ক্যাম্পাস

নোবিপ্রবি শিক্ষার্থীদের শৈশবের ঈদের স্মৃতি

হিমেল রানা, নোবিপ্রবি প্রতিনিধি:“পালা করে হাতছানিতে শৈশব আমায় আজও ডাকে।
সবুজ শাড়ির নীল আঁচলে তখন আমি ক্লান্তির ঘাম মুছি।
দু’চোখে কাপড় বেঁধে শৈশব তখন ফিরে আসে কানামাছির ছলে।”

শৈশব মানেই যেনো স্বপ্নিল একটা পৃথিবী, ছোট ছোট ইচ্ছা গুলোতে থাকে অফুরন্ত প্রশান্তি। অবুঝ আবদার গুলো মনে হয় রাজার জারি করা আইন। জীবনে থাকেনা কোন জটিল হিসাব। প্রকৃতির নিয়মেই ছেয়ে থাকা শৈশবে সবার জীবনে থাকে আনন্দে ঘেরা মহুর্তে ভরপুর। তাইতো প্রতিটি উৎসবে সবার চোখে ভেসে উঠে সোনালি সেই শৈশব।

পবিত্র ঈদ মুসলমানদের বড় উৎসব, ঈদের প্রতিটি মানুষের চোখে অনন্দময় সেই শৈশবের স্মৃতি ভেসে উঠে। শত ব্যস্ততা, পড়াশোনা, গবেষণার চাপ মাড়িয়ে নোবিপ্রবিয়ানরাও এর ব্যতিক্রম নয়।

ঈদকে সামনে রেখে নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষার্থীরা তাদের শৈশবের ঈদের স্মৃতি রোমন্থন করেছেন।

বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থ বিজ্ঞানের শিক্ষার্থী মাইশা মালিহা জানান, “শৈশবের ঈদ, শব্দটা শুনলেই যেন মনে পড়ে যায় রঙিন স্মৃতি। তখন ঈদ মানেই ছিল একরাশ আনন্দ, শুধু ঈদের অপেক্ষা আর উত্তেজনা।
চাঁদ দেখার দিনটা ছিল সবচেয়ে মজার। সবাই ছাদে উঠে আকাশে চাঁদ খুঁজতাম, আর কেউ আগে দেখে ফেললে চিৎকার করে উঠত- “চাঁদ দেখা গেছে!” সেই মুহূর্তে মনে হতো, আনন্দটা যেন হঠাৎ করে শুরু হয়ে গেল।

ঈদের আগের রাত মানেই নতুন জামা বারবার বের করে দেখা। কখন সকাল হবে, কখন সেই জামা পরে সবাইকে দেখাবো- এই ভাবনায় ঘুমই আসত না ঠিকমতো।

ঈদের সকালটা হতো একেবারে আলাদা। ভোরে উঠে গোসল করে নতুন জামা খুশির মেলা। নামাজ শেষে করে এসে যখন সবাই “ঈদি” দিতো, পাওয়ার যে আনন্দ- সেটা ছিল যেন ঈদের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ।
মায়ের রান্না করা সেমাই, পায়েস, আর নানা রকম মজার খাবার খাওয়া-তার স্বাদ এখনো মনে লেগে আছে। তারপর সারাদিন বন্ধুদের সাথে ঘুরাঘুরি, বাড়ি বাড়ি যাওয়া, হাসি-আড্ডা- সব মিলিয়ে এক অন্যরকম আনন্দ।
এখন বড় হয়ে বুঝি, সেই শৈশবের ঈদে সবচেয়ে সুন্দর ছিল সরলতা। ছোট ছোট জিনিসেই এত আনন্দ পাওয়া-এটাই ছিল আসল সুখ”

অনুভূতি ব্যক্ত করতে গিয়ে ফলিত গণিত বিভাগে শিক্ষার্থী মোশাররফ হোসেন নাহিদ বলেন, “ঈদ আসলে শুরু হতো শেষ রমজানের সেই অপেক্ষা থেকে
২৯ না ৩০, চাঁদ উঠবে কি উঠবে না-

এই নিয়েই চলত বাড়ি জুড়ে কত না গল্প, কত না আলোচনার ঢেউ। তারপর হঠাৎই একসময় ভেসে আসত খবর-চাঁদ দেখা গেছে, মুহূর্তেই যেন আনন্দ ছড়িয়ে পড়ত আমাদের বড় বাড়ির প্রতিটি কোণে।

ঈদের সকালটা ছিল একদম আলাদা। বাড়ির দরজার পুকুরে সবাই মিলে গোসল, আমরা ছেলেরা একসাথে গাছ থেকে পানিতে লাফ দিতাম, হাসি আর জলছাপ মিলে তৈরি হতো এক টুকরো উচ্ছ্বাসের ছবি। তারপর নতুন জামা পরে ছুটে যেতাম দাদা-দাদীর কাছে, সালামির সেই ছোট্ট খাম যেন ছিল সবচেয়ে বড় আনন্দ।
বাবার সাথে ঈদের নামাজে যাওয়া, আর নামাজ শেষে সেই ভিড়ের মাঝেও কত খেলনা যে কিনে আনতাম- তার কোনো হিসেব নেই।

বিকেলে আবার ঘুরতে যাওয়া, দিনভর আনন্দে ভরা ছোট ছোট মুহূর্তগুলোমিলে গড়ে তুলত এক অসাধারণ ঈদের গল্প।সব মিলিয়ে তখনকার ঈদ ছিল এক অন্যরকম অনুভূতি- সরল, উচ্ছ্বসিত, আর ভালোবাসায় ভরা- যা আজও মনে পড়লে শৈশবটা ফিরে আসে এক টুকরো মিষ্টি স্বপ্ন হয়ে।”

এগ্রিকালচার বিভাগের শিক্ষার্থী সোহাগ হোসাইন বলেন, “আমার শৈশবের ঈদ ছিল আনন্দে ভরা এক অনন্য স্মৃতি। ঈদের আগের দিন আমরা সবাই মিলে আকাশে চাঁদ দেখার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতাম। চাঁদ দেখা মাত্রই চারদিকে খুশির আমেজ ছড়িয়ে পড়ত। সেই রাতেই বোনদের সাথে মেহেদী দেওয়া, হাসি-আনন্দ আর গল্পে ভরে উঠত সময়টা।ঈদের দিন সকালে নতুন জামা পরে নামাজে যেতাম।নামাজ শেষে বন্ধু ও ভাই-বোনদের সাথে কোলাকুলি করে আনন্দ ভাগাভাগি করতাম। তারপর শুরু হতো বাড়ি বাড়ি ঘোরা, সেমাই-পায়েস খাওয়া আর সালামি নেওয়ার আনন্দ। বিকেলে মাঠে খেলাধুলা করে দিনটা আরও উপভোগ করতাম। সব মিলিয়ে, শৈশবের সেই ঈদগুলো আজও আমার মনে সবচেয়ে সুন্দর আর মধুর স্মৃতি হয়ে রয়েছে”

শৈশবে ফিরে যাওয়ার অনুভূতি ব্যক্ত করে বাংলা বিভাগের ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী মিল্লাত হাসান বলেন, “ঈদের আগের মানে চাঁদ রাতে মেয়েরা যখন হাতে মেহেদি দিতে ব্যস্ত তখন আমি আর আমার বন্ধুরা মিলে দূরের কোনো মাঠে খোলা আকাশের নিচে পিকনিক করতাম। ঈদের দিন সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠেই গোসল করে নামাজের জন্য তৈরি হয়ে চাচাতো ভাইয়েরা সহ মাঠে গিয়ে নামাজ আদায় করা। আর নামাজ শেষে ছোট বড় সবার সাথে কোলাকুলি– এ এক যেন অন্যরকম অনুভূতি ছিলো। আমবাগানের চরকি গুলোতে বিকেলে আমি আর আমার বন্ধুরা মিলে গিয়ে সন্ধ্যায় বাসায় ফেরা। বার ত্রিশ এক তো উঠাই হতো। বলা যায়, যা সালামি পেতাম তার বেশির ভাগেই এখানে খরচ হত। বাড়ি ফেরার পথে হাতে একটা স্পিডের বোতল নিলে নিজেকে মনে হত বাংলার কোন এক নায়ক। ঈদের পরের দুই দিন একটু ব্যাস্ততায় কাটতো, না মানে আত্মীয় স্বজনদের বাসায় গিয়ে সালামির বোঝাপড়া করে আসতাম। এর পর হয়তো বন্ধুদের সাথে দূরে কোথাও ঘুরতে যেতাম। সব মিলিয়ে ছোটবেলার ঈদ ছিল আনন্দে ভরপুর। ইশ যদি আবার ফিরে যাওয়া যেত!”

বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষার্থী মোস্তাইন বিল্লাহ বলেন, “ঈদের সকালটা ছিল একেবারেই আলাদা এক আনন্দে ভরা। বড় বাড়ি হওয়ার কারণে আমাদের সমবয়সী অনেকেই ছিলাম, সবাই মিলে একসাথে গোসল করতে যেতাম এবং দল বেঁধে ঈদগাহে নামাজ পড়তে যেতাম। নামাজ শেষে কে কত সালামি পেল, তা নিয়ে চলত মজার খুনসুটি। সেই সালামির টাকা দিয়েই কিনতাম খেলনা পিস্তল, ছোট গাড়ি আর নানা রকম জিনিস। শৈশবের সেই আনন্দগুলো আজও মনে গভীরভাবে গেঁথে আছে।”

শত ব্যাস্ততা মাঝে, জীবনের সব জটিল হিসাব দূরে রেখে, সবার জীবনে ঈদ হয়ে উঠুক শৈশবের মত অনন্দ ও উৎসবের।

এই বিভাগের আরও সংবাদ