আন্তর্জাতিক

যে শর্তে ইরানের ওপর থেকে সব নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করবে যুক্তরাষ্ট্র

ইরান হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দিলে এবং আঞ্চলিক মিত্র সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর মাধ্যমে পরিচালিত হামলা বন্ধ করলে সদ্য চালু করা ‘অপারেশন ইকোনমিক আউটকাস্ট’ বাতিল, ইরানের ওপর আরোপিত সব নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং দেশটির বন্দরগুলো ঘিরে নৌ অবরোধ তুলে নেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। আল আরাবিয়ার বরাতে এমন তথ্য জানিয়েছে গালফ নিউজ।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সম্প্রতি ইরান সফরে গিয়ে পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির এ প্রস্তাব পৌঁছে দেন। তেহরানে তিনি ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সচিব মোহসেন রেজায়ির সঙ্গে বৈঠক করেন। বৈঠকটি স্পষ্ট ও সিদ্ধান্তমূলক ছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

জুনে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে স্বাক্ষরিত একটি সমঝোতা স্মারকের কিছু বিষয় পুনরুজ্জীবিত করার প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে এ প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে বলে জানানো হয়। ওই সমঝোতার লক্ষ্য ছিল দুই দেশের মধ্যে চলমান সংঘাতের অবসান এবং গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল পুনরায় স্বাভাবিক করা।

প্রতিবেদন অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবের মূল শর্ত হলো, ইরানকে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের নিশ্চয়তা দিতে হবে এবং আঞ্চলিক মিত্র সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর হামলা বন্ধ করতে হবে।

বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশ সাধারণত হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবহন করা হয়। ফলে প্রণালিটিতে জাহাজ চলাচল বাধাগ্রস্ত হওয়ায় আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে ব্যাপক প্রভাব পড়ছে।

এর বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্রের ঘোষিত অর্থনৈতিক চাপের অভিযান ‘অপারেশন ইকোনমিক আউটকাস্ট’ স্থগিত বা বাতিল করতে পারে। একই সঙ্গে ইরানের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং দেশটির বন্দরগুলো ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ বন্ধ করার প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছে।

তবে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের মূল দাবিগুলোতে কোনো পরিবর্তন আসেনি। তেহরান যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ৩০০ বিলিয়ন ডলার ক্ষতিপূরণ, সব মার্কিন নিষেধাজ্ঞা পুরোপুরি প্রত্যাহার, জব্দ করা ইরানি সম্পদ ছাড় এবং নৌ অবরোধের অবসান দাবি করে আসছে।

ইরানের প্রায় ১০০ থেকে ১২৩ বিলিয়ন ডলারের সম্পদ বিভিন্ন দেশে আটকে আছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এ ছাড়া পুরো অঞ্চল থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহার এবং লেবানন ও গাজাসহ একটি বিস্তৃত আঞ্চলিক যুদ্ধবিরতির দাবিও রয়েছে ইরানের।

গত ২৪ আগস্ট মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট ‘অপারেশন ইকোনমিক আউটকাস্ট’ ঘোষণা করেন। এর আওতায় ডিজিটাল সম্পদ, প্রযুক্তি, স্বর্ণ, বিমান চলাচল ও নৌপরিবহনসহ বিভিন্ন খাতে ইরানের অর্থনৈতিক কার্যক্রমের ওপর নতুন করে চাপ দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়।

মাসের পর মাস ধরে চলা সংঘাতের মধ্যে ইরানের অর্থনীতিকে আরও বিচ্ছিন্ন করাই এ অভিযানের লক্ষ্য। এর আগে ইরানের বন্দর ও হরমুজ প্রণালির ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ এবং প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন সৃষ্টি হয়।

ওয়াশিংটনের কর্মকর্তারা বলছেন, নতুন নীতির লক্ষ্য ইরানকে দুটি পথের মধ্যে একটি বেছে নিতে বাধ্য করা; আন্তর্জাতিকভাবে আরও বেশি বিচ্ছিন্নতা অথবা বৈশ্বিক অর্থনীতিতে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসা।

পাকিস্তানের মাধ্যমে নতুন এই কূটনৈতিক যোগাযোগ এমন এক সময়ে শুরু হয়েছে, যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আলোচনার প্রক্রিয়া বারবার বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

জুনে ৬০ দিনের একটি অন্তর্বর্তী সমঝোতার পর যুক্তরাষ্ট্র সাময়িকভাবে নৌ অবরোধ শিথিল করে এবং হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল আংশিকভাবে পুনরায় শুরু হয়। তবে দুই পক্ষই পরস্পরের বিরুদ্ধে সমঝোতা লঙ্ঘনের অভিযোগ তোলার পর সেই ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে। এর পর থেকে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল এবং আন্তর্জাতিক তেলের বাজারে অস্থিরতা অব্যাহত রয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সর্বশেষ মার্কিন প্রস্তাবের বিষয়ে ইরানের কর্মকর্তারা এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে বিস্তারিত কোনো প্রতিক্রিয়া জানাননি। তবে মোহসেন রেজায়ি আসিম মুনিরকে জানিয়েছেন, তেহরান বিষয়টি নিয়ে অভ্যন্তরীণ আলোচনা চালিয়ে যাবে।

এদিকে ইরানের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক যুক্তরাষ্ট্রের নতুন নিষেধাজ্ঞার কারণে পরিবর্তন করবে; এমন প্রত্যাশা প্রত্যাখ্যান করেছে চীন। বেইজিং একতরফাভাবে আরোপ করা নিষেধাজ্ঞার বিরোধিতা করে আসছে।

বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশপথ হরমুজ প্রণালি। প্রণালিতে অবাধ জাহাজ চলাচল নিশ্চিত করতে দীর্ঘমেয়াদি কোনো সমঝোতা হলে আন্তর্জাতিক তেলের বাজারে চাপ কমতে পারে।

অন্যদিকে আলোচনায় অচলাবস্থা অব্যাহত থাকলে অঞ্চলটিতে অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা সংকট আরও গভীর হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। উভয় পক্ষই মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে আলোচনায় বসার আগ্রহ দেখালেও যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাব এবং ইরানের ব্যাপক দাবির মধ্যে বড় ধরনের ব্যবধান রয়েছে। ফলে দীর্ঘমেয়াদি একটি সমঝোতায় পৌঁছানো এখনো কঠিন বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সূত্র : গালফ নিউজ

এই বিভাগের আরও সংবাদ