আহছানুল আমীন জর্জ, খুলনা ব্যুরো প্রধান : খুলনা জেলার কয়রা ও দাকোপ উপজেলার উপকূলীয় এলাকায় পানিসংকট নিরসন এবং নিরাপদ পানির প্রাপ্যতা নিশ্চিত করতে সরকারি-বেসরকারি সংস্থার মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো, স্থানীয় পানির উৎস পুনরুদ্ধার ও চাহিদাভিত্তিক অবকাঠামো উন্নয়নের তাগিদ দেওয়া হয়েছে।
বুধবার (২৮ অক্টোবর) খুলনা নগরীর একটি অভিজাত হোটেলে জাগ্রত যুব সংঘ (জেজেএস), কনসার্ন ওয়ার্ল্ডওয়াইড ও কোইকার সহযোগিতায় বাস্তবায়নাধীন ইআরসিসি-২ প্রকল্পের আওতায় আয়োজিত এক অ্যাডভোকেসি সভায় এসব সুপারিশ তুলে ধরা হয়।
খুলনা জেলার কয়রা ও দাকোপ উপজেলার ছয়টি ইউনিয়নে প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হচ্ছে। সভায় জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর (ডিপিএইচই), মৎস্য, প্রাণিসম্পদ, কৃষি, সমাজসেবা, মহিলা বিষয়ক, যুব উন্নয়ন, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ এবং সমবায় বিভাগের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। এ ছাড়া স্থানীয় সরকার প্রতিনিধি, বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি ও গণমাধ্যমকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।
সভায় উপকূলীয় এলাকায় পানিসংকট মোকাবিলায় সরকারের গৃহীত উদ্যোগ, বিদ্যমান চ্যালেঞ্জ, স্থানীয় সম্পদের ব্যবহার এবং নিরাপদ পানির প্রাপ্যতা বাড়ানোর উপায় নিয়ে আলোচনা হয়। এতে সরকারি-বেসরকারি সংস্থার মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতি, পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের আগে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অপর্যাপ্ত অংশগ্রহণ এবং স্থানীয় চাহিদার সঙ্গে দাতা সংস্থার শর্তের সমন্বয়হীনতাকে গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।
এ ছাড়া পানির গুণগত মান ও সংশ্লিষ্ট স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে সীমিত গবেষণা, পুকুর ও খালের মতো স্থানীয় পানির উৎসের অপর্যাপ্ত ব্যবহার এবং ইজারা দেওয়া খাল জনসাধারণের ব্যবহারের জন্য উন্মুক্ত করার ক্ষেত্রে বিদ্যমান জটিলতার বিষয়টিও আলোচনায় উঠে আসে।
পানির সংকট মোকাবিলায় প্রকল্পের অগ্রগতি
প্রকল্পের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে কয়রা উপজেলায় ২ হাজার ২১২টি পরিবারের জন্য বৃষ্টির পানি সংরক্ষণব্যবস্থা স্থাপনের লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে ৯৭০টি স্থাপন করা হয়েছে। এতে লক্ষ্যমাত্রার ৪৪ শতাংশ অর্জিত হয়েছে। এ ছাড়া ২২টি পুকুর পুনঃখননের লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে পুনঃখনন করা হয়েছে তিনটি।
কয়রায় অন্যান্য কার্যক্রমের মধ্যে রয়েছে একটি রিভার অসমোসিস ব্যবস্থা স্থাপন, পাইপলাইনের মাধ্যমে পানি সরবরাহের একটি পয়েন্ট স্থাপন, একটি খাল খনন এবং একটি স্লুইসগেট মেরামত।
অন্যদিকে, দাকোপ উপজেলায় ৪ হাজার ২টি পরিবারের জন্য বৃষ্টির পানি সংরক্ষণব্যবস্থা স্থাপনের লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে ১ হাজার ২৮৪টি স্থাপন করা হয়েছে। অর্জনের হার ৩২ শতাংশ। এ ছাড়া ২৭টি পুকুর পুনঃখননের লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে পাঁচটি পুকুর পুনঃখনন, দুটি রিভার অসমোসিস ব্যবস্থা স্থাপন, ছয়টি খাল খনন এবং একটি স্লুইসগেট মেরামত করা হয়েছে।
প্রকল্পের তথ্য অনুযায়ী, ওই সময়ে কয়রা ও দাকোপ—কোনো উপজেলাতেই পিএসএফ (পন্ড স্যান্ড ফিল্টার) মেরামতের লক্ষ্যমাত্রা ছিল না এবং এ ধরনের কোনো কাজও করা হয়নি।
এখনো প্রয়োজন ৭ হাজার ৩৬০টি বৃষ্টির পানি সংরক্ষণব্যবস্থা
প্রকল্পের আওতাধীন ছয়টি ইউনিয়নে ২০২৬-২৭ সালের জন্য চিহ্নিত চাহিদা বলছে, নিরাপদ পানির সংকট মোকাবিলায় আরও বড় পরিসরে বিনিয়োগ প্রয়োজন। পরিবারভিত্তিক বৃষ্টির পানি সংরক্ষণব্যবস্থার চাহিদাই সবচেয়ে বেশি। কয়রায় ৩ হাজার ৫৬০টি এবং দাকোপে ৩ হাজার ৮০০টিসহ মোট ৭ হাজার ৩৬০টি ব্যবস্থা স্থাপন করা প্রয়োজন।
এ ছাড়া ১ হাজার ২০২টি নলকূপ স্থাপন, ৫০টি পুকুর পুনঃখনন, ১৫টি রিভার অসমোসিস ব্যবস্থা স্থাপন, পাইপলাইনে পানি সরবরাহের তিনটি পয়েন্ট স্থাপন, ৩২টি খাল খনন, নয়টি স্লুইসগেট মেরামত এবং আটটি পিএসএফ মেরামতের চাহিদা চিহ্নিত করা হয়েছে।
পুনঃখননের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে এমন ৫০টি পুকুরের মধ্যে কয়রায় ২৪টি এবং দাকোপে ২৬টি। এসব পুকুর পুনরুদ্ধার ও যথাযথ ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি পরিবারভিত্তিক পানি সংরক্ষণব্যবস্থা সম্প্রসারণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
টেকসই পানিব্যবস্থাপনায় একাধিক সুপারিশ
সভায় স্থানীয় পানিসংকটের তীব্রতা বিবেচনায় নিয়ে পানি সরবরাহের ব্যবস্থা ও অবকাঠামো স্থাপনকে অগ্রাধিকার দেওয়ার সুপারিশ করা হয়। একই সঙ্গে সরকারি-বেসরকারি সংস্থার মধ্যে সমন্বয় ও সহযোগিতা বাড়িয়ে কার্যক্রম বাস্তবায়ন এবং বৃষ্টির পানি সংরক্ষণব্যবস্থার পাশাপাশি পানির ফিল্টার ব্যবহারে গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলা হয়।
পানির সরঞ্জামের নিয়মিত মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণে স্থানীয় পানি মিস্ত্রিদের সম্পৃক্ত করা এবং স্থানীয় মিঠাপানির উৎস পুনরুদ্ধারে পুকুর পুনঃখনন ও যথাযথ ব্যবস্থাপনার ওপর জোর দেওয়া হয়।
এ ছাড়া পানির গুণগত মান পরীক্ষায় স্থানীয় পর্যায়ে পরীক্ষার সুবিধা প্রতিষ্ঠা এবং কৃষিকাজের জন্য পর্যাপ্ত মিঠাপানির প্রাপ্যতা নিশ্চিত করার সুপারিশ করা হয়। এসব উদ্যোগ জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা, কৃষি উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি এবং দীর্ঘমেয়াদে পানির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সহায়ক হবে বলে সভায় গুরুত্বারোপ করা হয়।
সভায় কয়রা ও দাকোপের উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর চলমান পানিসংকট মোকাবিলায় সরকারি-বেসরকারি সংস্থার সমন্বিত উদ্যোগ, স্থানীয় পানিসম্পদের যথাযথ ব্যবহার এবং জনগণের চাহিদাভিত্তিক কার্যক্রম বাস্তবায়নের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হয়।
প্রকাশকঃ দেলোয়ার হোসেন, সম্পাদকঃ মোঃ আবদুল ওয়াদুদ II ভিজিট করুন - www.torrongonews.com