প্রবাসী পুঁজি, বৈশ্বিক অভিজ্ঞতা ও দেশীয় উদ্ভাবনের সমন্বয়েই গড়ে উঠতে পারে আগামীর বাংলাদেশ বাংলাদেশের অর্থনীতির ভবিষ্যৎ কেবল তৈরি পোশাকশিল্প, প্রবাসী আয় কিংবা প্রচলিত ব্যবসার ওপর নির্ভরশীল থাকতে পারে না।
অর্থনীতিকে আরও গতিশীল, উদ্ভাবননির্ভর ও আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় সক্ষম করে তুলতে প্রয়োজন নতুন শিল্পের বিকাশ, প্রযুক্তির ব্যবহার, তরুণ উদ্যোক্তাদের উত্থান এবং কর্মসংস্থানের নতুন ক্ষেত্র তৈরি। আর এই পরিবর্তনের অন্যতম চালিকাশক্তি হতে পারে বাংলাদেশের স্টার্টআপ ইন্ডাস্ট্রি। তবে সম্ভাবনাময় এই খাতের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হলো পর্যাপ্ত ও দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের অভাব। এই বাস্তবতায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বসবাসরত বাংলাদেশি প্রবাসী কমিউনিয়ার বিনিয়োগ বাংলাদেশের উদ্যোক্তা অর্থনীতির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিতে পারে।
বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা বাংলাদেশিরা নিজেদের মেধা, শ্রম ও দক্ষতার মাধ্যমে প্রযুক্তি, ব্যাংকিং, ফিন্যান্স, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, উৎপাদনশিল্প এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন। তাঁদের অনেকে সফল উদ্যোক্তা, বিনিয়োগকারী, করপোরেট নির্বাহী কিংবা উচ্চদক্ষ পেশাজীবী। তাঁরা আন্তর্জাতিক ব্যবসার পরিবেশ সম্পর্কে জানেন, বৈশ্বিক বাজারের চাহিদা বোঝেন এবং উন্নত ব্যবস্থাপনা ও প্রযুক্তির সঙ্গে পরিচিত। অন্যদিকে বাংলাদেশে রয়েছে বিশাল তরুণ জনগোষ্ঠী, ক্রমবর্ধমান ডিজিটাল বাজার, নতুন সমস্যা সমাধানের অসংখ্য সুযোগ এবং উদ্যোক্তা হওয়ার আগ্রহ। এই দুই শক্তিকে কার্যকরভাবে একত্র করতে পারলে বাংলাদেশের স্টার্টআপ ইন্ডাস্ট্রি নতুন উচ্চতায় পৌঁছানোর সুযোগ পেতে পারে।
প্রশ্ন হলো, কেন প্রবাসী বাংলাদেশিদের বিনিয়োগ প্রয়োজন? এটি কি কেবল অর্থের সংকট মোকাবিলার একটি উপায়, নাকি এর মাধ্যমে আরও বড় অর্থনৈতিক পরিবর্তনের ভিত্তি তৈরি সম্ভব? বাস্তবতা হলো, প্রবাসী বিনিয়োগের সম্ভাবনা কেবল মূলধন সরবরাহে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে যুক্ত হতে পারে আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা, ব্যবসায়িক নেটওয়ার্ক, প্রযুক্তিগত দক্ষতা, বাজার সম্প্রসারণ এবং বাংলাদেশের অর্থনীতির দীর্ঘমেয়াদি সক্ষমতা বৃদ্ধির সুযোগ।
রেমিট্যান্স থেকে বিনিয়োগমুখী অর্থনীতির পথে
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্সের গুরুত্ব অপরিসীম। লাখ লাখ প্রবাসী বাংলাদেশির পরিশ্রমে অর্জিত অর্থ দেশের পরিবারগুলোর জীবনযাত্রা, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, আবাসন ও অন্যান্য প্রয়োজন পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বৈদেশিক মুদ্রার সরবরাহেও এর অবদান রয়েছে। কিন্তু প্রবাসী বাংলাদেশিদের অর্থনৈতিক অবদানকে শুধু রেমিট্যান্সের প্রচলিত ধারণার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে তাঁদের সম্ভাব্য ভূমিকার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ অনাবিষ্কৃত থেকে যায়।
রেমিট্যান্স এবং স্টার্টআপ বিনিয়োগ অবশ্যই আলাদা বিষয়। রেমিট্যান্স সাধারণত পরিবারের আর্থিক প্রয়োজন পূরণের জন্য পাঠানো হয়, আর স্টার্টআপ বিনিয়োগ হলো ঝুঁকি বিবেচনায় নিয়ে কোনো ব্যবসার প্রবৃদ্ধি ও সম্ভাব্য আর্থিক মুনাফার উদ্দেশ্যে মূলধন বিনিয়োগ করা। তাই প্রবাসী আয়ের অর্থকে নির্বিচারে বিনিয়োগে উৎসাহিত করা সমাধান নয়। বরং যাঁদের বিনিয়োগের সক্ষমতা, আগ্রহ ও ঝুঁকি গ্রহণের প্রস্তুতি রয়েছে, তাঁদের জন্য স্বচ্ছ, আইনসম্মত ও বিশ্বাসযোগ্য বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি করাই হওয়া উচিত লক্ষ্য।
একটি সম্ভাবনাময় স্টার্টআপে বিনিয়োগ নতুন পণ্য বা সেবা তৈরি, প্রযুক্তি উন্নয়ন, দক্ষ জনবল নিয়োগ, বাজার সম্প্রসারণ এবং নতুন ব্যবসায়িক অংশীদারত্ব তৈরিতে ভূমিকা রাখতে পারে। এর ফলে অর্থ কেবল তাৎক্ষণিক ব্যয়ে ব্যবহৃত হওয়ার পরিবর্তে উৎপাদনশীল অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হওয়ার সুযোগ পায়। একটি সফল ব্যবসা পরবর্তী সময়ে আয়, কর্মসংস্থান, কর রাজস্ব এবং নতুন বিনিয়োগের ক্ষেত্রও তৈরি করতে পারে।
তবে প্রতিটি স্টার্টআপ সফল হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। তাই প্রবাসী বিনিয়োগের লক্ষ্য হওয়া উচিত আবেগের ভিত্তিতে অর্থ পাঠানো নয়; বরং যথাযথ যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে সম্ভাবনাময় উদ্যোগে দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারত্ব গড়ে তোলা।
বাংলাদেশের স্টার্টআপের বড় বাধা অর্থায়নের সীমাবদ্ধতা
একজন উদ্যোক্তার কাছে একটি ভালো ধারণা থাকতে পারে, বাজারের বাস্তব সমস্যা সমাধানের সক্ষমতা থাকতে পারে, এমনকি পণ্য বা সেবার প্রাথমিক সংস্করণও তৈরি থাকতে পারে। কিন্তু ব্যবসাটিকে পরবর্তী পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য প্রয়োজন অর্থ। পণ্য উন্নয়ন, প্রযুক্তি অবকাঠামো, বিপণন, গ্রাহক সংগ্রহ, দক্ষ কর্মী নিয়োগ এবং পরিচালন ব্যয় মেটাতে ধারাবাহিক বিনিয়োগ দরকার হয়।
প্রচলিত ব্যাংকঋণ অনেক ব্যবসার জন্য কার্যকর অর্থায়নের উৎস হলেও প্রাথমিক পর্যায়ের স্টার্টআপের ক্ষেত্রে জামানত, প্রতিষ্ঠানের আর্থিক ইতিহাস, নিয়মিত নগদ প্রবাহ এবং অন্যান্য শর্ত পূরণ করা কঠিন হতে পারে। কারণ একটি স্টার্টআপের মূল্য সব সময় তার স্থাবর সম্পদ দিয়ে নির্ধারিত হয় না। তার মূল্য নির্ভর করতে পারে প্রযুক্তি, মেধাসম্পদ, গ্রাহকভিত্তি, ব্যবসায়িক মডেল, বাজারের সম্ভাবনা এবং ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধির ওপর।
অন্যদিকে, স্থানীয় বিনিয়োগকারীদের সক্ষমতা ও বিনিয়োগের আগ্রহ সব সময় উদ্যোক্তাদের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে। বিশেষ করে প্রাথমিক পর্যায়ের উদ্যোগগুলোকে অর্থায়ন করা তুলনামূলকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ। ফলে অনেক উদ্যোক্তা ব্যবসার সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও প্রয়োজনীয় মূলধন সংগ্রহ করতে পারেন না।
এই জায়গায় প্রবাসী বাংলাদেশি বিনিয়োগকারীরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন। তাঁরা ব্যক্তিগতভাবে বিনিয়োগ করতে পারেন, স্থানীয় বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে যৌথভাবে অর্থায়ন করতে পারেন, কিংবা পেশাদার বিনিয়োগ তহবিল গঠনে অংশ নিতে পারেন। এর মাধ্যমে উদ্যোক্তারা একক উৎসের ওপর নির্ভরশীল না থেকে অর্থায়নের বিকল্প ব্যবস্থা পাবেন।
বিশেষ করে যেসব স্টার্টআপের পণ্য ইতিমধ্যে বাজারে যাচাই করা হয়েছে, গ্রাহক রয়েছে এবং ব্যবসা সম্প্রসারণের বাস্তব পরিকল্পনা আছে, সেগুলোর জন্য প্রবাসী বিনিয়োগ নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে।
প্রবাসী বিনিয়োগের সঙ্গে আসতে পারে বৈশ্বিক জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা
প্রবাসী বাংলাদেশিদের বিনিয়োগের প্রকৃত শক্তি শুধু তাঁদের অর্থনৈতিক সামর্থ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তাঁদের আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা ও পেশাগত নেটওয়ার্কও বাংলাদেশের উদ্যোক্তাদের জন্য মূল্যবান সম্পদ হতে পারে।
ধরা যাক, যুক্তরাষ্ট্রে কর্মরত একজন বাংলাদেশি প্রযুক্তিবিদ দেশের একটি সফটওয়্যার বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক স্টার্টআপে বিনিয়োগ করলেন। তিনি শুধু মূলধন সরবরাহ করেই দায়িত্ব শেষ না করে প্রযুক্তির মান উন্নয়ন, আন্তর্জাতিক গ্রাহকের চাহিদা বোঝা এবং বিদেশি বাজারে প্রবেশের কৌশল তৈরিতে সহায়তা করতে পারেন। ইউরোপে কর্মরত কোনো ফিন্যান্স বিশেষজ্ঞ একটি স্টার্টআপকে আর্থিক পরিকল্পনা, বিনিয়োগকারীদের সামনে ব্যবসা উপস্থাপন এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠায় সহায়তা করতে পারেন।
একইভাবে মধ্যপ্রাচ্যে ব্যবসা পরিচালনাকারী কোনো প্রবাসী উদ্যোক্তা বাংলাদেশের খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, কৃষিপণ্য, লজিস্টিকস কিংবা ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের জন্য নতুন বাজার ও বাণিজ্যিক অংশীদার খুঁজে দিতে পারেন। স্বাস্থ্যসেবায় অভিজ্ঞ প্রবাসী বাংলাদেশিরা দেশের স্বাস্থ্যপ্রযুক্তি উদ্যোগগুলোকে আন্তর্জাতিক মান, রোগীর প্রয়োজন এবং প্রযুক্তির কার্যকর ব্যবহার সম্পর্কে দিকনির্দেশনা দিতে পারেন।
অর্থাৎ, প্রবাসী বিনিয়োগের সঙ্গে যদি মেন্টরশিপ, প্রযুক্তিগত সহযোগিতা, বাজারসংযোগ এবং ব্যবস্থাপনাগত সহায়তা যুক্ত করা যায়, তাহলে এর প্রভাব অনেক বেশি হতে পারে। একটি স্টার্টআপ শুধু অর্থের অভাবে থেমে যায় না; কখনো কখনো সঠিক সিদ্ধান্ত, দক্ষ ব্যবস্থাপনা, বাজার সম্পর্কে জ্ঞান কিংবা অভিজ্ঞ পরামর্শের অভাবেও ব্যর্থ হয়। প্রবাসী বিনিয়োগকারীরা এসব ক্ষেত্রেও কার্যকর অংশীদার হতে পারেন।
তরুণ উদ্যোক্তা, কর্মসংস্থান ও নতুন অর্থনীতির সম্ভাবনা
বাংলাদেশের তরুণ জনগোষ্ঠী দেশের অন্যতম বড় সম্পদ। এই জনগোষ্ঠীকে উৎপাদনশীল অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত করতে হলে প্রচলিত চাকরির বাজারের পাশাপাশি নতুন শিল্প ও উদ্যোক্তা তৈরির পরিবেশ গড়ে তুলতে হবে। স্টার্টআপ ইন্ডাস্ট্রি সেই সুযোগ তৈরি করতে পারে।
একটি শিক্ষা প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান শিক্ষার্থীদের দক্ষতা উন্নয়নে কাজ করতে পারে। একটি কৃষিপ্রযুক্তি উদ্যোগ কৃষককে বাজারের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত করতে পারে। একটি ডিজিটাল স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান প্রত্যন্ত অঞ্চলে সেবা পৌঁছে দিতে পারে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসার জন্য তৈরি কোনো প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান তাদের হিসাবরক্ষণ, বিক্রয়, সরবরাহব্যবস্থা ও গ্রাহক ব্যবস্থাপনাকে আরও কার্যকর করতে পারে।
এ ধরনের উদ্যোগের বিকাশে বিনিয়োগ যুক্ত হলে শুধু প্রতিষ্ঠাতার ব্যবসাই বড় হয় না; সংশ্লিষ্ট খাতের অন্যান্য ব্যবসা ও কর্মসংস্থানের সুযোগও বাড়তে পারে। প্রযুক্তি, বিপণন, ডিজাইন, ডেটা বিশ্লেষণ, গ্রাহকসেবা, ব্যবস্থাপনা এবং বিক্রয়—বিভিন্ন ক্ষেত্রে দক্ষ কর্মীর চাহিদা তৈরি হয়।
তবে স্টার্টআপ মানেই নিশ্চিত কর্মসংস্থান বা সফলতা নয়। বরং টেকসই ব্যবসায়িক মডেল, বাস্তব বাজারচাহিদা এবং দক্ষ পরিচালনার সমন্বয় ঘটলেই একটি উদ্যোগ দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক অবদান রাখতে পারে। প্রবাসী বিনিয়োগ তাই এমন উদ্যোগে উৎসাহিত হওয়া উচিত, যেগুলো বাস্তব সমস্যা সমাধান করে এবং আর্থিকভাবে টেকসই হওয়ার সম্ভাবনা রাখে।
কোন খাতে বিনিয়োগ বাংলাদেশের জন্য বেশি কার্যকর হতে পারে?
বাংলাদেশের বাস্তবতা বিবেচনায় কৃষি ও খাদ্যপ্রযুক্তি, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়ন, আর্থিক প্রযুক্তি, লজিস্টিকস, জলবায়ু প্রযুক্তি, উৎপাদনশিল্পের ডিজিটাল রূপান্তর এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য প্রযুক্তিনির্ভর সেবায় বিনিয়োগের সুযোগ রয়েছে।
কৃষিতে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, পণ্য সংরক্ষণ, অপচয় কমানো এবং কৃষকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো সম্ভব। শিক্ষা খাতে শিল্পের চাহিদা অনুযায়ী দক্ষতা উন্নয়ন, কর্মমুখী প্রশিক্ষণ এবং শিক্ষার্থী ও নিয়োগদাতাদের মধ্যে সংযোগ তৈরির উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। স্বাস্থ্য খাতে ডিজিটাল সেবা, হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা ও রোগনির্ণয় সহায়ক প্রযুক্তি মানুষের সেবাপ্রাপ্তি সহজ করতে পারে।
এ ছাড়া বাংলাদেশের ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য ডিজিটাল হিসাবরক্ষণ, অনলাইন বিক্রয়, ইনভেন্টরি ব্যবস্থাপনা এবং বাজারসংযোগের সেবা তৈরি করা গেলে অর্থনীতির একটি বড় অংশ আরও উৎপাদনশীল হতে পারে।
এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত জনপ্রিয় প্রযুক্তি কিংবা আলোচিত খাতের ওপর ভিত্তি করে নেওয়া যাবে না। দেখতে হবে, উদ্যোগটি কোন সমস্যা সমাধান করছে, গ্রাহক তার জন্য অর্থ দিতে প্রস্তুত কি না, ব্যবসাটি কীভাবে আয় করবে এবং ভবিষ্যতে কীভাবে সম্প্রসারিত হবে।
প্রয়োজন প্রবাসী বিনিয়োগের জন্য বিশ্বাসযোগ্য কাঠামো
প্রবাসী বাংলাদেশিদের বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে হলে শুধু আহ্বান জানানো যথেষ্ট নয়। তাঁদের জন্য এমন একটি ব্যবস্থা তৈরি করতে হবে, যেখানে তাঁরা নির্ভরযোগ্য তথ্য পাবেন, বিনিয়োগের ঝুঁকি বুঝতে পারবেন এবং নিজেদের অর্থের ব্যবহার সম্পর্কে নিয়মিত জানতে পারবেন।
এ জন্য সরকারি সংস্থা, ব্যাংক, ভেঞ্চার ক্যাপিটাল প্রতিষ্ঠান, স্টার্টআপ অ্যাক্সিলারেটর, বিশ্ববিদ্যালয়, উদ্যোক্তা সংগঠন এবং প্রবাসী পেশাজীবীদের সংগঠন একসঙ্গে কাজ করতে পারে।
একটি পেশাদার বিনিয়োগ প্ল্যাটফর্মে যাচাইকৃত স্টার্টআপগুলোর ব্যবসায়িক পরিকল্পনা, প্রতিষ্ঠাতাদের অভিজ্ঞতা, আর্থিক তথ্য, বাজারের সম্ভাবনা, বিনিয়োগের শর্ত এবং ঝুঁকি তুলে ধরা যেতে পারে।
প্রবাসী বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে উদ্যোক্তাদের পরিচয় করিয়ে দিতে নিয়মিত স্টার্টআপ ডেমো ডে, বিনিয়োগ সম্মেলন এবং খাতভিত্তিক নেটওয়ার্কিং আয়োজন করা যেতে পারে। বিদেশে বাংলাদেশি পেশাজীবীদের সংগঠনগুলো নিজ নিজ অভিজ্ঞতা ও নেটওয়ার্ক কাজে লাগিয়ে এ ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে পারে।
একই সঙ্গে বিনিয়োগের অর্থ কীভাবে দেশে আসবে, শেয়ার মালিকানা কীভাবে নির্ধারিত হবে, কর ও বৈদেশিক মুদ্রাসংক্রান্ত নিয়ম কী, মুনাফা বা অর্থ ফেরত নেওয়ার ক্ষেত্রে কী বিধান প্রযোজ্য—এসব বিষয়ে স্পষ্ট নির্দেশনা প্রয়োজন। বাংলাদেশে প্রযোজ্য আইন ও নিয়ন্ত্রক কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে প্রক্রিয়াগুলো যত সহজ, স্বচ্ছ ও পূর্বানুমানযোগ্য করা যাবে, বিনিয়োগকারীদের আস্থা অর্জন তত সহজ হবে।
আস্থার ভিত্তি হোক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি
প্রবাসী বিনিয়োগের ক্ষেত্রে আস্থার প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিদেশে বসবাসরত একজন বিনিয়োগকারী জানতে চাইবেন, তাঁর অর্থ কোথায় ব্যয় হচ্ছে, ব্যবসার প্রকৃত অবস্থা কী এবং প্রতিষ্ঠানের সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া কতটা স্বচ্ছ।
তাই স্টার্টআপের নিবন্ধন, শেয়ার মালিকানা, আর্থিক হিসাব, করসংক্রান্ত নথি, চুক্তিপত্র এবং পরিচালনা কাঠামো যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা প্রয়োজন। বিনিয়োগের অর্থ নির্ধারিত উদ্দেশ্যে ব্যবহার হচ্ছে কি না, তারও নিয়মিত প্রতিবেদন দিতে হবে। প্রতিষ্ঠাতা ও বিনিয়োগকারীর অধিকার, নতুন বিনিয়োগের শর্ত, শেয়ার হস্তান্তর, ব্যবসা বিক্রি এবং সম্ভাব্য বিরোধ নিষ্পত্তির নিয়ম আগেই নির্ধারণ করা উচিত।
একইভাবে উদ্যোক্তাদেরও বিনিয়োগকারীর কাছে অতিরঞ্জিত মুনাফার প্রতিশ্রুতি দেওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে। স্টার্টআপ বিনিয়োগে ঝুঁকি রয়েছে, এবং কিছু উদ্যোগ ব্যর্থও হতে পারে। দায়িত্বশীল বিনিয়োগব্যবস্থার লক্ষ্য হবে সেই ঝুঁকি গোপন করা নয়; বরং যথাযথ যাচাই, তথ্যের স্বচ্ছতা এবং পেশাদার ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে তা বোঝা ও নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা।
স্থানীয় ও প্রবাসী বিনিয়োগকারীদের যৌথ শক্তি
প্রবাসী বিনিয়োগকে স্থানীয় বিনিয়োগের বিকল্প হিসেবে নয়, বরং পরিপূরক শক্তি হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন। স্থানীয় বিনিয়োগকারীরা বাংলাদেশের বাজার, গ্রাহকের আচরণ এবং মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা সম্পর্কে ধারণা দিতে পারেন। অন্যদিকে প্রবাসী বিনিয়োগকারীরা আন্তর্জাতিক বাজার, প্রযুক্তি, ব্যবস্থাপনা এবং বৈশ্বিক ব্যবসায়িক যোগাযোগে বাড়তি সুবিধা এনে দিতে পারেন।
এই দুই পক্ষ একসঙ্গে বিনিয়োগ করলে উদ্যোক্তারা অর্থের পাশাপাশি দেশীয় বাস্তবতা ও আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতার সমন্বয় পেতে পারেন। যৌথ বিনিয়োগ তহবিল, কো-ইনভেস্টমেন্ট ব্যবস্থা এবং খাতভিত্তিক বিনিয়োগ অংশীদারত্বের মাধ্যমে এই সহযোগিতা আরও কার্যকর করা সম্ভব।
এমন একটি কাঠামো গড়ে উঠলে প্রবাসী বিনিয়োগকারীরা শুধু অর্থ সরবরাহকারী হিসেবে নয়, বরং বাংলাদেশের উদ্ভাবনী অর্থনীতির দীর্ঘমেয়াদি অংশীদার হিসেবেও যুক্ত হতে পারবেন।
আসুন, প্রবাসের সাফল্যকে বাংলাদেশের উদ্যোক্তা বিপ্লবের শক্তিতে রূপান্তর করি
আমি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে থাকা বাংলাদেশি উদ্যোক্তা, বিনিয়োগকারী, প্রযুক্তিবিদ, করপোরেট নেতৃত্ব এবং সফল পেশাজীবীদের প্রতি একটি আন্তরিক ও দৃঢ় আহ্বান জানাতে চাই—আসুন, বাংলাদেশের স্টার্টআপ ইন্ডাস্ট্রির পাশে দাঁড়াই।
আপনারা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নিজেদের মেধা, পরিশ্রম ও যোগ্যতা দিয়ে যে অবস্থান তৈরি করেছেন, সেই অভিজ্ঞতা ও সাফল্যের একটি অংশ বাংলাদেশের সম্ভাবনাময় উদ্যোক্তাদের বিকাশে কাজে লাগানোর সময় এসেছে। আমাদের দেশে এমন অসংখ্য তরুণ রয়েছেন, যাঁদের কাছে রয়েছে উদ্ভাবনী চিন্তা, সমস্যা সমাধানের সাহস এবং নতুন কিছু গড়ে তোলার অদম্য আকাঙ্ক্ষা। কিন্তু সঠিক সময়ে সামান্য পুঁজি, অভিজ্ঞ পরামর্শ, একটি কার্যকর নেটওয়ার্ক কিংবা একজন আস্থাশীল বিনিয়োগকারীর অভাবে তাঁদের অনেক সম্ভাবনাই বাস্তবে রূপ নিতে পারে না।
আমরা চাই না, বাংলাদেশের মেধাবী তরুণেরা শুধু সুযোগের অভাবে তাঁদের স্বপ্ন বিসর্জন দিন। আমরা চাই, তাঁরা বাংলাদেশ থেকেই বিশ্বমানের প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলুন, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করুন, আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশ করুন এবং দেশের অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী করে তুলুন।
এ জন্য আপনাদের সবার বিনিয়োগকারী হওয়া প্রয়োজন নেই। কেউ বিনিয়োগ করতে পারেন, কেউ মেন্টর হতে পারেন, কেউ আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের দরজা খুলে দিতে পারেন, কেউ প্রযুক্তিগত সহযোগিতা দিতে পারেন, আবার কেউ সম্ভাবনাময় উদ্যোক্তাদের সঙ্গে উপযুক্ত বিনিয়োগকারীদের পরিচয় করিয়ে দিতে পারেন। প্রত্যেকের সামর্থ্য ও অভিজ্ঞতা অনুযায়ী অংশগ্রহণের সুযোগ রয়েছে।
আমাদের আহ্বান আবেগের বশে অর্থ বিনিয়োগের নয়; বরং যাচাই-বাছাই, স্বচ্ছতা, পেশাদারিত্ব ও পারস্পরিক আস্থার ভিত্তিতে একটি শক্তিশালী স্টার্টআপ বিনিয়োগব্যবস্থা গড়ে তোলার। আমরা চাই, প্রবাসী বাংলাদেশিরা শুধু দেশের অর্থনীতিতে অর্থ পাঠানোর অংশীদার হিসেবেই নয়, বরং দেশের ভবিষ্যৎ শিল্প, উদ্ভাবন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিরও অংশীদার হয়ে উঠুন।
আমাদের বিশ্বাস, প্রবাসের অভিজ্ঞতা, বিনিয়োগ ও বৈশ্বিক নেটওয়ার্কের সঙ্গে বাংলাদেশের তরুণদের মেধা ও উদ্ভাবনী শক্তির সমন্বয় ঘটাতে পারলে আমরা এমন একটি উদ্যোক্তা পরিবেশ গড়ে তুলতে পারব, যেখানে বাংলাদেশ শুধু বিদেশি প্রযুক্তি ও পণ্যের বাজার হবে না; বরং নিজস্ব উদ্ভাবন, প্রযুক্তি ও উদ্যোগ নিয়ে বিশ্ববাজারেও প্রতিযোগিতা করবে।
আসুন, আমরা বিচ্ছিন্ন উদ্যোগের পরিবর্তে একটি সম্মিলিত আন্দোলন গড়ে তুলি—যেখানে প্রবাসী বিনিয়োগকারীরা হবেন বাংলাদেশের উদ্যোক্তাদের অংশীদার, তরুণেরা হবেন নতুন অর্থনীতির নির্মাতা, আর স্টার্টআপ হবে কর্মসংস্থান, উদ্ভাবন ও সমৃদ্ধির অন্যতম চালিকাশক্তি।
বাংলাদেশ আমাদের শিকড়। এই দেশের তরুণদের সম্ভাবনা আমাদের সম্মিলিত সম্পদ। সেই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার দায়িত্বও আমাদের সবার। এখনই সময় বাংলাদেশের স্টার্টআপে বিনিয়োগ করার, বাংলাদেশের উদ্যোক্তাদের বিশ্বাস করার এবং বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্মাণে সক্রিয় অংশীদার হওয়ার।
লেখকঃ সহকারী অধ্যাপক, সোনারগাঁও বিশ্ববিদ্যালয়। সিইও, লিড নেশন একাডেমী। পরামর্শক, ট্রান্সফোটেক একাডেমী।
প্রকাশকঃ দেলোয়ার হোসেন, সম্পাদকঃ মোঃ আবদুল ওয়াদুদ II ভিজিট করুন - www.torrongonews.com