু একটি দিনের কাজের আশায় অপেক্ষা করেন। সূর্য যখন একটু ওপরে ওঠে, তখন হাঁটটিও ফাঁকা হতে শুরু করে। কেউ কাজ পেয়ে চলে যান নির্মাণস্থলে, কেউ যান কৃষিজমিতে, কেউ আবার মাটি কাটার কাজে। আর যাদের ভাগ্যে কাজ জোটে না, তারা ফিরে যান বাড়ির পথে পরদিন আবার ভোরে একই জায়গায় দাঁড়ানোর প্রত্যাশা নিয়ে।
পঞ্চগড় এলাকার নির্মাণ শ্রমিক বর্তমানে টঙ্গীতে বসবাসরত মো. বাবুল মিয়া এ প্রতিবেদককে বলেন, প্রতিদিন সকালে এখানে আসি। ভাগ্য ভালো থাকলে কাজ পাই, না হলে দুপুরের আগেই বাড়ি ফিরতে হয়। এখন সাধারণ শ্রমিকের মজুরি ৫৫০ থেকে ৬০০ টাকার মধ্যে। ভারী কাজের মজুরি ৮০০শ থেকে ১ হাজার টাকা। নারী শ্রমিকের মজুরি ৪০০শ থেকে ৪৫০ টাকা। তবে সব দিন সমান কাজ থাকে না।
উত্তরার আজমপুরে একাধিক শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বর্ষা মৌসুমে নির্মাণকাজ কমে গেলে আয়ও কমে যায়। আবার ধান কাটা কিংবা বোরো মৌসুমে কৃষিশ্রমিকের চাহিদা বাড়লে অনেকের কাজের সুযোগও বাড়ে। তবে বছরের অধিকাংশ সময়ই কাজের অনিশ্চয়তা তাদের নিত্যসঙ্গী। কাজ না পেলে সংসারে সংকট নেমে আসার কথা জানান শ্রমিকদের অনেকেই। তারা জানান, দৈনিক আয়ের ওপর নির্ভরশীল তারা। এক দিন কাজ না হলে সেদিনের বাজারও অনিশ্চিত হয়ে পড়তে হয়।
মো: আবদুল কুদ্দুস ও সোহেল রানা নামে দু’জন শ্রমিক এ প্রতিবেদককে বলেন, আমাদের কোনো মাসিক বেতন নেই, ভাতাও নেই । আজ কাজ করলে আজ খাওয়া হবে। কাজ না থাকলে ধার করে সংসার চালাতে হয়। দিন আনি, দিন খাই। হাটি হাঁটি খাই খাই, সময় পেলে গান গাই। শাহজাহান সাজু ও কিশোর কনক বলেন, সকালে সবাই সারিসারি দাঁড়িয়ে থাকি। যার ভাগ্যে কাজ জোটে সে চলে যায়। যারা থেকে যায়, তাদের মনটা খারাপ হয়ে যায়।
প্রতিদিন বিভিন্ন এলাকা থেকে ঠিকাদার, বাড়ির মালিক কিংবা ব্যবসায়ীরা শ্রমিক নিতে আসেন। কাজের ধরন অনুযায়ী মজুরি নির্ধারণ করা হয়। দক্ষ শ্রমিকদের মজুরি তুলনামূলক বেশি হলেও সাধারণ শ্রমিকদের ক্ষেত্রে ৫৫০ থেকে ৬০০ টাকার মধ্যেই দরদাম শেষ হয়। তবে কোন কোন ক্ষেত্রে একটু বেশি।
শ্রমিক নিতে আসা তুরাগের চন্ডাল ভোগ এলাকার বাসিন্দা মো. ইসমাইল হোসেন এ প্রতিবেদককে বলেন, বাড়ির নির্মাণকাজের জন্য মাঝেমধ্যে এখান থেকে শ্রমিক নিয়ে যাই। এখানে একসঙ্গে অনেক শ্রমিক পাওয়া যায়, তাই সময়ও বাঁচে। তবে আগের চেয়ে দিন মজুরের চাহিদা ও কাজের দরদাম বেড়েছে। পুরুষ শ্রমিকের তুলনায় নারী শ্রমিকের দৈনিক হাজিরা কম।
স্থানীয় ঠিকাদার শাহীনুর মিয়া ও রতন শেখ এ প্রতিবেদককে বলেন, ভালো ও অভিজ্ঞ শ্রমিক পেতে হলে একটু বেশি মজুরি দিতে হয়। তবে কাজের বাজার আগের তুলনায় কিছুটা মন্দ। উত্তরার হাঁটে আগের চেয়ে দিন মজুর শ্রমিকের সংখ্যা তুলনামূলক বেড়েছে।



