কুবিতে অপরিচ্ছন্ন অবস্থায় ওয়াশরুম-টয়লেট, শ্যাওলা জমেছে পানির ফিল্টারে


বিজয় কুমার সুশীল, কুবি প্রতিনিধি:কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুবি) শিক্ষার্থীদের ব্যবহার অনুপযোগী অবস্থায় পড়ে রয়েছে বিভিন্ন একাডেমিক ভবন ও আবাসিক হলের কয়েকটি টয়লেটের দরজা, কমোড ও ওয়াশরুম ইত্যাদি। কোথাও বেসিন অপরিষ্কার, কোথাও পানি সরবরাহে সমস্যা। একই সঙ্গে কয়েকটি খাবার পানির ফিল্টার ও পানির ট্যাংকে ময়লা ও শ্যাওলা জমে থাকার অভিযোগ করেছেন শিক্ষার্থীরা। এতে করে স্বাস্থ্যঝুকিতে পড়ছেন শিক্ষার্থীরা।
সরেজমিনে দেখা যায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের নৃবিজ্ঞান, লোক প্রশাসন, ইংরেজি, বাংলা, অর্থনীতি, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের কয়েকটি টয়লেটের পাশাপাশি ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদের ব্যবস্থাপনা, মার্কেটিং, একাউন্টিং অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেমস এবং ফিন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং বিভাগ, বিজ্ঞান অনুষদের গণিত ও পরিসংখ্যান বিভাগের টয়লেট এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের ওয়াশরুমে বিভিন্ন সমস্যা রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঁচটি আবাসিক হলের কয়েকটি টয়লেটেও দরজা ভাঙা, কমোড অকেজো ও পানি সরবরাহে সমস্যা দেখা গেছে। কয়েকটি খাবার পানির ফিল্টার ও পানির ট্যাংকেও ময়লা ও শ্যাওলা জমে থাকতে দেখা গেছে।
এসব অপরিচ্ছন্ন ওয়াশরুম, পানির ফিল্টার নিয়মিত ব্যবহারে দিনদিন বাড়ছে শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্যঝুঁকি। ফলে শিক্ষার্থীদের দাবি, শুধু মেরামত নয়, টয়লেট ও পানির ফিল্টারের নিয়মিত পরিষ্কার ও রক্ষণাবেক্ষণের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। শিক্ষার্থীরা জানায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন ভবন ও হলে টয়লেট ও খাবার পানির ফিল্টারের রক্ষণাবেক্ষণ নিয়ে অভিযোগ করলেও এর নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের বিষয়ে প্রশাসনের পক্ষ থেকে পর্যাপ্ত উদ্যোগ নিতে দেখা যায় না।
সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের লোকপ্রশাসন বিভাগের ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী মন্দিরা দাস বলেন, ‘ক্যাম্পাসের কোনো ওয়াশরুমের অবস্থাই তেমন একটা সুবিধার না। বেশির ভাগেরই হয় দরজা ভাঙা, নয়তো বেসিন খুব বাজেভাবে অপরিষ্কার। তিন বছর ধরে এ নিয়ে অনেক লেখালেখি হতে দেখেছি। হাইজিন নিয়ে অনেক সেমিনার হতে দেখলাম, বাজেট দেওয়ার কথাও শুনলাম; কিন্তু দৃশ্যমান কোনো পরিবর্তন দেখিনি। পুরো অনুষদের ফিল্টারগুলো ওয়াশরুমের পাশে। কিছু ভাঙা, আবার কিছু এতটাই অপরিষ্কার যে সেখান থেকে পানি খেতে রুঁচিতে বাধে।’
বিজ্ঞান অনুষদের ফার্মেসি বিভাগের ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী নাঈম ভূঁইয়া বলেন, ‘ভালো পড়াশোনা ও সুস্থভাবে থাকার প্রথম শর্তই একটি স্বাস্থ্যকর পরিবেশ। অথচ হাজার হাজার শিক্ষার্থীর এই বিশ্ববিদ্যালয়ে সেই ন্যূনতম চাহিদাটুকুও নিশ্চিত হয়নি। এই সমস্যাকে ছোট করে দেখার সুযোগ নেই। তাই দ্রুত ওয়াশরুমগুলোর সংস্কার এবং নিয়মিত ও কার্যকর রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।’
ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদের অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেমস বিভাগের ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী জয়ন্ত কর্মকার বলেন, ‘আমরা যখন ওয়াশরুমে যাই, তখন একপ্রকার নাক চেপে ধরেই থাকতে হয়। প্রতিনিয়ত এগুলো নোংরা হলেও আমাদের বিভাগগুলো এসব নজরে রাখে না। আমাদের পানির ফিল্টারগুলো কখন পরিষ্কার করা হয়েছে, তা জানা নেই। এখানকার পিপি ফিল্টারগুলো শ্যাওলা জমে সবুজ হয়ে আছে। চরম পিপাসা না লাগলে এসব ফিল্টার থেকে আমি পানি পান করি না।’
বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক ভবনের পাশাপাশি আবাসিক হলগুলোতেও রয়েছে পরিচ্ছন্ন ওয়াশরুম, বাথরুম ও বিশুদ্ধ খাবার পানির সমস্যা। এছাড়া দুর্বল ড্রেনেজ ব্যবস্থার ফলে দুর্গন্ধ পোহাতে হয় শিক্ষার্থীদের।
কাজী নজরুল ইসলাম হলের ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষের আবাসিক শিক্ষার্থী রুবায়েত হোসাইন বলেন, ‘আমাদের হলের কয়েকটি কল থেকে অনবরত পানি পড়তেই থাকে। এছাড়া কয়েকটি ওয়াশরুমের দরজা ও কমোড ভাঙা এবং জরাজীর্ণ অবস্থায় পড়ে রয়েছে। পানির ফিল্টারগুলোতেও শ্যাওলা জমে রয়েছে।’
নবাব ফয়জুন্নেসা হলের ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষের আবাসিক শিক্ষার্থী মারিয়া আক্তার বলেন, ‘আমাদের ব্লকের ওয়াশরুমগুলোর অর্ধেকেরও বেশি বর্তমানে ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়ে আছে। কোথাও দরজা বন্ধ হয় না, আবার কোথাও ট্যাপ নষ্ট থাকায় পানি পড়ে না। ফলে সীমিত কয়েকটি ওয়াশরুমের ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়ায় প্রতিদিন বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থীকে চরম ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে। হলের নিচতলা থেকেই প্রছন্ড দুর্গন্ধ আসে। পর্যাপ্ত ড্রেনেজ ব্যবস্থা ও পাইপলাইনের ত্রুটির কারণেই হয়ত এই দুর্গন্ধ আসে।’
এদিকে পরিচ্ছন্নতার কাজে বিশ্ববিদ্যালয়ে মোট কর্মী রয়েছেন ১৭ জন। এরমধ্যে কেন্দ্রীয়ভাবে স্টেট শাখায় ৫ জন এবং বাকি ১১ জন বিভিন্ন বিভাগ এবং আবাসিক হলে কর্মরত রয়েছেন। পরিচ্ছন্নতার কাজে ব্যাঘাত ঘটার অন্যতম কারণ হিসেবে লোকবল সংকটকে দায়ী করছেন পরিচ্ছন্নতা সংশ্লিষ্টরা।
বিজয়-২৪ হলের পরিচ্ছন্নতাকর্মী জগন্নাথ বলেন, ‘আমি আগে বিজ্ঞান অনুষদে ছিলাম। একা একজন মানুষের পক্ষে পুরো ভবনের পরিচ্ছন্নতার দায়িত্ব ঠিকভাবে পালন করা খুবই কঠিন কাজ। এ ক্ষেত্রে যদি আরও কয়েকজন কর্মী নিয়োগ দেওয়া হয়, তবেই সমস্যার সমাধান হবে।’
এ নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের এস্টেট শাখার প্রধান মোহাম্মদ রেজাউল করিম বলেন, ‘আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিচ্ছন্নতাকর্মীর সংকট রয়েছে। এখানে যারা কর্মরত রয়েছেন, তাঁদের মধ্যে কয়েকজন নিজ নিজ দায়িত্ব পালনে অবহেলা করেন। তাঁদের শাস্তির আওতায় আনা হলেও কয়েক দিন ঠিক থাকার পর আবার আগের মতো অবহেলা করতে থাকেন।’
এ ছাড়া অপরিষ্কার টয়লেট ব্যবহার ও অনিরাপদ পানি পান করার ফলে শিক্ষার্থীদের নানারকম স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ার সম্ভাবনাও রয়েছে।
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান চিকিৎসক ড. মাহমুদুর হাসান খান বলেন, ‘নিরাপদ খাদ্যের একটি উপাদান পানি। আমরা এখানে শিক্ষার্থীদের পানিবাহিত রোগে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসা নিতে আসতে দেখি। যেমন ডায়রিয়া, পেটব্যথা, জন্ডিস, টাইফয়েড। এছাড়া এসব নোংরা পানির কারণে শরীরেও বিভিন্ন চর্মরোগ দেখা দেয়।’
অনুষভবনগুলোর পরিচ্ছন্নতা বিষয়ক সংকট, প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাগ্রহণ ইত্যাদির মাধ্যমে প্রশাসনকে অবগতকরণের দায়িত্বে থাকেন অনুষদের ডিনবৃন্দ। তবে ডিনরা প্রশাসনকে সংকটের বিষয়ে অবগত করলেও বাজেট স্বল্পতার কারণে প্রায়ই সকল কাজ সম্পাদন করা সম্ভব হয় না।
অপরিচ্ছন্নতা ও বিশুদ্ধ পানির বিষয়ে জানতে চাইলে সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ রেজাউল করিম বলেন, ‘কিছু কিছু টয়লেটের দরজা ভাঙা, পানির সংকট ও অন্যান্য সমস্যাগুলো আমি তাৎক্ষণিকভাবে ঠিক করেছি। ইতোমধ্যে প্রশাসনের কাছে আধুনিক টয়লেট ব্যবস্থা নির্মাণের জন্য বাজেট পেশ করেছি। আগামী টেন্ডারেই তা পাস হবে বলে আশা করা যায়।’
ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদের ডিন ড. মোহাম্মদ এমদাদুল হক বলেন, ‘আমরা বিষয়গুলো খেয়াল করেছি এবং কয়েক মাস আগেও ওয়াশরুমগুলো মেরামত করা হয়েছিল। এ ক্ষেত্রে প্রশাসনের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদেরও ভূমিকা রাখতে হবে।’
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. আমজাদ হোসেন সরকার বলেন, ‘আমরা ইতোমধ্যে উদ্যোগ গ্রহণ করেছি। প্রত্যেক হলে প্রভোস্টদের প্রধান করে কমিটি করা হয়েছে। কমিটির প্রধান কাজ হলো হলের টয়লেট, ফিল্টার ও করিডোর পরিষ্কারের বিষয়ে নজর রাখা।’
জনবল ও বাজেটের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘জনবল ও বাজেট নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) কাছে আমরা প্রস্তাবনা পাঠিয়েছি। তারা প্রস্তাবনা মঞ্জুর করলে অতি দ্রুতই আমরা সেটি কার্যকর করব।



