উপকূলের শিশুদের জলবায়ু ঝুঁকি কমাতে জোরালো পদক্ষেপের দাবি


আহছানুল আমীন জর্জ, খুলনা ব্যুরো প্রধান : জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত থেকে সুরক্ষা, সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় শিশুদের অর্থবহ অংশগ্রহণ এবং জলবায়ু তহবিলে উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর সহজতর প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছে উপকূলের শিশুরা। বুধবার ( ২৩ সেপ্টেম্বর) খুলনায় দুই দিনব্যাপী ষষ্ঠ উপকূলীয় শিশু জলবায়ু সম্মেলনের সমাপনী দিনে এসব দাবি জানানো হয়।
‘জলবায়ু সহনশীলতায় শিশুদের নেতৃত্ব’ প্রতিপাদ্যে আয়োজিত সম্মেলনে উপকূলীয় এলাকার শিশুদের পাশাপাশি সরকারি কর্মকর্তা, শিক্ষাবিদ, উন্নয়নকর্মী ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। সম্মেলনে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে উপকূলের মানুষের ক্রমবর্ধমান ঝুঁকি, শিশুদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও জীবিকার ওপর এর প্রভাব এবং সম্ভাব্য সমাধান নিয়ে আলোচনা হয়।
সমাপনী অনুষ্ঠানে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা যারা উপকূলীয় এলাকায় বাস করি, তারা নানা ঝুঁকির মধ্যে রয়েছি।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের দেশ দূষিত হয়ে গেছে। এই দূষণ দূর করতে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।’
শিশুদের উদ্দেশে প্রতিমন্ত্রী বলেন, প্রতিটি স্কুলে প্লাস্টিক ও পলিথিনের ব্যবহার বন্ধে উদ্যোগ নিতে হবে এবং অন্যদেরও এ বিষয়ে সচেতন করতে হবে।
সম্মেলনে শিশুদের পক্ষে রোজ বৈরাগী, মুন মণ্ডল, দিশা মজুমদার, মনিরা সুলতানা রূপা ও আধারা আক্তার মেঘলা বক্তব্য দেন। তাঁরা বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে উপকূলের শিশুদের জীবন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও জীবিকা ইতিমধ্যে ব্যাহত হচ্ছে। তাই নীতি প্রণয়ন ও জলবায়ুসংক্রান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণে শিশুদের মতামতকে গুরুত্ব দিতে হবে।
শিশুরা উপকূলীয় এলাকায় নিরাপদ পানির সংকট দূর করার পাশাপাশি টেকসই সমাধানের দাবি জানায়। তারা জলবায়ু সহনশীল বাঁধ নির্মাণ ও নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার মানুষের জীবন, ঘরবাড়ি ও জীবিকার সুরক্ষা নিশ্চিত করারও দাবি জানায়।
দুর্যোগের সময় ও পরে শিশুদের নিরাপদ আশ্রয় এবং শিক্ষার ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি স্বাস্থ্যসেবা, শিশুসুরক্ষা, জলবায়ু শিক্ষা, দুর্যোগ মোকাবিলার প্রস্তুতি ও মানসিক স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ বাড়ানোর দাবি জানানো হয়।
শিশুরা দুর্যোগকেন্দ্রগুলোকে আধুনিক, শিশুবান্ধব ও অন্তর্ভুক্তিমূলক করার দাবি জানায়। এসব আশ্রয়কেন্দ্রে শিশুদের পাশাপাশি গর্ভবতী নারী, বয়স্ক ব্যক্তি ও প্রতিবন্ধী মানুষের জন্য প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার কথা বলা হয়।
জলবায়ু পরিবর্তনে ক্ষতিগ্রস্ত ও বাস্তুচ্যুত পরিবারগুলোর জন্য কর্মসংস্থান, জীবিকার সুযোগ, পুনর্বাসন ও সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করার দাবিও ওঠে। উপকূলীয় এলাকায় বাড়তে থাকা লবণাক্ততা মোকাবিলায় জলবায়ু সহনশীল কৃষি ও মৎস্যচাষের সুযোগ বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়।
সম্মেলনে প্লাস্টিক ও পলিথিন দূষণ, পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর ইটভাটা এবং অন্যান্য পরিবেশবিধ্বংসী কর্মকাণ্ড বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়। পরিবেশবান্ধব নির্মাণসামগ্রীর ব্যবহার বাড়ানোর পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তাদের কারিগরি সহায়তা দেওয়ার কথাও বলা হয়।
জলবায়ু পরিবর্তনে ক্ষতিগ্রস্ত শিশু ও পরিবারগুলোর জন্য পর্যাপ্ত ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসনের দাবি জানিয়ে শিশুরা নদী, খাল ও সুন্দরবন রক্ষায় আরও জোরালো উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানায়।
‘বৈশ্বিক জলবায়ু কার্যক্রমে উপকূলের শিশুদের কণ্ঠ: কপ৩১ থেকে প্রত্যাশা’ শীর্ষক অধিবেশনে বৈশ্বিক জলবায়ু আলোচনায় শিশুদের অংশগ্রহণ এবং আসন্ন কপ৩১ নিয়ে তাদের প্রত্যাশা নিয়ে আলোচনা হয়। অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন নারায়ণগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. নাজমুস সাদাত।
এ ছাড়া খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. নাজিয়া হাসান, সিসিজেবির প্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালক অ্যাডভোকেট এম হাফিজুল ইসলাম খান, আওসেডের প্রতিনিধি সালাহউদ্দিন, চিলড্রেন ফোরাম অন ক্লাইমেট চেঞ্জের সভাপতি নওশীন ইসলাম, সাধারণ সম্পাদক নূর আহমাদ জিদান, সদস্য সাহারা রহমান, বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির (ডব্লিউএফপি) খুলনা প্রতিনিধি আল মামুন আজাদ এবং মাছরাঙা টেলিভিশনের বিশেষ প্রতিনিধি আবু হেনা মোস্তফা জামাল পপলু আলোচনায় অংশ নেন।
‘উপকূলের শিশুদের সংগ্রাম’ শীর্ষক আরেকটি অধিবেশনে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে শিক্ষা, জীবিকা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক সুরক্ষায় সৃষ্ট সংকট নিয়ে আলোচনা করা হয়। বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) বিকেলে ‘জলবায়ুজনিত ক্ষয়ক্ষতির সমাধান’ এবং ‘উপকূলের শিশু ও ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর জলবায়ু অর্থায়নে প্রবেশাধিকার’ বিষয়ে পৃথক অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়।
বক্তারা বলেন, জলবায়ু অর্থায়নের সুফল যেন সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকা জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছায়, তা নিশ্চিত করতে হবে। বিশেষ করে উপকূলের শিশু ও ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারগুলোকে জলবায়ু অর্থায়নের আওতায় আনার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
সম্মেলনে জানানো হয়, খুলনা চিলড্রেনস ফোরামের সদস্য নওশীন ইসলাম ও নূর আহমাদ জিদান আগামী নভেম্বরে তুরস্কে অনুষ্ঠিতব্য কপ৩১-এ অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে।
শিশুরা বললো, ‘আমরা শুধু ভবিষ্যৎ নই; আমরা উন্নয়নের অংশীদার। আমরা চাই, আমাদের কণ্ঠস্বর শোনা হোক, আমাদের উদ্বেগগুলো সিদ্ধান্তে প্রতিফলিত হোক এবং কপ সম্মেলনে আমাদের দাবিগুলো গুরুত্ব পাক।’
সম্মেলনে খুলনার অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার (রাজস্ব) সিফাত মেহনাজ, প্রেস ইনস্টিটিউট বাংলাদেশের মহাপরিচালক ফারুক ওয়াসিফ, খুলনার জেলা প্রশাসক হুরে জান্নাত, কনসার্ন ওয়ার্ল্ডওয়াইড বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর মনীশ কুমার আগরওয়ালসহ সরকারি ও উন্নয়ন সংস্থার বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা ও প্রতিনিধিরা বক্তব্য দেন।
সম্মেলনের সমাপনী বক্তব্য দেন সম্মেলনের সমন্বয়ক ও জেজেএসের নির্বাহী পরিচালক এ টি এম জাকির হোসেন। পরে চিলড্রেনস ফোরামের সদস্য নূর আহমাদ জিদান ও নওশীন ইসলামের ধন্যবাদ জ্ঞাপনের মধ্য দিয়ে দুই দিনের সম্মেলন শেষ হয়।



