৬ দফা দাবিতে বড় কর্মসূচি ডেকেছে জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয়জোট। আগামীকাল শনিবার (৫ সেপ্টেম্বর) ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম অভিমুখে লংমার্চ করবে ১১ দলীয় ঐক্য। লংমার্চ সফল করতে শুক্রবার (৪ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর মগবাজারে জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে ১১ দলীয় ঐক্যের সর্বশেষ প্রস্তুতি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। একই দিন সকালে চট্টগ্রামের চকবাজারে মহানগর জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন করে কর্মসূচির বিস্তারিত তুলে ধরেন দলটির নেতারা।
লংমার্চের উদ্বোধনী সমাবেশ সকাল ৭টায় রাজধানীর শাপলা চত্বরে অনুষ্ঠিত হবে। পথে নারায়ণগঞ্জের কাচপুর ব্রিজের কাছে ট্রাকস্ট্যান্ড, কুমিল্লার পদুয়া বাজার বিশ্বরোড, ফেনীর মহীপাল ও মীরসরাইয়ে পথসভা হবে। পরে চট্টগ্রামের ঐতিহাসিক লালদিঘী ময়দানে সমাবেশের মধ্য দিয়ে কর্মসূচি শেষ হবে। সেখানে বিকেল ৫টা ১৫ মিনিটে সমাবেশ অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।
১১ দলীয় জোটের দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে- জুলাই গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়ন; গণভোটের গণরায় বাস্তবায়ন; জুলাই গণহত্যার বিচার; জনগণের ন্যায্য দাবি আদায়; বিদ্যুৎ, তেল, গ্যাস ও সার সংকট নিরসন; নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি রোধ, চাঁদাবাজি ও দুর্নীতি বন্ধ; আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন এবং সংকীর্ণ দলীয়করণ বন্ধ।
এদিন মগবাজারের বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল ও লংমার্চ বাস্তবায়ন কমিটির আহ্বায়ক মিয়া গোলাম পরওয়ার, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও ১১ দলীয় ঐক্যের সমন্বয়ক ড. এএইচএম হামিদুর রহমান আযাদ, এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী, লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব বিল্লাল হোসাইন মিয়াজী, বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টির সিনিয়র নায়েবে আমীর মাওলানা আবদুল মাজেদ আতহারী, এবি পার্টির যুগ্ম মহাসচিব আব্দুল্লাহ আল মামুন, বাংলাদেশ লেবার পার্টির চেয়ারম্যান ডা. মোস্তাফিজুর রহমান ইরান, জাগপার সহসভাপতি ও মুখপাত্র ইঞ্জিনিয়ার রাশেদ প্রধান, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের মহাসচিব মাওলানা ফখরুল ইসলাম, জাগপার সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ইকবাল হোসাইন, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা আবদুল হালিমসহ অন্য নেতারা।
বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে গোলাম পরওয়ার বলেন, ক্ষমতাসীন দল যারা সরকার পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছেন, যাদের অধীনে প্রশাসন, আমলাসহ অন্যান্য সংস্থা রয়েছে- যাদের হাতে জনগণের জান ও মাল নিরাপত্তা পাবেন। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর সরকার গঠনের পর বিরোধীদল জনগণের দুর্ভোগ লাঘবে সংসদের ভিতরে ও বাইরে বিরোধীদল এখনো নিয়মতান্ত্রিক, গঠনমূলক ও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করছে। সরকারের প্রতি আমাদের অনুরোধ বিরোধী দলের সর্ববৃহৎ শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক কর্মসূচিকে সফল করতে সকল প্রশাসনিক সহযোগিতা দিয়ে সরকার জনগণের আস্থায় থাকবে।
তিনি সতর্ক করে বলেন, যদি সরকারের কোনো দল বা কেউ লংমার্চে কোনো প্রতিকূল পরিবেশ তৈরি করে তাহলে তারা জনগণের আস্থা হারাচ্ছেন, আরও হারাবে এবং জনরোষের মুখোমুখি হবে। আশাকরি এরকম কোনো অপরিণামদর্শী পথে সরকার ও সরকারি দলের কেউ পা বাড়াবে না।
গোলাম পরওয়ার বলেন, সরকার গঠনের ছয়মাস পার হলেও গণভোটের গণরায় বাস্তবায়নে উদ্যোগ নেয়নি। বরং গণরায় বাস্তবায়ন করা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। তবে আমাদের স্পষ্ট কথা হচ্ছে গণভোটের গণরায়ে কোনো নোট অব ডিসেন্ট নেই। গণভোটে বিএনপির নোট অব ডিসেন্ট খারিজ হয়েছে। আমরা জুলাই বিপ্লবের রক্তের বিনিময়ে একসাথে স্বপ্নের বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন দেখছি। আমরা সরকার উৎখাতের কোনো আন্দোলন করছি না, জনগণের ও আমাদের দাবি হলো গণভোটের গণরায়কে আপনারা মেনে নেন। আমাদের ৬ দফা আপনারা মেনে নিন। আমরা প্রত্যাশা করি, আমাদের কর্মসূচিকে সম্মান দেখিয়ে সরকার জনগণের আস্থায় থাকবে।
তিনি বলেন, রাজনৈতিক পরিবর্তনের পরে প্রমাণিত হোক বিরোধীদল ও সরকারি দলের পরমত সহিষ্ণতা রয়েছে এবং রাজনৈতিক সহিংসতা যে ছিল সেই নেতিবাচক সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসেছি। আমরা এখন পর্যন্ত কোনো নাশকতার আশঙ্কা করছি না। নিরাপদ শান্তিপূর্ণ লংমার্চে জনগণের জানমালের ক্ষয়ক্ষতির কোনো কারণ নেই।
গোলাম পরওয়ার বলেন, পুলিশ প্রশাসনের মহাপরিদর্শককে ১১ দল লিখিতভাবে কর্মসূচির বিষয়ে অবহিত করেছে। রাস্তার দুধারে হাজার হাজার জনগণ লংমার্চকে অভিবাদন জানাবে।
তিনি বলেন, আগামী ৫ সেপ্টেম্বরের লংমার্চের সামগ্রিক প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়েছে ইতোমধ্যে। আমাদের লংমার্চের বহরে প্রায় দেড় হাজার গাড়ি যুক্ত হবে বলে আমরা ইতোমধ্যে জানতে পেরেছি। লংমার্চের উদ্বোধনী সমাবেশ সকাল ৭টায় রাজধানীর শাপলা চত্বরে অনুষ্ঠিত হবে। লংমার্চের রুটে পূর্বনির্ধারিত বিভিন্ন পয়েন্টে পথসভা হবে। প্রথমটি নারায়ণগঞ্জের কাচপুর ব্রিজের কাছে ট্রাকস্ট্যান্ডে, কুমিল্লার পদুয়া বাজার বিশ্বরোড, ফেনীর মহীপাল, মীরসরাই এবং সবশেষ চট্টগ্রামের লালদিঘী ময়দানে জনসভা অনুষ্ঠিত হবে। আমরা এখন পর্যন্ত যে খবর পেয়েছি সেখানে জনতার ঢল নামবে।
পরওয়ার বলেন, লংমার্চে অংশগ্রহণকারী ডেলিগেটরা গাড়ি থেকে নেমে পথসভায় যোগ দেবেন না। পথসভা স্থানীয় শাখা বাস্তবায়ন করবে। বহরে থাকা গাড়িতে স্টিকার থাকবে এবং চলমান থাকা অবস্থায় কোনো গাড়ি বহরের সঙ্গে যুক্ত হতে পারবে না। যুক্ত হবে বহরের শেষে। সংবাদ প্রচার করার জন্য গাড়ি বহরের সঙ্গে গণমাধ্যমের গাড়ি যুক্ত হবে।
এদিকে চট্টগ্রাম মহানগর এনসিপির আহ্বায়ক মীর মোহাম্মদ শোয়াইবের সভাপতিত্বে সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য দেন এনসিপির চট্টগ্রাম বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক এস এম সুজা উদ্দিন এবং মহানগর এনসিপির সদস্য সচিব আরিফ মঈনুদ্দিন।
এস এম সুজা উদ্দিন বলেন, নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণে বন্দরনগরী চট্টগ্রামের গুরুত্ব অপরিসীম। এখানকার মানুষ যাতে তাদের ন্যায্য নাগরিক হিস্যা ও অধিকার পায়, সেটি নিশ্চিত করা জরুরি।
তিনি বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়ন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন এবং নাগরিকদের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠায় বিরোধী দল হিসেবে আমাদের করণীয় নিয়ে দীর্ঘ সময় ধরে মাঠে সংগ্রাম করা কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ চট্টগ্রামের এই সমাবেশে কথা বলবেন।
তিনি বলেন, আমরা আশা করি, লালদিঘীতে এক বিশাল জমায়েতের মধ্য দিয়ে সমগ্র দক্ষিণাঞ্চলে বড় ধরনের জনসংযোগ সৃষ্টি হবে।
মহানগর এনসিপির আহ্বায়ক মীর মোহাম্মদ শোয়াইব বলেন, ভোটাধিকারের রায় বাস্তবায়ন, জুলাই গণহত্যার বিচার, বিদ্যুৎ-তেল-গ্যাস ও সার সংকট নিরসন, নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি রোধ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন এবং সংকীর্ণ দলীয়করণ বন্ধের দাবিতে আমাদের লংমার্চ।
তিনি বলেন, ঐতিহাসিক শাপলা চত্বর থেকে আগামীকাল শনিবার সকাল ৭টায় আমাদের লংমার্চ যাত্রা শুরু করবে। পথিমধ্যে একাধিক পথসভা শেষে আমরা চট্টগ্রামের ঐতিহাসিক লালদিঘী ময়দানে এসে সমবেত হবো।
মহানগর এনসিপির সদস্য সচিব আরিফ মঈনুদ্দিন বলেন, বর্তমান সরকার জনগণের গণরায়কে অবজ্ঞা করে চলেছে। গণহত্যার কোনো দৃশ্যমান বিচার হচ্ছে না; খুনিরা কারাগারে বসে জন্মদিন পালন করছে, যা অত্যন্ত লজ্জাজনক।
তিনি বলেন, দেশে গ্যাস, সার ও বিদ্যুতের তীব্র সংকটে জনগণের চরম ভোগান্তি চললেও সরকার সেদিকে ভ্রূক্ষেপ না করে দলীয়করণে ব্যস্ত।
তিনি বলেন, আমরা জনগণকে সঙ্গে নিয়ে এই সরকারকে মোকাবিলা করব এবং জনগণের সুবিধা-অসুবিধা বুঝতে বাধ্য করব। আগামীকাল সকাল ৭টা থেকে শুরু হওয়া লংমার্চ ঘিরে আমাদের ব্যাপক প্রস্তুতি রয়েছে। পুরো রুট জনলোকারণ্য হয়ে যাবে বলে আমরা বিশ্বাস করি।
আরিফ মঈনুদ্দিন বলেন, আমরা জনদাবি নিয়ে মাঠে নামলেও সরকার ক্রমাগত আমাদের বাধা দিচ্ছে। চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজে আমাদের কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দের জন্য নির্ধারিত ভিআইপি কক্ষগুলো দুই মন্ত্রীর নামে বুকিং দেখিয়ে তাদের থাকতে দেওয়া হচ্ছে না।
তিনি বলেন, এই ধরনের কোনো অপরাজনীতির চেষ্টা করা হলে জনগণকে সঙ্গে নিয়ে তা কঠোরভাবে মোকাবিলা করা হবে।
লংমার্চে অংশ নেওয়া দেশবাসী ও দলের নেতা-কর্মীদের ধৈর্য, সাহস ও শৃঙ্খলার সঙ্গে শান্তিপূর্ণভাবে কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন ১১ দলের নেতৃবৃন্দ।
প্রকাশকঃ দেলোয়ার হোসেন, সম্পাদকঃ মোঃ আবদুল ওয়াদুদ II ভিজিট করুন - www.torrongonews.com