যুক্তরাষ্ট্রের টেনেসি অঙ্গরাজ্যে প্রাণঘাতী ইনজেকশন প্রয়োগ করেও দণ্ডিত খুনি ক্রিস্টা পাইকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা যায়নি। এবার প্রকাশ্যে এসেছে সেই ব্যর্থ চেষ্টার পর কারাগারের কর্মী ও জরুরি সেবার কর্মকর্তাদের মধ্যে তৈরি হওয়া বিভ্রান্তির চাঞ্চল্যকর তথ্য। জরুরি ফোনালাপের রেকর্ডে দেখা গেছে, প্রথমে কারাগার থেকে অ্যাম্বুলেন্স চেয়ে করা ফোনটিকে ভুয়া বলে সন্দেহ করেছিলেন জরুরি সেবার কর্মীরা। পরে ফোনটির সত্যতা নিশ্চিত হওয়ার পরই উদ্ধারকর্মীদের কারাগারে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়।
প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ৫০ বছর বয়সী পাইক ১৯৯৫ সালে তৎকালীন প্রেমিক টাডারিল শিপের সঙ্গে মিলে কলিন স্লেমারকে হত্যা করেছিলেন। গত ৩০ সেপ্টেম্বর তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের জন্য প্রাণঘাতী ইনজেকশন প্রয়োগ করা হয়। তাকে দুই দফায় ইনজেকশন দেওয়া হলেও মৃত্যু না হওয়ায় শেষ পর্যন্ত হাসপাতালে নিতে হয়।
বার্তা সংস্থা এপি প্রথম জরুরি ফোনালাপের অডিও সংগ্রহ করে। পরে যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদমাধ্যমগুলো ফোনালাপের রেকর্ড ও প্রতিলিপি বিশ্লেষণ করে ওই রাতের ঘটনাপ্রবাহ তুলে ধরে। সংবাদমাধ্যম ন্যাশভিল ব্যানার ফোনালাপের নথিগুলো সম্পূর্ণ প্রকাশ করেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, স্থানীয় সময় রাত ৮টা ৪০ মিনিটে রিভারবেন্ড কারাগার থেকে প্রথম ফোনটি করা হয়। ফোনকারী নির্দিষ্ট কোড ব্যবহার করে নিজের পরিচয় নিশ্চিত করতে না পারায় জরুরি সেবার কর্মীরা প্রথমে সেটিকে ভুয়া বলে মনে করেন। অথচ ফোনকারী জানিয়েছিলেন, মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের জন্য ওষুধ প্রয়োগ করা হলেও ওই ব্যক্তির মৃত্যু হয়নি এবং অ্যাম্বুলেন্স প্রয়োজন।
পরে রাত ৯টা ৭ মিনিটে কারাগারের কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণকক্ষের কর্মীরা জানান, জরুরি সেবায় ফোন করার দায়িত্ব তাদেরই ছিল, কিন্তু তারা ওই ফোন করেননি। প্রায় আধা ঘণ্টা পর, রাত ৯টা ১১ মিনিটে কারা কর্তৃপক্ষ প্রথম ফোনটির সত্যতা নিশ্চিত করে। এরপর জরুরি সেবার কর্মীদের কারাগারে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়।
রাত ৯টা ৩৪ মিনিটে পাইককে হাসপাতালে নেওয়ার সময় এক চিকিৎসাকর্মী তার সহকর্মীকে কারা কর্তৃপক্ষকে গন্তব্যের বিষয়টি জানাতে বলেন। এতক্ষণে ঘটে যাওয়া বিভ্রান্তির কারণে বিষয়টি নিশ্চিত করা জরুরি বলে উল্লেখ করেন তিনি।
এই সমন্বয়হীনতার কারণে পাইকের চিকিৎসা পেতে দেরি হয়ে থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে বিবিসি টেনেসির সংশোধন বিভাগের সঙ্গে যোগাযোগ করলেও বিভাগটি এখনো মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার কারণ জানায়নি।
পাইকের আইনজীবীদের দাবি, তাকে দেওয়া পেন্টোবারবিটাল নামের রাসায়নিকটি পর্যাপ্ত পরিমাণে রক্তপ্রবাহে পৌঁছানোর বদলে সম্ভবত ত্বকের নিচে ছড়িয়ে পড়েছিল। তবে এ ব্যাখ্যার বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানা যায়নি।
হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পেয়েছেন পাইক। তার আইনজীবীরা জানিয়েছেন, তিনি আবার হাঁটতে ও কথা বলতে পারছেন। তবে পুরোপুরি সুস্থ হতে তাকে দীর্ঘ সময়ের মধ্য দিয়ে যেতে হবে। কারাগারে ফেরার পর তার কী ধরনের চিকিৎসা চলছে, তা স্পষ্ট নয়।
পাইকের ঘটনাটি মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ইতিহাসে নজিরবিহীন বলে মনে করা হচ্ছে। প্রাণঘাতী ইনজেকশনের মাধ্যমে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের চেষ্টা থেকে বেঁচে যাওয়া একমাত্র ব্যক্তি হিসেবে তাকেই বিবেচনা করা হচ্ছে। নিহত কলিন স্লেমারের মা, যিনি পাইকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের দাবিতে সোচ্চার ছিলেন, ব্যর্থ এই ঘটনাকে ‘বিশৃঙ্খল’ বলে আখ্যা দিয়েছেন।
অন্যদিকে, হত্যাকাণ্ডের সময় পাইকের প্রেমিক টাডারিল শিপ এখনো কারাগারে রয়েছেন। অপরাধ সংঘটনের সময় তার বয়স প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার নিচে থাকায় তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়নি।
পাইককে আবার মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার চেষ্টা করা হবে কি না, তা এখনো অনিশ্চিত। অঙ্গরাজ্যের কয়েকজন রিপাবলিকান রাজনীতিক মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের নতুন পদ্ধতি ব্যবহারের আহ্বান জানিয়েছেন। তবে পাইকের আইনজীবীরা টেনেসির গভর্নর বিল লির কাছে তার সাজা কমিয়ে প্যারোলের সুযোগ ছাড়া যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে রূপান্তরের আবেদন করেছেন।
আপাতত চলতি বছরের বাকি সময়ের জন্য টেনেসিতে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের কার্যক্রম স্থগিত রেখেছেন গভর্নর লি। পাইকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের চেষ্টায় কী ভুল হয়েছিল, তা নিয়ে তদন্ত চলছে। এ ঘটনার পর অঙ্গরাজ্যের সংশোধন বিভাগের প্রধানও পদত্যাগ করছেন।
সূত্র: বিবিসি
প্রকাশকঃ দেলোয়ার হোসেন, সম্পাদকঃ মোঃ আবদুল ওয়াদুদ II ভিজিট করুন - www.torrongonews.com