ইতিহাসে প্রথমবার যুক্তরাষ্ট্রের ঋণ ছাড়াল ৪০ ট্রিলিয়ন ডলার


যুক্তরাষ্ট্রের মোট জাতীয় ঋণ ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ৪০ ট্রিলিয়ন ডলার অতিক্রম করল। সরকারি রাজস্বের তুলনায় ক্রমাগত খরচ বেড়ে যাওয়ায় দেশটি বড় ধরনের রাজস্ব সংকটের মুখে পড়ছে বলে আশঙ্কা করছেন অর্থনীতিবিদরা। খবর আল জাজিরার।
ট্রেজারি বিভাগের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭ সালের জানুয়ারিতে ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন প্রথম মেয়াদে মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নেন, তখন মোট ঋণের পরিমাণ ছিল ১৯.৯৫ ট্রিলিয়ন ডলার। গত কয়েক বছরে তা দ্বিগুণে গিয়ে ঠেকেছে।
এই অভূতপূর্ব ঋণ বৃদ্ধির প্রায় এক-তৃতীয়াংশই ঘটেছে ২০২০ সালের মার্চে করোনা মহামারি শুরু হওয়ার পরবর্তী দুই বছরে। মহামারি মোকাবিলায় ট্রাম্প এবং তার উত্তরসূরি জো বাইডেন—উভয়ের প্রশাসনই বিপুল পরিমাণ অর্থ ঋণ নিয়ে খরচ করেছিল।
২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ডোনাল্ড ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের ঋণ বেড়েছে ৩.৮ ট্রিলিয়ন ডলার। ফলে তার দুই মেয়াদ মিলিয়ে এখন পর্যন্ত মোট ঋণ বৃদ্ধির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১১.৬ ট্রিলিয়ন ডলারে।
অন্যদিকে, জো বাইডেনের চার বছরের মেয়াদে ঋণ বেড়েছিল ৮.৪ ট্রিলিয়ন ডলার। মহামারি পরবর্তী পুনরুদ্ধার কার্যক্রমের পাশাপাশি অবকাঠামো খাতে বড় ধরনের বিনিয়োগ এবং ক্লিন এনার্জিসহ ডেমোক্রেটিক পার্টির বিভিন্ন অগ্রাধিকারমূলক প্রকল্পে বড় অঙ্কের সরকারি খরচের কারণে এই ঋণ বৃদ্ধি পায়।
দ্বিদলীয় গবেষণা সংস্থা ‘বাইপার্টিসান পলিসি সেন্টার’-এর প্রধান নির্বাহী মার্গারেট স্পেলিংস সতর্ক করে বলেছেন, ‘আমাদের কেন্দ্রীয় সরকারি কর্মসূচির খরচ আয়ের চেয়ে অনেক বেশি। এ ছাড়া বাজেটের সবচেয়ে বড় বড় খাতগুলোতে খরচ স্বয়ংক্রিয়ভাবে বেড়েই চলেছে। এই বিপুল ঋণ মূল্যস্ফীতি বাড়াচ্ছে এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ বিনিয়োগের সুযোগ নস্যাৎ করছে, যা আমাদের সামগ্রিক অর্থনীতির জন্য হুমকিস্বরূপ।’
৪০ ট্রিলিয়ন ডলারের এই ঋণের ফলে বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিটি নাগরিকের ঘাড়ে আনুমানিক ১ লাখ ১৭ হাজার ডলার এবং পরিবারপ্রতি প্রায় ২ লাখ ৯৭ হাজার ডলারের ঋণ জমেছে। ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা সংস্থা ‘পিটার জি পিটারসন ফাউন্ডেশন’-এর মতে, এই অর্থ চীন, জার্মানি, জাপান, যুক্তরাজ্য এবং ভারতের সম্মিলিত অর্থনীতির সমান।
সদ্য সমাপ্ত জুলাই মাসে মার্কিন ট্রেজারি ৪৩২ বিলিয়ন ডলারের মাসিক বাজেট ঘাটতি রেকর্ড করেছে, যা দেশটির ইতিহাসে চতুর্থ সর্বোচ্চ। মূলত ট্রাম্প প্রশাসন আদালত কর্তৃক বাতিল হওয়া শুল্কের অর্থ ফেরত দেওয়ায় রাজস্ব আয় ঋণাত্মক হয়ে পড়ে। একই সঙ্গে বয়স্কদের সামাজিক নিরাপত্তা ও চিকিৎসা সুবিধার ব্যয় ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে।
রিপাবলিকান পার্টির অভ্যন্তরে থাকা আর্থিক শৃঙ্খলা রক্ষাকারীদের আহ্বান উপেক্ষা করে ট্রাম্প তার দুই মেয়াদেই বড় অঙ্কের সরকারি ব্যয় অব্যাহত রেখেছেন।
অলাভজনক প্রতিষ্ঠান ‘কমিটি ফর আ রেসপন্সিবল ফেডারেল বাজেট’-এর মতে, ট্রাম্প ও বাইডেন দুজনের নীতিগত সিদ্ধান্তই যুক্তরাষ্ট্রের ঋণকে স্বাভাবিক মাত্রার চেয়ে অনেক দূর এগিয়ে নিয়েছে। যেমন—ট্রাম্পের সাম্প্রতিক ‘ওয়ান বিগ বিউটিফুল বিল অ্যাক্ট’-এর কারণে আগামীতে আরও ৪.৭ ট্রিলিয়ন ডলার ঋণ যোগ হতে পারে বলে জানিয়েছে ‘কংগ্রেশনাল বাজেট অফিস’।
যদিও ট্রাম্প সরকারি খরচ কমানোর প্রতিশ্রুতি দিয়ে ‘ডিপার্টমেন্ট অব গভর্নমেন্ট এফিশিয়েন্সি’-কে কেন্দ্রীয় জনবল ছাঁটাইয়ের দায়িত্ব দিয়েছেন, তবে এই কাটছাঁট মূলত ‘ঐচ্ছিক’ খাতে সীমাবদ্ধ, যা পুরো বাজেটের খুবই ক্ষুদ্র অংশ।
বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের বার্ষিক সরকারি খরচ প্রায় ৭ ট্রিলিয়ন ডলার। এর প্রায় ৬০ শতাংশ ব্যয় হয় সামাজিক নিরাপত্তা, মেডিকেয়ার ও বয়স্কদের চিকিৎসার মতো ‘আবশ্যিক’ কর্মসূচিতে। এ ছাড়া ঋণের সুদ মেটাতেই চলে যায় ১.১ ট্রিলিয়ন ডলার। সম্প্রতি ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ঋণের সুদের খরচ প্রতিরক্ষা খাতের ব্যয়কে ছড়িয়ে গেছে এবং সামাজিক নিরাপত্তার পর এটিই এখন মার্কিন বাজেটের দ্বিতীয় বৃহত্তম ব্যয়ের খাত।



