সিরিজ বোমা হামলা: যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত জেএমবি সদস্য আটক


মনির হোসেন জীবন: নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠন “জামায়াতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ (জেএমবি)” ২০০৫ সালের সিরিজ বোমা হামলার ঘটনায় যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত পলাতক জেএমবি’র এক সদস্যকে রাজধানীর তেজগাঁও এলাকা থেকে গ্রেফতার করেছে র্যাপিড এ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব)।
র্যাব জানিয়েছে, আটককৃত জেএমবির সদস্যের নাম তুহিন রেজা। সে ঝিনাইদহ জেলার সদর থানার শিকারপুর গ্রামের মৃত শামছুদ্দিনের পুত্র। যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত জেএমবি সদস্য রেজা ঘটনার পর থেকে দীর্ঘ ১৮ বছর যাবৎ পলাতক থেকে গোপনে জীবন যাপন করে আসছিল।
আজ শুক্রবার বেলা ১১ টায় রাজধানীর কারওয়ান বাজারস্হ র্যাব মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে র্যাব-৩ এর কমান্ডিং অফিসার (অধিনায়ক) লেফটেন্যান্ট কর্নেল আরিফ মহিউদ্দিন আহমেদ এসব তথ্য জানান।
তিনি জানান, গতকাল বৃহস্পতিবার রাতে রাজধানীর তেজগাঁও থানার তেজগাঁও রেলগেইট এলাকায় ঝটিকা অভিযান চালিয়ে জেএমবির সদস্য তুহিন রেজাকে র্যাব-৩ এর সদস্যরা আটক করতে সক্ষম হয়।
আরিফ মহিউদ্দিন আহমেদ জানান, ২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট সারাদেশে একযোগে সিরিজ বোমা হামলা চালানো হয়েছিল। ২০০৫ সালের ১৭ আগষ্ট বেলা ১১ টা থেকে সাড়ে ১১ টার মধ্যে সারা দেশের ৬৩ টি জেলার গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার পাশাপাশি রাজধানীর ৩৪টি স্পটসহ সর্বমোট ৪৫০ টি স্পটে প্রায় ৫০০ বোমার বিস্ফোরণ ঘটায় জেএমবি’র জঙ্গিরা। ৩০ মিনিটের ব্যবধানে চালানো এ সিরিজ বোমা হামলায় ২ জন নিহত এবং প্রায় দুই শতাধিক মানুষ আহত হয়। একযোগে এই হামলার মাধ্যমে বাংলাদেশে নিজেদের সংঘবদ্ধ উপস্থিতির জানান দেয়ার চেষ্টা করেছিল জেএমবির সদস্যরা।
র্যাব-৩ এর অধিনায়ক জানান, ওই সিরিজ বোমা হামলায় সারাদেশের মতই ঝিনাইদহ জেলার ডিসি অফিস, জজ কোর্ট ও পায়রা বন্দরসহ কয়েকটি এলাকায় একই সময়ে নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠন জেএমবি কর্তৃক একযোগে সিরিজ বোমা হামলা ঘটানো হয়। তখন বোমা বিস্ফোরনের ঘটনায় ঝিনাইদহ সদর থানায় অজ্ঞাতনামা জড়িতদের বিরুদ্ধে বিস্ফোরক দ্রব্য আইনে একটি মামলা দায়ের করা হয়।
পরবর্তীতে মামলাটির তদন্তে ঘটনাটি জেএমবি কর্তৃক একযোগে ঘটানোর সত্যতা প্রমানিত হয় এবং ঝিনাইদহ জেলায় সংগঠিত ওই বোমা বিস্ফোরনের ঘটনায় মোট ২১ জন জড়িত মর্মে বিজ্ঞ আদালতে ২০০৫ সালের ২০ নভেম্বর তারিখ একটি অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়।
সংবাদ সম্মেলনে র্যাব বলছে, মামলাটি স্পেশাল ট্রাইব্যুনাল ঝিনাইদহ কর্তৃক বিচার শেষে অভিযুক্ত ২১ জনের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ রাষ্ট্রপক্ষ সন্দেহাতীত ভাবে প্রমাণ করতে সক্ষম হলে আসামিদের সকলকে মৃত্যুদন্ডে দন্ডিত করা হয়। কিন্তু আসামিরা মৃত্যুদন্ডাদেশের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আপিল করলে বিজ্ঞ আদালত তাদের অভিযোগপত্র পুনঃবিবেচনার মাধ্যমে ২০০৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি ১৪ জন আসামিকে যাবজ্জীবন কারাদন্ডসহ ৫০ টাকা করে অর্থদন্ড প্রদান করেন এবং ৭ জন আসামিকে খালাস প্রদান করেন।
আরিফ মহিউদ্দিন আহমেদ জানান, পরবর্তীতে সাজাপ্রাপ্ত পলাতক আসামিদের গ্রেফতারে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী তৎপরতা চালানো শুরু করে। এখন পর্যন্ত (এযাবৎ) সাজাপ্রাপ্ত ১৪ জন আসামির মধ্যে ১২ জন আসামিকে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী কর্তৃক গ্রেফতার করে আইনের হাতে সোপর্দ করা হয়।
পলাতক ২ জনের মধ্যে ওই মামলার ১০ নং অভিযুক্ত ও যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত আসামী জেএমবি সদস্য তুহিন রেজাকে গতকাল বৃহস্পতিবার রাতে তেজগাঁও এলাকা থেকে গ্রেফতার করতে সক্ষম হয় র্যাব-৩।
র্যাব বলছে, ওই বোমা মামলায় যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত ৭ নং অভিযুক্ত মোহন এখনো পলাতক রয়েছে এবং তাকে গ্রেফতারে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর প্রচেষ্টা চলমান রয়েছে।
প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায়, ২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট দেশের ৬৩টি জেলায় একসঙ্গে বোমা হামলা চালায় জেএমবি। এর মধ্যে ঝিনাইদহ শহরে ডিসি অফিস, জেলা জজ আদালত চত্বর, বাস টার্মিনাল ও কলেজ মোড়সহ বেশ কয়েকটি স্থানে একযোগে বোমা হামলা ও নিষিদ্ধ লিফলেট ছড়ানোর কার্যক্রম চালায় জেএমবি।
লেফটেন্যান্ট কর্নেল আরিফ মহিউদ্দিন আহমেদ বলেন, আটককৃত আসামি তুহিন রেজা ২০০৪ সালে জেএমবি’র ঝিনাইদহ সদর শাখায় সদস্য হিসেবে যোগদান করে। যোগদানের পর থেকে সে অত্র শাখার লিফলেট তৈরি, লিখিত প্রচার-প্রচারণার সম্পাদনা, গোপন ও নাশকতমূলক খবরাখবর আদান-প্রদান, বিভিন্ন ভিডিও এডিটিং এর মাধ্যমে তৈরিকৃত বিভ্রান্তিমূলক প্রামাণ্যচিত্র দ্বারা তরুণদের পথভ্রষ্ট করত।
তিনি জানান, এছাড়া ২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট হামলাকে কেন্দ্র করে পূর্ববর্তী দীর্ঘ সময় ধরে তারা হামলার নীলনকশা সাজায়। পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী ১৭ আগস্ট ভোর থেকে অন্যান্য হামলাকারীদের সাথে আটক আসামি আদালত চত্বরের আশেপাশে অবস্থান নেয় এবং হামলার সময় সক্রিয় ভূমিকা পালন করে। এলোপাথাড়ি বোমা হামলার পর তারা বিভিন্ন দিকে দৌঁড়ে পালিয়ে যায়।
আরিফ মহিউদ্দিন আহমেদ জানান, গ্রেফতারকৃত আসামি ১৭ আগস্ট বোমা হামলার পর ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে এসে ঝিনাইদহ সদরে জঙ্গি ক্যাম্পে কিছুদিন গাঢাকা দিয়ে থাকে। এরপর তাদের বিরুদ্ধে মামলা হলে এবং গ্রেফতারী পরোয়ানা জারী হলে কিছুদিনের মধ্যে আসামি তুহিন রেজা পালিয়ে ঢাকায় চলে আসে। এখানে সে প্রথমে যাত্রাবাড়ী পরবর্তীতে খিলগাঁও, উত্তরা, মহাখালীসহ বিভিন্ন জায়গায় স্থান পরিবর্তন করে বসবাস করে।
তিনি আরো জানান, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী কর্তৃক গ্রেফতার হওয়ার ভয়ে সে বিভিন্ন সময় বাসা পরিবর্তন করে ভিন্ন ভিন্ন জায়গায় বসবাস শুরু করে। ২০২১ সাল থেকে সে তেজগাঁও এলাকায় একটি বাসা ভাড়া নিয়ে বসবাস করতে থাকে এবং সেখান থেকেই গোপন সংবাদের ভিত্তিতে তাকে গ্রেফতার করা হয়। পলাতক অবস্থায় সে বেসরকারী প্রতিষ্ঠানে ভিডিও এডিটিংসহ বিভিন্ন সফট্ওয়্যার ভিত্তিক কাজের মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করত।
আজ শুক্রবার র্যাব-৩ এর সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার স্টাফ অফিসার (মিডিয়া) ফারজানা হক জানান, গ্রেফতারকৃত আসামির বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন আছে বলে জানান তিনি।



