পঞ্চগড়-২ : আসন জয়-পরাজয় নির্ভর করছে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের ভোট


মাহমুদ দোলন, পঞ্চগড় প্রতিনিধি: রাত পেরোলেই আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। এই ভোটযুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় পঞ্চগড়-২ আসনের বিএনপি মনোনীত প্রার্থী কেন্দ্রীয় নেতা ফরহাদ হোসেন আজাদ। জামায়াত মনোনীত প্রার্থী সাবেক বোদা উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান সফিউল আলম (সফিউল্লাহ সুফি)। এবং বাংলাদেশ জাসদের মনোনীত প্রার্থী অধ্যাপক এমরান আল আমিনের সক্রিয় প্রচারণায় নির্বাচনী মাঠে প্রতিদ্বন্দ্বিতা আরও জোরালো হয়েছে। ফলে পুরো আসনজুড়েই প্রতিযোগিতামূলক একটি পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। তবে এই আসনে ভোটের মূল লড়াই হবে বিএনপি ও জামায়াতের প্রার্থীর মধ্যে।
বোদা ও দেবীগঞ্জ উপজেলা নিয়ে পঞ্চগড় ২ আসনটি গঠিত। ২০০৮ সাল থেকে আওয়ামী লীগের দখলে থাকা আসনটি এবার পুনরুদ্ধার করতে তৎপর বিএনপি।
গত রবিবার (৮ ফেব্রুয়ারি) নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করতে দেবীগঞ্জ ও বোদায় জনসভা করেছে দলটি। এতে উপস্থিত ছিলেন দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। নির্বাচনের ঠিক আগমুহূর্তে মহাসচিবের উপস্থিতি দলীয় নেতা কর্মীদের মধ্যে নতুন উদ্দীপনা তৈরি করেছে। জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে দলীয় ইশতেহারের বিভিন্ন দিক তুলে ধরা ছাড়াও মির্জা ফখরুল বলেন, আজাদকে নির্বাচিত করতে পারলে তাকে মন্ত্রীসভায় অন্তর্ভুক্ত করা হবে। প্রচারণার শেষ দিন সোমবার রাতেও দলটির নেতা কর্মীদের চার শতাধিক ভ্যানে করে জোর প্রচারণা চালাতে দেখা যায়।
অপর দিকে শুরু থেকেই আসনটিতে নিজেদের শক্ত অবস্থান ধরে রাখতে জয়ের জন্য কৌশলী কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে জামায়াত। নির্বাচনে জাতীয় পার্টি অংশগ্রহণ করলেও প্রার্থীর তেমন তৎপরতা নেই। এদিকে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর থেকে আওয়ামী লীগ ও তার অঙ্গসংগঠনের কোনো নেতাকে এলাকায় দেখা যাচ্ছে না। এই আসনটিতে ১৯৯১ সালে বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টির হয়ে মোজাহার হোসেন নির্বাচিত হন। এরপর ১৯৯৬ ও ২০০১ সালে তিনি বিএনপি মনোনীত প্রার্থী হয়ে এই আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। তবে ২০০৮ সালে এ আসনে জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাবেক রেলপথমন্ত্রী নূরুল ইসলাম সুজন সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। এরপর দিনের ভোট রাতে করে হলেও আসনটি আওয়ামী লীগ আর হাতছাড়া করেনি।
সাবেক এমপি মোজাহার হোসেনের ছেলে মাহমুদ হোসেন সুমন স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এ আসনে মোজাহারকে এখনো ভালোবাসেন এমন অনেক ভোটার রয়েছেন, যারা সুমনকে ভোট দেবেন বলে মনে করা হচ্ছে।
তবে দেবীগঞ্জের সোনাহার ইউনিয়নের সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান ও উপজেলা বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক রহিমুল ইসলাম বুলবুল নির্বাচন থেকে সরে আসায় তার পক্ষের ভোটগুলো এখন আজাদ পাবেন। এমনটাই মনে করছেন আজদ সমর্থকরা।
জামায়াত প্রার্থী সফিউল আলম যিনি সফিউল্লাহ সুফি নামে পরিচিত, তিনি সব শ্রেণী-পেশার মানুষের কাছে একজন জনপ্রিয় ব্যক্তি। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী কামরুল হাসান প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার কারণে তার ১০থেকে ১৫হাজার ভোট কমে যেতে পারে বলে জানা গেছে। যদিও জামায়াতের নীতি নির্ধারকগণ বিষয়টি নিয়ে সেভাবে ভাবছেন না। তাদের দাবি, নির্দিষ্ট ভোট ব্যাংক ছাড়াও সাধারণ মানুষ তাদের স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে গ্রহণ করেছেন।
এদিকে সোমবার (৯ ফেব্রুয়ারী) প্রচারণার শেষ দিনে জামায়াত বোদা ও দেবীগঞ্জে নারী কর্মীদের নিয়ে যে মিছিলের আয়োজন করেছিল তা সাধারণ ভোটারদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলে। শুধু দেবীগঞ্জে ১৫ হাজারের বেশি নারী অংশ নেন। অনেক নারী তাদের শিশু সন্তানদের নিয়ে অংশ নেন। একই দিনে বিকেলে দেবদারু তলায় জনসভা শেষে সন্ধ্যায় জামায়াত মিছিল বের করে। এতে প্রায় ৪০ হাজার কর্মী সমর্থক অংশ নেন। জনসভায় কোন কেন্দ্রীয় নেতার উপস্থিতি না থাকলেও এত বিশাল জমায়েত সাধারণ ভোটারদের মধ্যে প্রভাব ফেলেছে। জনসভায় জামায়াত প্রার্থী সুফী ঘোষণা দেন, তিনি নির্বাচিত হলে সরকারি যে সুযোগ সুবিধা পাবেন তা সাধারণ মানুষের জন্য ব্যয় করবেন। শুল্কমুক্ত গাড়ি সহ সরকারি কোন প্লট বরাদ্দ নিবেন না।
বাংলাদেশ জাসদের প্রার্থী অধ্যাপক এমরান আল আমিন তার পক্ষে ভোট বাড়ানোর জন্য ব্যক্তিগত ইমেজকে কাজে লাগানোসহ নেতাকর্মীদের নিয়ে কৌশলগত কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন।
এই আসনটিতে ১ লাখ ৩০ হাজারের মতো সনাতন ধর্মাবলম্বী (হিন্দু) ভোটার রয়েছেন। বিশেষ করে বোদা উপজেলার পাঁচপীর ও দেবীগঞ্জ উপজেলার সুন্দরদীঘি ইউনিয়নে সনাতন ধর্মাবলম্বী ভোটারের সংখ্যা বেশি। অতীতের বিভিন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জয়-পরাজয়ে এসব ভোটারের বিড়াট ভূমিকা দেখা গেছে। এবারও জয়-পরাজয় নির্ভর করছে ওই ৪২ শতাংশ সনাতন ধর্মাবলম্বী ভোটারের ওপর। তাই এ বিপুল সংখ্যক ভোটারের সমর্থন পেতে বিএনপি, জামায়াত ও জাসদের প্রার্থীরা তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছেন।
এদিকে, বিএনপি মনোনীত প্রার্থী ফরহাদ হোসেন আজাদ দীর্ঘ সময় ধরে দলীয় বিভিন্ন কর্মসূচির পাশাপাশি নেতাকর্মীদের চাঙ্গা রাখতে নানা কর্মসূচি পালন করে আসছিলেন। তবে পরিবর্তিত পরিস্থিতির পর থেকে তৃণমূল পর্যায়ে এবং ভোটের মাঠে তাকে আরও বেশি সক্রিয় হতে দেখা গেছে। তিনি প্রতিদিন তার নির্বাচনী এলাকায় উঠান বৈঠক, সভা-সেমিনারসহ দলের কেন্দ্রীয় নির্দেশনা অনুযায়ী কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন।
অন্যদিকে, বিএনপির প্রধান প্রতিপক্ষ জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী ও নেতাকর্মীরা সর্বস্তরের ভোটারদের পক্ষে টানতে নানা কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। তাদের দলীয় শৃঙ্খলা ও সুসংগঠিত কার্যক্রম সাধারণ ভোটারদের নজর কেড়েছে।
এ আসনটিতে মোট ভোটার সংখ্যা ৪ লাখ ১৪ হাজার ৩৫৩জন। এদের মধ্যে পুরুষ ভোটার ২ লাখ ৭ হাজার ২৩৭ জন এবং নারী ভোটার ২ লাখ ৭ হাজার ১১৩ জন। তৃতীয় লিঙ্গের (হিজড়া) ভোটার ৩ জন। পোস্টাল ভোটার ৩ হাজার ১৭৬ জন। মোট ভোট কেন্দ্র ১৩২ টি।
উল্যেখ্য জেলায় মোট ভোটার ৮ লক্ষ ৭৩ হাজার ১শ ৬০ জনের মধ্যে ২ লাখ ৩২ হাজার ৬৪৮ জন ভোটারই নতুন, যা মোট ভোটারের প্রায় ২৬ শতাংশ দুটি আসনের জয় পরাজয়ে এ ভোটাররাও রাখতে পারেন গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা।



