তৃণমূলের রাজনীতি থেকে ধাপে ধাপে উঠে এসেছেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় ছাত্ররাজনীতিতে হাতেখড়ি তাঁর। উনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থানে রাজনৈতিক কারণে জেলও খেটেছেন তিনি। স্বাধীনতার পর শিক্ষকতা পেশা দিয়ে কর্মজীবন শুরু করলেও পরে শিক্ষকতা ছেড়ে যোগ দেন রাজনীতিতে।
দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তিনি জেলা বিএনপির সভাপতি, জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব, ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব ও মহাসচিবের দায়িত্ব পালন করেছেন। এ সময় পৌরসভার চেয়ারম্যান থেকে শুরু করে প্রতিমন্ত্রী ও মন্ত্রী হয়েছেন। দীর্ঘ পথপরিক্রমা শেষে এখন তিনিই দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি।
৭৮ বছর বয়সী মির্জা ফখরুলের রাজনৈতিক জীবন দীর্ঘ ও বৈচিত্র্যময়। রাজনৈতিক দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি নানা প্রতিকূলতার মধ্য দিয়েও এগিয়েছেন তিনি। ইতোমধ্যে দলের মহাসচিব ও জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্যপদ থেকে পদত্যাগ করেছেন।
জন্ম, বেড়ে ওঠা ও ছাত্ররাজনীতি-
১৯৪৮ সালের ২৬ জানুয়ারি জন্ম নেওয়া মির্জা ফখরুলের বেড়ে ওঠা ঠাকুরগাঁও শহরের কালীবাড়ি এলাকায়। বাবার নাম মির্জা রুহুল আমিন ও মা মির্জা ফাতেমা আমিন। ঠাকুরগাঁও সরকারি বালক উচ্চবিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক ও ঢাকা কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক পাস করার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন মির্জা ফখরুল।
মির্জা ফখরুল তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের সদস্য ছিলেন এবং সংগঠনটির ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এস এম হল শাখার সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হয়েছিলেন তিনি। পরে ১৯৬৯ সালের গণ-অভ্যুত্থানের সময় তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এ সময় রাজনৈতিক কারণে তাকে কারাগারেও যেতে হয়। মির্জা রুহুল আমিন ঠাকুরগাঁওয়ে একাধিকবারের সংসদ সদস্য ও পরে এরশাদ সরকারের মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
শিক্ষকতা দিয়ে কর্মজীবন শুরু-
দেশ স্বাধীনের পর ১৯৭২ সালে বিসিএস (শিক্ষা) ক্যাডার হিসেবে ঢাকা কলেজের প্রভাষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন মির্জা ফখরুল। পরে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের আমলে তৎকালীন উপপ্রধানমন্ত্রী এস এ বারীর ব্যক্তিগত সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৮২ সালে এস এ বারীর পদত্যাগের পর তিনি আবার শিক্ষকতা পেশায় ফিরে যান। ঠাকুরগাঁও সরকারি কলেজে কর্মরত অবস্থায় তিনি সরকারের পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরের উপপরিচালক ও ইউনেসকো জাতীয় কমিশনে কাজ করেন।
সক্রিয় রাজনীতিতে প্রবেশ-
১৯৮৮ সালে নির্দলীয় প্রার্থী হিসেবে তিনি ঠাকুরগাঁও পৌরসভার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের পর তিনি বিএনপিতে যোগ দেন। ১৯৯১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি দলীয় প্রার্থী হন। ১৯৯২ সালে ঠাকুরগাঁও জেলা বিএনপির সভাপতি হন। পাশাপাশি তিনি কৃষক দলের কেন্দ্রীয় সহসভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। ২০০১ সালের নির্বাচনে ঠাকুরগাঁও-১ আসনের সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর বিএনপি সরকারের কৃষি প্রতিমন্ত্রী এবং পরে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
২০০৯ সালে বিএনপির পঞ্চম জাতীয় সম্মেলনে দলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব নির্বাচিত হন মির্জা ফখরুল। তৎকালীন আওয়ামী লীগ (কার্যক্রম নিষিদ্ধ) সরকারের আমলে তিনি বিরোধীদলীয় মুখপাত্র হিসেবে গণমাধ্যমে পরিচিতি লাভ করেন। ২০১১ সালের মার্চে বিএনপির তৎকালীন মহাসচিব খোন্দকার দেলোয়ার হোসেনের মৃত্যুর পর দলের চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া তাকে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব দেন। ২০১৬ সালের ১৯ মার্চ বিএনপির ষষ্ঠ জাতীয় সম্মেলনে তিনি মহাসচিব হন।
২০২৬ সালে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়ী হয়ে বিএনপি সরকার গঠন করলে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পান মির্জা ফখরুল। এরপর তাকে রাষ্ট্রপতি পদে মনোনয়ন দেন বিএনপি। এখন তিনি দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছেন। ইতিমধ্যে তিনি দলের মহাসচিব ও জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্যপদ থেকে পদত্যাগ করেছেন। রাজনীতি ছাড়াও ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক কার্যক্রমেও তিনি সম্পৃক্ত ছিলেন।
ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবন-
ব্যক্তিগত জীবনে মির্জা ফখরুল বিবাহিত। তার স্ত্রী রাহাত আরা বেগম ঢাকার একটি বিমা কোম্পানিতে কর্মরত। দুই মেয়ের মধ্যে বড় মেয়ে মির্জা শামারুহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার পর সেখানে শিক্ষকতা করেছেন। বর্তমানে তিনি অস্ট্রেলিয়াপ্রবাসী ও পোস্ট ডক্টরাল ফেলো। ছোট মেয়ে মির্জা সাফারুহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার পর ঢাকার একটি বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করছেন।
মির্জা ফখরুলের ছোট ভাই মির্জা ফয়সাল আমিন ঠাকুরগাঁও জেলা বিএনপির সভাপতি। চাচা মির্জা গোলাম হাফিজ বিএনপি সরকারের সাবেক ভূমিমন্ত্রী, আইনমন্ত্রী ও দ্বিতীয় জাতীয় সংসদের স্পিকার ছিলেন।
প্রকাশকঃ দেলোয়ার হোসেন, সম্পাদকঃ মোঃ আবদুল ওয়াদুদ II ভিজিট করুন - www.torrongonews.com