বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের দায়িত্ব থেকে বিদায়ের ঘোষণা দিলেন সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দিন নাছির। তবে ছাত্রদলের সঙ্গে তার সম্পর্ক শেষ হচ্ছে না বলেও উল্লেখ করেছেন তিনি।
আজ শুক্রবার সকাল ১১টার দিকে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুকে এক পোস্টে দায়িত্ব থেকে বিদায়ের ঘোষণা দেন ছাত্রদল নেতা।
দীর্ঘ ফেসবুক পোস্টে নাছির উদ্দিন নাছির বলেন, ‘আজ দায়িত্ব থেকে বিদায় নিচ্ছি, কিন্তু ছাত্রদল থেকে নয়। পদ থেকে বিদায় নেওয়া যায়; আদর্শ থেকে নয়। ভালোবাসা থেকে নয়, সহযোদ্ধাদের কাছ থেকে নয়।’
পোস্টে তিনি জানান, ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে তার দায়িত্ব পালনের আজ শেষ দিন। দীর্ঘ ১৭ বছরের রাজনৈতিক পথচলা এবং সংগঠনের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি সহযোদ্ধা, দলীয় নেতৃবৃন্দ ও পরিবারের সদস্যদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
আগামী দিনে ছাত্রদলে যারা দায়িত্বে আসবেন তাদের নেতৃত্বে সংগঠনটি আরো শক্তিশালী ও গতিশীল হবে বলে বিশ্বাস করেন নাছির। তিনি নতুন নেতৃত্বের ডাকে যেকোনো সময় তাদের পাশে থাকার আশ্বাস দেন।
ফেসবুকে দীর্ঘ পোস্টে নাছির ছাত্রদলের দায়িত্ব থাকা অবস্থায় বিভিন্ন ঘটনা তুলে ধরেন। তাকে সহযোগিতা এবং পরামর্শ দেওয়ায় বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
তিনি বলেন, ওয়ান-ইলেভেনের কঠিন সময়ে তার রাজনৈতিক জীবনের শুরু। এরপর দীর্ঘ সময় ধরে সংগ্রাম, ত্যাগ, নির্যাতন, গুম ও খুনের ভয়াবহ বাস্তবতার মধ্য দিয়ে রাজনীতিতে পথ চলেছেন তিনি। এ সময়ে যারা গুম, খুন ও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, তাদের শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন তিনি।
ছাত্রদলের পদ থেকে বিদায়ের ঘোষণা দিয়ে নাছির বলেন, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালনের আজ শেষ দিন। একটি দীর্ঘ, কঠিন, ঘটনাবহুল এবং একই সঙ্গে গৌরবের অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটছে।
নোয়াখালীর সুবর্ণচর থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালনের এই যাত্রা সংক্ষেপে তার ফেসবুক পোস্টে তুলে ধরেন নাছির। বেগম খালেদা জিয়ার আপোসহীন নেতৃত্ব তার রাজনৈতিক জীবনের সার্বক্ষণিক অনুপ্রেরণা ছিল বলেও জানান ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক।
তিনি বলেন, ২০২৪ সালের ১ মার্চ দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই আমরা এক কঠিন রাজনৈতিক বাস্তবতার মধ্য দিয়ে পথ চলেছি। কিন্তু আমাদের সময়ের সবচেয়ে কঠিন অধ্যায় ছিল ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট। সেই উত্তাল সময়ে নেতাকর্মীদের রাজপথে সক্রিয় রাখা, তাদের সাহস জোগানো, সংগঠনের প্রতিটি স্তরকে আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত রাখা-এটাই ছিল আমাদের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
জুলাই-আগস্টের সেই আন্দোলনে ছাত্রদলের অসংখ্য নেতাকর্মী জীবনের ঝুঁকি নিয়ে রাজপথে থেকেছেন। ঢাকার পাঁচ বিশ্ববিদ্যালয়, পাঁচ কলেজ এবং চার মহানগরের তৎকালীন নেতৃত্ব অসাধারণ ভূমিকা পালন করেছেন, তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন নাছির।
জুলাই আন্দোলনের সময়ে নাহিদ, আসিফ, হাসনাত, সারজিস, কাদের, মাহিন, রিফাত রশিদ ও হান্নান মাসুদের সঙ্গে অসাধারণভাবে কাজ করার সুযোগ হয়েছে বলে জানান নাছির। তিনি বলেন, ‘আন্দোলনের সময়ে তারা ছাত্রদলকে অসম্ভব গুরুত্ব দিয়ে কাজ করেছে। পরবর্তীতে রাজনৈতিক বাস্তবতার কারণে হয় তো ছাত্রদলের অবদান তারা সবসময় সমানভাবে স্বীকার করতে পারেনি; কিন্তু আমরা তাদের প্রতি কৃতজ্ঞ।’
এই দীর্ঘ দায়িত্বকালে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ের আরেকটি কঠিন বাস্তবতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে বলে জানান ছাত্রদল সম্পাদক। তিনি বলেন, ‘সেটা হলো মব সংস্কৃতি। চারদিকে নানা ধরনের প্রচারণা, অপপ্রচার, বিভ্রান্তি এবং রাজনৈতিক চাপের মধ্যেও ছাত্রদলকে রাজপথে সক্রিয় রাখা সহজ ছিলো না। সব প্রোপাগান্ডা কাটিয়ে সংগঠনের নেতাকর্মীদের ঐক্যবদ্ধ রাখা এবং দায়িত্বশীল রাজনৈতিক আচরণ নিশ্চিত করা ছিল প্রতিনিয়ত বড় একটি চ্যালেঞ্জ।’
দায়িত্বের অপূর্ণতা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও অল্প কয়েকটি কমিটি আমরা সম্পন্ন করতে পারিনি। বিশেষ করে কেন্দ্রীয় কমিটির বর্ধিত অংশ সম্পন্ন করতে না পারার আক্ষেপ আমার থাকবে। এই অপূর্ণতার জন্য আমি আন্তরিকভাবে দুঃখিত।’
ছাত্রসংসদ নির্বাচনে ছাত্রদলের প্রত্যাশিত ফলাফল না পাওয়া একটি ব্যর্থতা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘একজন সংগঠক হিসেবে এই ফলাফল আমাকে প্রায়ই ভাবিয়েছে। কোথায় আমাদের ঘাটতি ছিল, কোথায় আরো ভালো করা যেত—এসব প্রশ্ন নিজের কাছে করেছি। রাজনীতিতে পরাজয়ও শিক্ষা দেয়। আমি বিশ্বাস করি, ছাত্রদল এই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে ভবিষ্যতে আরো শক্তিশালী, আরো গ্রহণযোগ্য এবং আরো সংগঠিত ছাত্রসংগঠন হয়ে উঠবে।’
সবশেষে সহযোদ্ধাদের কষ্ট দিয়ে থাকলে তিনি ফেসবুক পোস্টে ক্ষমা প্রার্থনা করেন। নাছির বলেন, ‘আজ বিদায় নিচ্ছি একটি দায়িত্ব থেকে। কিন্তু সম্পর্ক থেকে নয়, সংগ্রাম থেকে নয়, আদর্শ থেকে নয়। দেখা হবে অন্য কোনো প্ল্যাটফর্মে, অন্য কোনো দায়িত্বে, অন্য কোনো সময়ে।’
এর আগে গত রাতে সংগঠনটির সভাপতি রাকিবুল ইসলামও এক পোস্টে নিজের বিদায়ি বার্তা দিয়েছেন।
প্রকাশকঃ দেলোয়ার হোসেন, সম্পাদকঃ মোঃ আবদুল ওয়াদুদ II ভিজিট করুন - www.torrongonews.com