বাংলা সাহিত্যজগৎ নক্ষত্রখচিত, তারকায় পরিপূর্ণ। এত সমৃদ্ধ সাহিত্যজগৎ খুব কম জাতিগোষ্ঠীর রয়েছে। কী নেই বাংলা সাহিত্যজগতে! এই অত্যন্ত সমৃদ্ধ সাহিত্যজগতকে শিশুতোষ সাহিত্যে যাঁরা সমৃদ্ধ করেছেন, কবি সুকুমার রায় তাঁদের মধ্যে অগ্রগণ্য। তাঁর সংক্ষিপ্ত জীবদ্দশায় [১৮৮৭-১৯২৩ খ্রিস্টাব্দ] সুকুমার রায় বাংলা শিশুতোষ সাহিত্যকে এক অনন্য উচ্চতায় দাঁড় করিয়েছেন।
সুকুমার রায়ের পিতা উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরীর ছিলেন বিখ্যাত শিশুসাহিত্যিক ও মুদ্রণবিশেষজ্ঞ। পারিবারিকভাবে সাংস্কৃতিক আবহে বেড়ে উঠেছেন সুকুমার রায়। শৈশব হতেই হাস্যরসের লেখনীতে ছিল তাঁর বিশেষ আগ্রহ। মাত্র আট (৮) বছর বয়সেই তিনি রচনা করেন 'নদী' নামক কবিতা। পড়াশোনা করেছেন প্রেসিডেন্সি কলেজে। এই কলেজে পড়াকালীন সময়ে তৈরি করেন 'ননসেন্স ক্লাব'। ননসেন্স ক্লাবের মুখপত্র ছিল 'সাড়ে-বত্রিশ-ভাজা' নামক পত্রিকা। সুকুমার রায় ছিলেন এই পত্রিকার মূল চালিকা শক্তি। তিনি মজার মজার রসাত্মক প্রবন্ধ, ছড়া, কবিতা লিখতেন এখানে।
প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে পদার্থ ও রসায়ন বিদ্যায় দ্বৈত অনার্স সম্পন্ন করে বাবার আগ্রহে মুদ্রণ শিল্পের ওপর উচ্চতর জ্ঞান লাভের জন্য পাড়ি জমান বিলেতে। বিলেত হতে ১৯১৩ খ্রিস্টাব্দে ফিরে সুকুমার যোগদান করেন বাবার মুদ্রণ ব্যবসায় এবং তৎকালীন ভারতের মুদ্রণ শিল্পকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যান।
উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরীর সম্পাদনা করতেন মাসিক শিশুতোষ পত্রিকা 'সন্দেশ'। সুকুমার রায় নিয়মিত এই পত্রিকাতে মজার মজার গল্প, কবিতা, চমৎকার সব ছড়া লিখতেন, যেগুলো পাঠক মহলে ভীষণ জনপ্রিয়তা পায়। পরবর্তীতে বাবার মৃত্যুর পরে তিনি 'সন্দেশ' পত্রিকায় দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
সুকুমার রায় শুধুমাত্র প্রথাগত শিশুসাহিত্যিক ছিলেন না, তিনি ছিলেন বাংলা সাহিত্যের খেয়াল রসের জনক। তাঁর লেখনীতে প্রচলিত সমাজ ব্যবস্থায় বিদ্যমান ব্যঙ্গ ফুটিয়ে তুলতেন নিখুঁতভাবে। 'একুশে আইন' কবিতার মাধ্যমে তিনি ব্রিটিশ সরকারের দমনমূলক আইনকে তীব্র ব্যঙ্গাত্মক ভাবে উপস্থাপন করেন। এছাড়াও, 'হযবরল' এর আদালতের দৃশ্য ছিল তৎকালীন ব্রিটিশ বিচার ব্যবস্থার প্রতি এক অসাধারণ প্রহসনের লেখনী।
সুকুমার রায়ের সাহিত্য চর্চা শুধুমাত্র কলমেই সীমাবদ্ধ ছিল না। তাঁর তুলিতেও ছিল আশ্চর্য মোহনীয় জাদু। অদ্ভুত সব কাল্পনিক প্রাণী তিনি নিজ হাতে এঁকেছিলেন, যেমন-বকচ্ছপ (বক+ কচ্ছপ), হাঁসজারু (হাঁস+ সজারু) ইত্যাদি। নিজস্ব কল্পনাজাত এরূপ অতিজাগতিক প্রাণীর চিত্র ইতিপূর্বে কোন বাঙালি শিল্পীর তুলিতে ধরা পড়েনি!
সুকুমার রায় ১৯১৫ খ্রিস্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত করেন মন্ডা ক্লাব (Monday Club); প্রতি সোমবার এই ক্লাবে বসত বড় বড় সাহিত্যিকদের আড্ডা। সুকুমার রায় নিয়মিত এই ক্লাবের আড্ডাকে প্রাণবন্ত করতে গুরুগম্ভীর ও রসাত্মক প্রবন্ধ লিখতেন।
সুকুমার রায়ের লেখা 'পাগলা দাশু' বা 'হযবরল' যখন কোন শিশু পড়ে, তখন সে নির্মল আনন্দ খুঁজে পায়, কিন্তু যখন প্রাপ্তবয়স্ক বোদ্ধা ব্যক্তি পড়েন, তিনি এই লেখার মধ্যে এক ভিন্ন জীবনদর্শন খুঁজে পান। তিনি দেখতে পান সুকুমার রায় কীভাবে লেখনীর মাধ্যমে হাস্যরসের সমান্তরালে সমাজে প্রচলিত অসংগতিগুলো নিতান্ত সহজ সরলভাবে অতুলনীয় ভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। শিশুতোষ রচনার মাধ্যমে এমন দ্বিমুখী গভীর তাৎপর্যের লেখনী বিশ্ব সাহিত্যে অনন্য। তত্ত্ব কথায় সমাজচিত্র তথা অন্যায়, অনাচার, কুসংস্কার, কুপ্রথা অসংখ্য সাহিত্যিক হয়তো তুলে ধরেছেন, তবে শিশুসাহিত্যের মধ্য দিয়ে খেয়াল রসেও যে এটা সম্ভব, সেটা বোধকরি সুকুমার রায় ভিন্ন অন্য কেউ এত অনবদ্য ভাবে পারেননি। তাইতো শতবর্ষ পেরিয়েও প্রাসঙ্গিক সুকুমার রায়ের অনন্য সৃষ্টি জগত।
খেয়াল রসের জনক সুকুমার রায়ের জন্মদিনে বিনম্র প্রণাম ও শ্রদ্ধাঞ্জলি।
লেখক
ডক্টর সুদীপ চন্দ্র হালদার
কবি এবং দার্শনিক।
প্রকাশকঃ দেলোয়ার হোসেন, সম্পাদকঃ মোঃ আবদুল ওয়াদুদ II ভিজিট করুন - www.torrongonews.com