জাতীয়

জুলাইযোদ্ধারা ক্ষমতার পরিবর্তন নয়, সিস্টেমের পরিবর্তন চেয়েছে

জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, জুলাইযোদ্ধারা ক্ষমতার পরিবর্তন নয়, সিস্টেমেরে পরিবর্তন চেয়েছে। জুলাইয়ের চেতনাই ছিল রাষ্ট্র কাঠামোর সংস্কারের মাধ্যমে বৈষম্যহীন, ন্যায়বিচারের বাংলাদেশ। সেই চেতনায় জামায়াতে ইসলামী পূর্ণ সমর্থন জানিয়ে জুলাইয়ের শুরু থেকে আজ পর্যন্ত আপসহীন ভূমিকা রেখে আসছে।

বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই) রাজধানীর ইনস্টিটিউশন অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্সের কাউন্সিল হলরুমে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ঢাকা মহানগরী উত্তর ও দক্ষিণের যৌথ উদ্যোগে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহীদ পরিবার ও আহত জুলাইযোদ্ধাদের সাথে মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

ডা. শফিকুর রহমান বলেন, জুলাই চেতনা থেকে সরে আসতে আপসের যত প্রস্তাব এসেছে, জামায়াতে ইসলামী তা ঘৃণার সঙ্গে প্রত্যাখ্যান করেছে। আমরা বলেছি, বরাবরই জবাব দিয়েছি- আপনারা গণভোটের পক্ষে কথা বলে আজ অস্বীকার করছেন, আমরা গণভোটের পক্ষে কথা বলে আজও স্বীকার করছি, আগামীতেও করবো। আমরা রাষ্ট্র সংস্কারের দাবি থেকে একচুলও পিছিয়ে যাবো না।

তিনি আরও বলেন, সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ নিয়ে গণভোটের রায় বাস্তবায়ন করার এখনো সময় আছে। ভুল সবার হতে পারে, ব্যক্তি, দল ও সরকারও ভুল করতে পারে। ভুলের উপর অটুট থাকা যাবে না। সরকার গণভোটের রায় মেনে সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ না নিয়ে যে ভুল করেছে, সেই ভুল থেকে বেরিয়ে আসার আহ্বান জানান।

জামায়াত আমির বলেন, জুলাই বিপ্লব পরবর্তী নতুন বাংলাদেশে সর্বত্র নির্লজ্জভাবে দলীয়করণ চলছে। রাষ্ট্রীয় ও সাংবিধানিক সকল প্রতিষ্ঠানে সরকার দলীয় লোকজন নিয়োগ দিয়ে দলীয় প্রতিষ্ঠানে রূপ দিয়েছে। এ সরকার পতিত ফ্যাসিবাদী সরকারের পথে হাঁটলে একই পরিণতি ভোগ করতে হবে।

জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক এমপি মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, শহীদের রক্ত কখনো বৃথা যায় না। যেদেশে জালিম শাসক, ফ্যাসিস্ট সরকারের বিরুদ্ধে শিশুরা পর্যন্ত জীবন উৎস্বর্গ করে দেয়, সেই দেশে শহীদদের রক্ত বৃথা যাবে না। শহীদের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে জামায়াতে ইসলামী আপসহীন ভূমিকা অব্যাহত রাখবে।

শহীদ জাবির ইব্রাহিমের মা রোকেয়া বেগম এমপি বলেন, আমি যখন শহীদ পরিবারের পক্ষে সংসদে গণহত্যার বিচারের দাবি তুলেছি এবং ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউরকে স্মারকলিপি দিয়েছি, তখন তারা আমার বক্তব্য শুনেছেন এবং এক বছরের মধ্যে বিচার সম্পন্ন করার আশ্বাস দিয়েছেন। ট্রাইব্যুনালে লোকবল এবং বেঞ্চের অভাবে বিচার ধীরগতিতে চলছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, গণহত্যার বিচার দ্রুত নিষ্পত্তি করতে ট্রাইব্যুনালে বেঞ্চ ও জনবল বাড়াতে হবে।

রাষ্ট্রচিন্তক মিসেস দিলারা চৌধুরী বলেন, বিএনপি যদি জুলাই চেতনা ধারণ করতে পারে, তবে বিএনপি বাংলাদেশের রাজনীতিতে স্থায়ী প্রতিষ্ঠা লাভ করতে পারবে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আপামর জনতার অংশগ্রহণে এক সফল বিপ্লব অর্জিত হয়েছে। এই বিপ্লব কোনো দলের অর্জন নয়। জাতি অন্যায়ের বিরুদ্ধে জেহাদ করে জুলাই বিপ্লব অর্জন করেছে। দেশকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করতে হলে প্রথম পদক্ষেপ নিতে হবে জুলাইকে ধারণ করার। সরকার ও বিরোধীদলকে জুলাইকে ধারণ করে দেশকে এগিয়ে নেয়ার আহ্বান জানান তিনি।

বাংলাদেশ জুলাইযোদ্ধা সংসদের সভাপতি আহত জুলাইযোদ্ধা নেছার উদ্দিন নাঈম বলেন, গুলির যন্ত্রণা আর ব্যথার চেয়ে বেশি ব্যথা লাগে যখন সরকারের দায়িত্বশীল পর্যায় থেকে বলে, নির্বাচনের জন্য সংস্কারের পক্ষে বিএনপি মত দিয়েছে, কথা বলেছে। তিনি আরও বলেন, আমরা চাই সরকার সুন্দরভাবে দেশ পরিচালনা করুক। কিন্তু সরকার যদি গণহত্যার বিচার ও রাষ্ট্র সংস্কার না করে, তবে যেখান থেকে দেশে এসেছেন আবারও সেখানে চলে যেতে হতে পারে।

দুই চোখ হারানো জুলাইযোদ্ধা মো. রাকিব বলেন, আমরা বৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়াই করলেও আমরা নিজেরাই বৈষম্যের শিকার হয়েছি। চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে গেলে চিকিৎসা না দিয়ে আমাদের এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে পাঠানো হয়।

সভাপতির বক্তব্যে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের আমির মো. নূরুল ইসলাম বুলবুল এমপি বলেন, জুলাই শহীদ ও আহতদের রাষ্ট্রীয় খেতাবে ভূষিত করতে হবে। জুলাই মুছে দিতে যেই ষড়যন্ত্র চলছে, সেই ষড়যন্ত্র বন্ধে রাষ্ট্রকে জুলাইয়ে সঠিক ইতিহাস লিখতে ও সংরক্ষণ করতে হবে। গণভোটের রায় মেনে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের মাধ্যমে জুলাইয়ের আকাঙ্ক্ষাকে বাস্তবে রূপ দিতে তিনি সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, জুলাই সনদ বাস্তবায়নে বিরোধীদল হিসেবে জামায়াতে ইসলামী সরকারকে সবধরনের সহযোগিতা করতে প্রস্তুত রয়েছে।

কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের সহকারী সেক্রেটারি দেলাওয়ার হোসেন এবং কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরী উত্তরের সহকারী সেক্রেটারি ডা. ফখরুদ্দিন মানিকের যৌথ পরিচালনায় সভায় আরও বক্তব্য রাখেন– জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক এমপি ড. এএইচএম হামিদুর রহমান আযাদ, কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরী উত্তরের আমির মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন, কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের সেক্রেটারি ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ এমপি, বীর মুক্তিযোদ্ধা মেজর (অব.) আখতারুজ্জামান, সাবেক সচিব মাহবুবুল হক, সাবেক রাষ্ট্রদূত সাকিব আলী,ব্যারিস্টার শাহরিয়ার কবির।

সভায় আরও বক্তব্য রাখেন– শহীদ মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধের বাবা মীর মোস্তাফিজুর রহমান, শহীদ পারভেজ মিয়ার মা কানিজ ফাতেমা, শহীদ ফারহান ফাইয়াজের বাবা শহিদুল ইসলাম, শহীদ সৈয়দ মুনতাসির রহমান আলিফের বাবা সৈয়দ গাজী উর রহমান, শহীদ শেখ মেহেদী হাসান জুনায়েদের বাবা শেখ জামাল হাসান, শহীদ মেহেরুন্নেসার বাবা মো. মোশাররফ হোসেন, শহীদ আব্দুল হান্নানের ছেলে ডা. সাইফ আহমেদ, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি মো. শহিদুল ইসলাম, ড. ফয়জুল হক, জুলাইযোদ্ধা আল নুর মোহাম্মদ আয়াশ ও মাসুম বিল্লাহ, শহীদ শাহরিয়ার খান আনাসের নানা সাইদুর রহমান খান প্রমুখ

এই বিভাগের আরও সংবাদ