জাতীয়

ডিজিটাল হচ্ছে টিসিবি, ভর্তুকির পণ্য বিতরণে বাড়বে স্বচ্ছতা

ট্রেডিং কর্পোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) সেবাকে আরও সহজ, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক করতে ব্যাপক ডিজিটাল রূপান্তরের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ডিজিটাল টিসিবি কার্ড, ‘উপকারী’ মোবাইল অ্যাপ, অনলাইন ডিলার ব্যবস্থাপনা, অল-ইন-ওয়ান পিওএস এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইভিত্তিক রিয়েল-টাইম মনিটরিংয়ের মাধ্যমে সংস্থাটির পণ্য বিতরণ ও ব্যবস্থাপনায় প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো হচ্ছে।

বৃহস্পতিবার টিসিবির সম্মেলনকক্ষে সংস্থাটির কার্যক্রমের ডিজিটাল ট্রান্সফরমেশন উদ্বোধন অনুষ্ঠানে এসব উদ্যোগ তুলে ধরা হয়।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন বাণিজ্য, শিল্প এবং বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। বিশেষ অতিথি ছিলেন জাতীয় সংসদের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি ইঞ্জিনিয়ার খালেদ হোসেন মাহবুব শ্যামল এবং বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আতাউর রহমান খান।

বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, দেশের সরবরাহ ব্যবস্থাপনা এখনো পুরোপুরি নিরবচ্ছিন্ন ও কার্যকর হয়ে ওঠেনি। উৎপাদক পর্যায় থেকে পণ্য শহর বা রাজধানীর খুচরা বাজারে পৌঁছানোর পর অনেক ক্ষেত্রে দামের বড় ব্যবধান তৈরি হয়। আবার সাময়িক সরবরাহ ঘাটতিও বাজারে অস্থিরতা সৃষ্টি করে। এ পরিস্থিতিতে স্বল্প আয়ের মানুষের কাছে ভর্তুকি মূল্যে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য পৌঁছে দিতে টিসিবির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

তিনি বলেন, প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে টিসিবির সেবায় স্বচ্ছতা বাড়ানোর পাশাপাশি প্রকৃত উপকারভোগীর কাছে সরকারি ভর্তুকির সুবিধা পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হবে।

কার্ড হারালেও মিলবে পণ্য

টিসিবির নতুন ‘উপকারী’ মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে উপকারভোগীরা প্রচলিত কার্ডের পাশাপাশি নিরাপদ ডিজিটাল মাধ্যমেও সেবা নিতে পারবেন। ডিজিটালি স্বাক্ষরিত ও এনক্রিপ্টেড কিউআর কোডের মাধ্যমে উপকারভোগীর পরিচয় ও পণ্য পাওয়ার যোগ্যতা যাচাই করা হবে। এর ফলে কার্ড হারিয়ে গেলে বা নষ্ট হলেও প্রকৃত উপকারভোগী নির্ধারিত পণ্য পাওয়া থেকে বঞ্চিত হবেন না।

ডিলার নিয়োগেও ডিজিটাল ব্যবস্থা

অনলাইন ডিলার ম্যানেজমেন্ট সিস্টেমের মাধ্যমে ডিলার আবেদন, তথ্য সংরক্ষণ ও নিয়োগ প্রক্রিয়াকে আরও স্বচ্ছ ও নিয়মতান্ত্রিক করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। প্রয়োজনের তুলনায় আবেদনকারী বেশি হলে ডিজিটাল লটারির মাধ্যমে ডিলার নির্বাচনের সুযোগ থাকবে। পাশাপাশি অনলাইন পেমেন্ট কালেকশন চালুর মাধ্যমে আর্থিক লেনদেনের প্রক্রিয়াও আরও সহজ ও স্বচ্ছ করা হবে।

এআই দিয়ে নজরদারি

অল-ইন-ওয়ান পিওএসের মাধ্যমে পণ্য বিক্রি, বায়োমেট্রিক যাচাই, অনলাইন পেমেন্ট এবং তাৎক্ষণিক বিক্রয় রশিদ দেওয়ার ব্যবস্থা থাকবে। একই সঙ্গে এআইভিত্তিক রিয়েল-টাইম মনিটরিং ব্যবস্থার মাধ্যমে কোন এলাকায় কত পণ্য বিক্রি ও বিতরণ হচ্ছে, কোথাও অনিয়ম হচ্ছে কি না—এসব তথ্য তাৎক্ষণিকভাবে পর্যবেক্ষণ করা যাবে। এতে অনিয়ম শনাক্ত এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ হবে। এআইভিত্তিক কন্টাক্ট সেন্টারও চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যাতে উপকারভোগীরা দ্রুত প্রয়োজনীয় তথ্য ও সহায়তা পান।

৫৯ লাখ অযোগ্য আবেদনকারী বাদ

অনুষ্ঠানে জানানো হয়, জাতীয় পরিচয়পত্র, মোবাইল নম্বর ও অন্যান্য তথ্য যাচাই করে প্রায় ৫৯ লাখ অযোগ্য আবেদনকারীকে তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে একটি যাচাইকৃত ডিজিটাল ডেটাবেস তৈরি করা হয়েছে। সরকারি ভর্তুকি যেন প্রকৃত ও যোগ্য উপকারভোগীর কাছেই পৌঁছে, তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে এই ডেটাবেস গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

বর্তমানে প্রায় ৭৯ লাখ উপকারভোগী টিসিবির সেবার আওতায় রয়েছেন। ভবিষ্যতে এ সংখ্যা এক কোটিতে উন্নীত করার লক্ষ্য রয়েছে বলে উল্লেখ করেন বাণিজ্যমন্ত্রী।

সাশ্রয় হতে পারে ৩০০ থেকে ৩৫০ কোটি টাকা

বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, চলতি অর্থবছরে টিসিবির বিভিন্ন উদ্যোগ ও ডিজিটাল রূপান্তরের ফলে গত বছরের তুলনায় প্রায় ৩০০ থেকে ৩৫০ কোটি টাকার ভর্তুকি সাশ্রয় হতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।

আগামী চার থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে প্রযুক্তির ব্যবহার, সঠিক উপকারভোগী নির্বাচন এবং কার্যকর ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে ভর্তুকির অপচয় আরও উল্লেখযোগ্য হারে কমিয়ে আনার লক্ষ্য রয়েছে।

তিনি বলেন, “প্রযুক্তি হবে মানুষের জন্য, সেবা হবে সহজ, স্বচ্ছ ও মর্যাদাপূর্ণ।”

অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন টিসিবির চেয়ারম্যান ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ ফয়সল আজাদ। অনুষ্ঠানে তিনি স্বাগত বক্তব্য দেন।

এ সময় বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও টিসিবির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি, গণমাধ্যমকর্মী এবং আমন্ত্রিত অতিথিরা উপস্থিত ছিলেন।

পরে বাণিজ্যমন্ত্রী অতিথিদের সাথে নিয়ে টিসিবির ডিজিটাল কার্যক্রমের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন।

এই বিভাগের আরও সংবাদ