কুষ্টিয়া

কুষ্টিয়ায় লালন উৎসবের দ্বিতীয় দিনে আলোচনা সভা

কুষ্টিয়া প্রতিনিধি: কুষ্টিয়ার কুমারখালীর ছেঁউড়িয়ায় বাউল সম্রাট ফকির লালন সাঁইয়ের ১৩৬তম তিরোধান দিবস উপলক্ষে অনুষ্ঠিত হচ্ছে তিন দিনব্যাপী উৎসব। অনুষ্ঠানের দ্বিতীয় দিন কেটেছে আলোচনা সভা, লালনসংগীত ও সাধুসঙ্গের মধ্য দিয়ে। রোববার (১৮ অক্টোবর) বিকেলে ‘মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি’ প্রতিপাদ্যে লালন আখড়ায় এ আয়োজন করা হয়।

সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় ও কুষ্টিয়া জেলা প্রশাসনের সহযোগিতায় লালন একাডেমি এ উৎসবের আয়োজন করেছে। দ্বিতীয় দিনের আলোচনা সভায় দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা লালনভক্ত, সাধু-ফকির ও দর্শনার্থীরা অংশ নেন।

২য় দিনের আলোচনা সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন খুলনা বিভাগীয় কমিশনার (অতিরিক্ত সচিব) আব্দুল্লাহ হারুন। গেস্ট অব অনার ছিলেন কবি, লেখক ও চিন্তক ফরহাদ মজহার। মুখ্য আলোচক ছিলেন প্রাবন্ধিক অধ্যাপক ড. শেখ খালিদ হাসান।

বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন খুলনা রেঞ্জের ডিআইজি রেজাউল করিম, কুষ্টিয়ার পুলিশ সুপার আমিনুল ইসলাম, বিজিবি-৪৭ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল রাশেদ কামাল রনি, জেলা পরিষদের প্রশাসক বীর মুক্তিযোদ্ধা অধ্যক্ষ সোহরাব উদ্দিন এবং জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কুতুব উদ্দিন আহমেদ।

আলোচক ছিলেন ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ড. রশিদুজ্জামান। স্বাগত বক্তব্য দেন কুমারখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) নাভিদ সারওয়ার। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন কুষ্টিয়ার জেলা প্রশাসক তৌহিদ বিন-হাসান।

এসময় বক্তারা বলেন, লালন সাঁইয়ের দর্শন মানুষে মানুষে ভেদাভেদ ভুলে মানবতার চর্চা করতে শেখায়। জাতি, ধর্ম, বর্ণ ও সম্প্রদায়ের ঊর্ধ্বে উঠে মানুষের মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করাই ছিল তাঁর গানের অন্যতম মূল বার্তা। লালন সাঁইয়ের গান ও দর্শন শুধু একটি নির্দিষ্ট সময় বা জনগোষ্ঠীর জন্য নয়, বরং তা সব সময়ের মানুষের জন্য প্রাসঙ্গিক। বর্তমান সমাজে সম্প্রীতি, সহনশীলতা ও মানবিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠায় লালনের জীবনদর্শন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। লালন সাঁইয়ের অসাম্প্রদায়িক চেতনা ও মানবতাবাদী দর্শন নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে হবে। তাঁর গান, দর্শন ও জীবনবোধ সংরক্ষণ এবং চর্চার মাধ্যমে সমাজে সাম্য, সম্প্রীতি ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ জোরদার করা সম্ভব।

এছাড়া জেলা পরিষদের প্রশাসক বীর মুক্তিযোদ্ধা অধ্যক্ষ সোহরাব উদ্দিন বলেন, বাউল সম্রাট ফকির লালন সাঁই ছিলেন মানবতা, সাম্য ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার এক অনন্য সাধক। তাঁর গান ও দর্শন মানুষকে সব ধরনের বিভেদ ভুলে মানবতার পথে চলার শিক্ষা দেয়। লালনের এই দর্শন আজও সমাজের জন্য অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক।

তিনি বলেন, মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম চেতনা ছিল সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা। লালন সাঁইয়ের জীবনদর্শনের মধ্যেও এসব মূল্যবোধের প্রতিফলন রয়েছে। তাই নতুন প্রজন্মের কাছে লালনের মানবতাবাদী দর্শন তুলে ধরা জরুরি।

সোহরাব উদ্দিন আরও বলেন, লালন সাঁই শুধু কুষ্টিয়ার সম্পদ নন, তিনি বাংলা সংস্কৃতি ও মানবতার এক অনন্য প্রতিনিধি। তাঁর গান, দর্শন ও সৃষ্টিকর্ম সংরক্ষণে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। একই সঙ্গে লালনের অসাম্প্রদায়িক চেতনা ধারণ করে সমাজে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ, সম্প্রীতি ও মানবিক মূল্যবোধ জোরদার করতে হবে।

তিনি বলেন, লালন সাঁইয়ের তিরোধান দিবস উপলক্ষে আয়োজিত এ উৎসব তাঁর জীবন ও দর্শনকে নতুন করে উপলব্ধি করার সুযোগ সৃষ্টি করে। লালনের আদর্শকে শুধু উৎসবের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে ব্যক্তি ও সামাজিক জীবনে চর্চা করার আহ্বান জানান তিনি।

এছাড়া জেলা বিএনপির আহবায়ক কুতুবউদ্দিন আহমেদ বলেন, লালন সাঁই বাংলা সংস্কৃতির এক অমূল্য সম্পদ। তাঁর গান ও দর্শন দেশ-বিদেশে বাংলার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে সমৃদ্ধ করেছে। এই ঐতিহ্য সংরক্ষণ এবং নতুন প্রজন্মের কাছে লালনের জীবনদর্শন তুলে ধরতে সবাইকে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে। তিনি আরো বলেন, লালনের অসাম্প্রদায়িক ও মানবিক আদর্শ ধারণ করে একটি বৈষম্যহীন, শান্তিপূর্ণ ও সম্প্রীতিপূর্ণ সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব। লালন সাঁইয়ের তিরোধান দিবস উপলক্ষে আয়োজিত এ উৎসব তাঁর দর্শন ও সৃষ্টিকে মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়ার গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ।

সভাপতির বক্তব্যে কুষ্টিয়ার জেলা প্রশাসক তৌহিদ বিন-হাসান বলেন, বাউল সম্রাট ফকির লালন সাঁইয়ের জীবনদর্শন ও গান বাঙালির সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের এক অমূল্য সম্পদ। তাঁর দর্শনে মানুষে মানুষে বিভেদ নয়, বরং মানবতা, সাম্য ও সম্প্রীতির বার্তা রয়েছে। এই দর্শন সমাজে অসাম্প্রদায়িক চেতনা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

উল্লেখ্য, প্রতিবছর লালন সাঁইয়ের তিরোধান দিবস উপলক্ষে ছেঁউড়িয়ায় এ উৎসবের আয়োজন করা হয়। উৎসবের বিভিন্ন কর্মসূচির মধ্য দিয়ে লালনের জীবনদর্শন, মানবতাবাদী চিন্তা ও অসাম্প্রদায়িক চেতনা তুলে ধরা হয়। এবারও দেশ-বিদেশের দর্শনার্থীদের উপস্থিতিতে মুখর হয়ে ওঠে লালন আখড়া ও মাজার প্রাঙ্গণ।
লালন সাঁই তাঁর গান ও দর্শনের মধ্য দিয়ে জাতি, ধর্ম ও বর্ণের বিভেদ অতিক্রম করে মানবতার কথা বলেছেন। তাঁর সাম্যবাদী ও মানবতাবাদী দর্শন লাখো মানুষকে অনুপ্রাণিত করছে।

এই বিভাগের আরও সংবাদ