মুসলিম ঐতিহ্যের অন্যতম প্রধান অনুষঙ্গ এবং অনুপম সৌন্দর্য হলো অতিথি আপ্যায়ন। মুসলিম সমাজে মেহমানকে আল্লাহর পক্ষ থেকে আসা বিশেষ রহমত হিসেবে বিবেচনা করা হয়। অতিথির সেবা করা ইমানের অন্যতম বাহ্যিক প্রকাশ এবং মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের এক উৎকৃষ্ট মাধ্যম। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহ ও বিভিন্ন হাদিসে অতিথি আপ্যায়নের ফজিলত ও অগাধ সওয়াবের কথা অত্যন্ত সুন্দরভাবে বর্ণিত হয়েছে। চলুন, ইসলামে অতিথি আপ্যায়নের ফায়েদা ও সময়সীমা সম্পর্কে জেনে নেওয়া যাক।
মেহমানকে সম্মান করা ইমানের পরিচায়ক
অতিথি আপ্যায়ন কেবল সামাজিক শিষ্টাচার নয়, বরং এটি একজন মুমিনের ইমানের পূর্ণতার পরিচায়ক। মেহমানের যথাযথ সম্মান ও সমাদর করার প্রতি ইসলামে বিশেষ গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। হাদিসে পাকে এসেছে—
مَنْ كَانَ يُؤْمِنُ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ فَلْيُكْرِمْ ضَيْفَهُ
‘রাসুলুল্লাহ (সা.) নির্দেশ দিয়েছেন, যে ব্যক্তি আল্লাহ ও শেষ দিনের (কিয়ামত) প্রতি ইমান রাখে, সে যেন তার অতিথিকে সম্মান করে।’ (বুখারি, মুসলিম)
অতিথি আপ্যায়নের মেয়াদ ও সওয়াব
অতিথির স্বাচ্ছন্দ্য নিশ্চিত করা এবং তাঁকে আহার করানোকে ইসলামে নফল সদকার সমতুল্য সাওয়াব হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। ইসলামে মেহমানদারির একটি নির্দিষ্ট সময়সীমাও নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। হাদিসে পাকে এসেছে, মহানবী (সা.) অতিথি আপ্যায়নের সময়সীমা নির্ধারণ করে দিয়ে বলেছেন—
الجَائِزَةُ ثَلَاثَةُ أَيَّامٍ، وَجَائِزَتُهُ شِعْبَى يَوْمٍ وَلَيْلَةٍ
‘তোমাদের বিশেষ মেহমানদারি করার মেয়াদ এক দিন ও এক রাত। আর সাধারণ মেহমানদারি তিন দিন পর্যন্ত। এর অতিরিক্ত যা করা হবে, তা সদকা হিসেবে গণ্য হবে।’ (বুখারি ও মুসলিম)
অতিথি আগমন: রিজিক ও ক্ষমার উসিলা
অতিথি আগমন গৃহস্থের জন্য কখনো কোনো বোঝা বা অস্বস্তির বিষয় নয়, বরং এটি পরম সৌভাগ্যের বিষয়। মেহমান নিজের সঙ্গে বরকত ও ক্ষমা নিয়ে আসেন। হাদিসে পাকে এসেছে, হজরত আসমা বিনতে ইয়াজিদ (রা.) থেকে বর্ণিত, মহানবী (সা.) বলেছেন—
مَا مِنْ ضَيْفٍ يَنْزِلُ بِقَوْمٍ إِلَّا نَزَلَ بِرِزْقِهِ مِنْ السَّمَاءِ، وَإِذَا ارْتَحَلَ ارْتَحَلَ بِمَغْفِرَةٍ لَهُمْ
‘যখন কোনো অতিথি কোনো পরিবার বা ঘরে আগমন করে, সে তার নিজের রিজিক নিয়েই আগমন করে। আর যখন সে প্রস্থান করে, তখন সে গৃহস্থের গুনাহগুলো মাফ করিয়ে প্রস্থান করে।’ (বায়হাকি)
মদিনায় হিজরতের পর মুসলিম সমাজ গঠনের প্রারম্ভেই রাসুলুল্লাহ (সা.) উম্মতকে কিছু মৌলিক উপদেশ দিয়েছিলেন। এর মধ্যে সালামের পাশাপাশি মেহমানদারি বা খাদ্যদানের ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে। হাদিসে পাকে এসেছে, হজরত আবদুল্লাহ ইবনে সালাম (রা.) বর্ণনা করেন, রাসুল (সা.) মদিনায় পৌঁছে প্রথম যে উপদেশটি দিয়েছিলেন তা হলো—
يَا أَيُّهَا النَّاسُ! أَفْشُوا السَّلَامَ، وَأَطْعِمُوا الطَّعَامَ، وَصَلُّوا بِاللَّيْلِ وَالنَّاسُ نِيَامٌ، تَدْخُلُوا الْجَنَّةَ بِسَلَامٍ
‘হে লোকসকল! তোমরা সালামের বিস্তার কর, আহার করাও (মেহমানদারি করো ও অভাবীকে খাদ্য দাও) এবং মানুষ যখন রাতে ঘুমিয়ে থাকে তখন নামাজ আদায় কর; তাহলে তোমরা পরম শান্তিতে জান্নাতে প্রবেশ করবে।’ (তিরমিজি)
অতিথি আপ্যায়ন মুসলিম সমাজের পারস্পরিক ভালোবাসা, সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্য বৃদ্ধির এক জাদুকরী মাধ্যম। মেহমানের আগমনে ঘরের বরকত বৃদ্ধি পায় এবং গুনাহ মাফের সুযোগ সৃষ্টি হয়। তাই হাসিমুখে অতিথির অভ্যর্থনা জানানো এবং সাধ্যমতো তাদের সেবা করার মাধ্যমে আমরা যেমন প্রিয়নবির সুন্নাহ অনুসরণ করতে পারি, তেমনি অর্জন করতে পারি মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি ও জান্নাতের নেয়ামত।
প্রকাশকঃ দেলোয়ার হোসেন, সম্পাদকঃ মোঃ আবদুল ওয়াদুদ II ভিজিট করুন - www.torrongonews.com