দিনাজপুর: দিনাজপুরের বীরগঞ্জে যুগযুগ ধরে চলে আসা আদিবাসী ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠি জাতিসত্তা (সাঁওতাল) দের ঐতিহ্যবাহী মিলনমেলা কোন প্রকার প্রচার প্রচারনা ছাড়াই প্রতি বছর শারদীয় দুর্গাপূজার বিজয়া দশমীর পরের দিন বাসিয়া হাটিতে বসে। ঐতিহ্যবাহী এই মেলার প্রধান আকর্ষণ সাঁওতাল আদিবাসীদের জীবনসঙ্গী খুঁজে নেওয়া। যার কারনে বউমেলা নামেও পরিচিত র্দীঘদিন ধরে। কিন্তু কালের বিবর্তনে আধুনিক যুগের প্রভাবে আদিবাসী সাঁওতাল ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠির সন্তানেরা বড় হচ্ছে, শিক্ষিত হচ্ছে তারই কারনে এখন আর সেই বিয়ে বা জীবনসঙ্গী খুজার প্রথা শুধু নামেই মিডিয়া ও ফেসবুকেই তোলপাড় হচ্ছে।

২৩ অক্টোবর শুক্রবার গোলাপগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে আদবিাসী সমাজ উন্নয়ন সমিতির আয়োজনে এই মেলায় সকাল থেকে প্রচলতি প্রথা অনুযায়ী হাজার হাজার মানুষরে মধ্যে সাঁওতাল তরুণ-তরুণীরা রকমারি সাজে বাড়ির বড়দের সঙ্গে মেলায় আসে। ভিড় বাড়তে থাকলেও মূল মেলা শুরু হয় বিকাল ৩ টার পর হতে সন্ধ্যা পযন্ত। এই মেলায় হাজার হাজার লোকের সমাগম ঘটে। নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলেন বীরগঞ্জ থানা পুলিশের নেতেৃত্বে আনসার ও গ্রামপুলিশ সদস্যরা।
মিলনমেলার আয়োজক কমিটি আদবিাসী সমাজ উন্নয়ন সমিতির সভাপতি যোসেফ হেমরমের সভাপতিত্বে বিকালে আলোচনা সভায় বক্তব্য রাখেন বীরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার সুমা খাতুন, দিনাজপুর জেলা বিএনপি'র উপদেষ্টা, চেম্বার অফ কমার্সের পরিচালক ও আসন্ন উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী রেজওয়ানুল ইসলাম রিজু, পৌর বিএনপির সভাপতি ও পৌর মেয়র প্রার্থী আলহাজ্ব মোঃ আমিরুল বাহার, আয়োজক কমিটির উপদেষ্টা নিজপাড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আনিসুর রহমান আনিস, মোহনপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শাহিনুর রহমান চৌধুরী শাহিন, বীরগঞ্জ উপজেলা আদিবাসী নেতা শীতল মার্ডী।

মেলার আয়োজক কমিটি আদবিাসী সমাজ উন্নয়ন সমিতির সভাপতি জোসেফ হেমরম বলেন, কেউ বলে ২০০ বছরের বেশি, আবার কেউ বলে ‘অনেক দিন ধরে’ এই মেলা চলছে। মেলাটি কবে শুরু কেউ বলতে পারে না। এক সময় জীবনসঙ্গী খুঁজের বউমেলা নাম হলেও কালের বিবর্তনে আধুনিক যুগের প্রভাবে এখন আর সেই বিয়ে বা জীবনসঙ্গী খুজার প্রথা এখানে নেই। যা শুধু মিডিয়া ও ফেসবুকেই সিমাবদ্ধ। ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠির সন্তানেরা শিক্ষিত হচ্ছে, বড় হচ্ছে তারা এখন সামাজিক ভাবেই চলে। তাই দীর্ঘদিন ধরে এই শারদীয় দুর্গাপূজার বিজয়া দশমীর পরের দিনটিতে আমরা দুরদুরান্তের আত্মিয় স্বজনদের সাথে মিলিত হয়ে আনন্দ ভাগাভাগী করে মিলনমেলায় রুপ দিয়েছি।
সরজমিনে গিয়ে দেখা যায়, আদিবাসী জনগোষ্ঠীর বিভিন্ন বয়সের মানুষের পাশাপাশি মেলায় হিন্দু ও মুসলিম সহ বিভিন্ন র্ধম ও বর্ণের মানুষের অংশগ্রহনে মেলা হয়ে উঠে প্রানবন্ত। ব্যাপক উৎসাহ উদ্দীপনায় উৎসব মুখর পরিবেশে অনুষ্ঠিত ব্যতিক্রম ধর্মী এই মেলা ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর সব বয়সী নারী-পুরুষের ভিড় ও ঠেলাঠেলি ছিল চোখে পড়ার মতো। বাহারি সব কাঁচরে চুরি, রঙনি ফিতা, লিপিষ্টিক, কানের দুল, ঝিনুকের মালা, মাটির তৈরী খেলনা, গৃহস্তালির কাজে ব্যবহৃত দা, কুড়াল, হাড়ি, পাতিল সহ বিভিন্ন খাবারের দোকান নিয়ে দুর দুরান্ত হতে আসা দোকানিরা ব্যস্ত তাদের দোকানের মালামাল বিক্রয় করা নিয়ে। চলতে থাকে বাজনার তালে তালে ঐতিহ্যবাহী নাচ ও গানের আসর। নজর কাড়ে সাঁওতাল তরুণীরা বাহারি ফুলের সাজে সেজেছে। নিজেকে মেলে ধরেছেন রঙিন পোশাকে।
আয়োজক কমিটির উপদেষ্টা নিজপাড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আনিসুর রহমান আনিস বলেন, আগে কঠিন সামাজিক বিধিবিধান থাকলেও বর্তমানে অনেকেই রাষ্ট্রীয় নিয়মনীতি মেনে বিয়ে করছেন। রটনা থাকলেও এখন আর আগের মত কোন ঘটনা ঘটে না। মেলা উপলক্ষে চলে সংস্কৃতি অনুষ্ঠান ও আদিবাসীদের আনন্দ মেলা যা মিলন মেলায় রূপান্তরিত।
বীরগঞ্জ উপজেলা আদিবাসী নেতা শীতল মার্ডী জানান, এক সময় এই মেলার নাম ছিলো বউ মেলা। এখন এ মেলা আদিবাসীদের মিলন মেলা নামে পরিচিত। র্পূব পুরুষেরা এই মেলা শুরু করেন। আমরা তার ধারাবাহিকতা রক্ষা করে যাচ্ছি। তবে কবে থেকে এ মেলার প্রচলন শুরু হয়েছে সেটা সঠিক ভাবে বলা যাবে না। বাপ-দাদার কাছে শুনেছি যুগ যুগ ধরে এ মেলা আপনা আপনি চলছে। আমরা শুধু আনুষ্ঠানিকতা চালিয়ে যাচ্ছি বাপ দাদার পথ ধরে।
প্রকাশকঃ দেলোয়ার হোসেন, সম্পাদকঃ মোঃ আবদুল ওয়াদুদ II ভিজিট করুন - www.torrongonews.com