উত্তর আফ্রিকায় অবস্থিত স্পেনের স্বায়ত্তশাসিত শহর সেউতায় প্রবেশ করতে গিয়ে চরম ট্র্যাজেডির শিকার হয়েছেন অভিবাসনপ্রত্যাশীরা। মরক্কো থেকে সীমান্ত অতিক্রম করে সেউতায় প্রবেশের চেষ্টা করার সময় অন্তত ৯ জন অভিবাসীর করুণ মৃত্যু হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের ভূখণ্ডে পৌঁছানোর মরিয়া চেষ্টায় বিগত ১০ দিনে প্রায় দেড় থেকে দুই হাজার মানুষ স্পেনের এই ভূখণ্ডে প্রবেশ করেছেন। এর মধ্যে কেবল ৩০ জুলাই, বৃহস্পতিবারই শত শত মানুষ নতুন করে প্রবেশ করলে পুরো অঞ্চলজুড়ে তীব্র সংকট তৈরি হয়। চরম বিপর্যয়কর পরিস্থিতির মুখে সেউতার আঞ্চলিক প্রেসিডেন্ট জেসুস ভিভাস একে ‘চূড়ান্ত মানবিক ও সামাজিক জরুরি অবস্থা’ হিসেবে ঘোষণা করে সীমান্তের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ফিরিয়ে আনতে মাদ্রিদের কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে জরুরি ভিত্তিতে সেনা পাঠানোর জোরালো আকুতি জানিয়েছেন।
সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও ও অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের প্রতিবেদনে দেখা যায়, মরক্কো উপকূল থেকে হাওয়া ভরা ডিঙি ও নানা ভাসমান উপকরণের সাহায্যে সমুদ্রপথ পাড়ি দিয়ে অসংখ্য মানুষ সেউতায় প্রবেশ করছেন। তাদের অনেকেই উপকূলে পৌঁছে ‘ভিভা এস্পানা’ (স্পেন দীর্ঘজীবী হোক) বলে আনন্দ উল্লাস করছেন এবং বাঁধ পেরিয়ে স্থানীয় মূল সড়কগুলোতে হেঁটে যাচ্ছেন।
পাশাপাশি বার্তা সংস্থা ইএফই জানিয়েছে, বহু মানুষ সীমান্ত এলাকার উঁচু কাঁটাতারের বেড়া ডিঙিয়ে স্থলপথেও সেউতায় প্রবেশ করতে সমর্থ হয়েছেন।
অভিবাসী অধিকারকর্মী জাকারিয়া জারোকি বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে জানান, এই অভিবাসন স্রোত ২০২১ সালের মে মাসের অনাকাঙ্ক্ষিত স্মৃতি ফিরিয়ে আনছে, যখন মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে প্রায় ১০ হাজার মরক্কো ও সাব-সাহারান তরুণ ওই এনক্লেভে প্রবেশ করেছিল। পরিস্থিতি এখনো সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণের বাইরে উল্লেখ করে তিনি জানান, সীমান্ত পার হওয়ার উদ্দেশ্যে পার্শ্ববর্তী মরক্কোর ফ্নিদেক শহরে এখনো প্রচুর মানুষ ভিড় জমাচ্ছেন।
পরিস্থিতি মোকাবিলায় স্পেনের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জাতীয় জরুরি অবস্থা ঘোষণার দাবি প্রত্যাখ্যান করে জানিয়েছে, এই ধরনের আইনি বিধিমালা অভিবাসনসংকটের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। তবে সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষ থেকে সীমান্ত সুরক্ষায় অবিলম্বে ৬০ জন সশস্ত্র সেনা পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
উল্লেখ্য, উত্তর আফ্রিকায় অবস্থিত সেউতা এবং মেলিলা—এই দুটি স্বায়ত্তশাসিত শহরই আফ্রিকা মহাদেশের সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়নের একমাত্র সরাসরি স্থলসীমান্ত। ফলে উন্নত জীবনের প্রত্যাশায় থাকা অভিবাসনপ্রত্যাশীদের কাছে অঞ্চল দুটি দীর্ঘদিন ধরেই ইউরোপে প্রবেশের অন্যতম প্রধান ট্রানজিট হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।
চলতি মাসের শুরুর দিকে স্পেনের সুপ্রিম কোর্ট এক ঐতিহাসিক রায়ে নির্দেশ দেন যে, সেউতা বা মেলিলায় পৌঁছানোর চেষ্টাকালে সমুদ্রে আটক হওয়া অভিবাসীদের সরাসরি মরক্কোতে ফেরত পাঠানো যাবে না। আদালতের এই রায়ের পর থেকেই ছিটমহলটিতে অভিবাসীদের ঢল নামতে শুরু করে।
স্পেনের সিভিল গার্ডের (গার্দিয়া সিভিল) এক মুখপাত্র রয়টার্সকে বলেন, রায়ের পর অভিবাসীদের আগমন ধীরগতিতে শুরু হলেও বৃহস্পতিবার তা যেন এক বিস্ফোরক রূপ ধারণ করেছে।
স্পেনের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তারা অনিয়মিত অনুপ্রবেশ ঠেকাতে মরক্কো প্রশাসনের সঙ্গে অত্যন্ত ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করছে। একই সঙ্গে সুপ্রিম কোর্টের রায়ের সুযোগ নিয়ে মানব পাচারকারী চক্রগুলো অবৈধভাবে মানুষকে সীমান্ত পার হতে প্ররোচিত করছে বলে অভিযোগ করেছে তারা।
উদ্ভূত মানবিক ও নিরাপত্তা পরিস্থিতি স্বচক্ষে পর্যবেক্ষণ ও মূল্যায়নের জন্য স্পেনের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ফার্নান্দো গ্রান্দে-মারলাস্কা শুক্রবার সেউতা পরিদর্শনে যাচ্ছেন। সূত্র: আল জাজিরা
প্রকাশকঃ দেলোয়ার হোসেন, সম্পাদকঃ মোঃ আবদুল ওয়াদুদ II ভিজিট করুন - www.torrongonews.com